Mamata Banerjee | ২০২৬ ভোট নজর রেখে বহরমপুরে মমতার শক্তিশালী বার্তা : বিজেপিকে ‘মিথ্যা প্রচার’ নিয়ে কড়া সমালোচনা

SHARE:

সানি সরকার, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, বহরমপুর ★ ৪ ডিসেম্বর ২০২৫ : বহরমপুরে বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিশাল জনসভার সামনে দাঁড়িয়ে একাধিক ইস্যুতে কার্যত বিস্ফোরক ভাষণ দিলেন। রাজ্যের নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু অধিকার, ওয়াকফ সম্পত্তি, এসআইআর মৃত্যু, নাগরিকত্ব বিতর্ক, গঙ্গা ভাঙন, কেন্দ্রীয় রাজনীতি সবকিছু নিয়ে মমতার দীর্ঘ ভাষণ নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। ২০২৫ সালের ভোটের আগে বহরমপুরে দাঁড়িয়ে তাঁর এই বক্তব্যকে অনেকেই রাজনৈতিক লড়াইয়ের প্রস্তুতি বলে মনে করছেন। মুখ্যমন্ত্রী প্রথমেই জানিয়ে দেন, বাংলার মানুষকে ভয় দেখিয়ে দমন করা যাবে না। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে বাংলাকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করা হয়েছে। কেন্দ্র আগেও নানা অজুহাতে চাপ তৈরি করেছে, কিন্তু রাজ্যের মানুষ বারবার প্রতিরোধ করেছেন। তিনি বলেন, “নিরাপত্তা, সম্মান, অধিকার সব রক্ষা করবে বাংলা সরকার। বাংলার মানুষকে ভয় দেখিয়ে কেউ নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না।”

ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে সম্প্রতি যে বিতর্ক ছড়িয়েছে, তা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী জোরাল প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি দাবি করেন, “কেউ বলছে খাতিয়ানের ১ নম্বরে মসজিদ-সমাধিস্থল নথিভুক্ত করা হয়েছে সবটাই মিথ্যা। ৮২ হাজার ওয়াকফ সম্পত্তি কেন্দ্রের পোর্টালে আগেই ছিল। আমরা শুধু নতুন WMC পোর্টাল তৈরি করেছি। বিজেপির কিছু নেতা টাকা খেয়ে গুজব ছড়াচ্ছে। এআই দিয়ে ভুয়ো ছবি বানাচ্ছে।” তাঁর কথায়, রাজ্যের মানুষ গুজব নয়, সত্যিকে বিশ্বাস করবেন।

আরও পড়ুন : Abhijit Gangopadhyay reaction, Primary teacher recruitment scam |ডিভিশন বেঞ্চের রায় প্রশ্নের মুখে? প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ বললেন, ‘২৬ হাজারও তো বহু বছর চাকরি করেছে, তা হলে কি সেই রায় ভুল?’

এসআইআর নিয়ে ভয় ছড়ানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। এ পর্যন্ত ৪০ জনের মৃত্যুতে রাজ্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার ঘোষণা করেছে। হাসপাতালে থাকা প্রত্যেককে ১ লক্ষ টাকা দেওয়া হবে। তাঁর অভিযোগ, বিজেপি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভয় তৈরি করে রাজনৈতিক লাভ তুলতে চাইছে। বিহারের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, “ভোটের আগে টাকা দিয়ে ভোট শেষেই বুলডোজার চালানো হয়েছে।” বাংলায় এই রাজনীতি চলবে না বলেই দাবি করেন তিনি। নিজের শৈশবের কথা তুলে ধরে মমতা বলেন, তিনি বর্ডারের কাছে জন্মেছিলেন, তাই অনেকে তাঁকে বাংলাদেশি বলে অপমান করেছিল। এখান থেকেই তিনি ছিন্নমূল মানুষের দুঃখ বোঝেন। “রোহিঙ্গা কীভাবে বাংলায় আসবে? সীমান্ত তো কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে। মিজোরাম-মনিপুর দিয়ে? কোথাও সুযোগ নেই। সবটাই বিজেপির ভয় দেখানোর রাজনীতি,” বলেন তিনি। ভাষণের একটি বড় অংশ দখল করে ধর্মীয় সহাবস্থান ও পারস্পরিক সম্মান সম্পর্কিত বক্তব্য। মমতা বলেন, “রমজানে গেলে বলে হিজাবি। গুরুদ্বারে গেলে বলে না। আদিবাসী পোশাক পরলে তো বলে না। আমি সব ধর্মকে সম্মান করি এটাই বাংলার সংস্কৃতি।” তিনি জানান, তাঁর সরকার পুরোহিত-মোয়াজ্জেম উভয়কেই ভাতা দেয় এবং সব ধর্মস্থানের জন্য সমানভাবে প্রকল্প করছে।

নাগরিকত্ব ইস্যুতে মুখ্যমন্ত্রী কড়া বার্তা দেন। তাঁর অভিযোগ, বিভিন্ন জায়গায় সার্ভার বন্ধ করে বা হঠাৎ হিয়ারিং ডেকে মানুষের নাম ভোটার লিস্ট থেকে সরানো হচ্ছে। তিনি ঘোষণা করেন, “যতক্ষণ না সবাই ভোটার লিস্টে নাম তুলবেন, ততক্ষণ আমিও তুলব না। গ্রামসভা-স্তরে ‘May I Help You’ ক্যাম্প হচ্ছে। সমস্যায় পড়লে বলুন।” গঙ্গা ভাঙন নিয়ে কেন্দ্রের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও করেন তিনি। ফরাক্কা ড্রেজিংয়ে ৭০০ কোটি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি মিললেও এখনও এক টাকাও আসেনি। ভাঙন রোধে দেড় হাজার কোটির পরিকল্পনা পাঠানো হলেও মঞ্জুরি দেয়নি কেন্দ্র। রাজ্য সরকার ইতিমধ্যেই ২০০ কোটি ব্যয়ে ১৭টি স্কিম চালু করেছে। পাশাপাশি সাগরদিঘির ৬৬০ মেগাওয়াট পাওয়ার ইউনিট ১০ ডিসেম্বর থেকে বিদ্যুৎ দেবে এ ঘোষণা করে তিনি জানান, এর ফলে ২৬ হাজার মানুষের কাজ হবে।

ইতিহাস টেনে এনে তিনি বলেন, “বাবা সাহেব আম্বেদকর বাংলার সমর্থনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। গান্ধিজিও দীর্ঘদিন বাংলায় থেকেছেন। নেতাজির সহযোগী শাহনাওয়াজ খান বাংলার গৌরব।” এরপরই তিজি রাজ্যসভায় বন্দে মাতরম সংক্রান্ত নোটিফিকেশনের তীব্র সমালোচনা করেন। মুুর্শিদাবাদের শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এ জেলা অশান্তি চায় না। ধুলিয়ানের ঘটনাতেও আমি তৎক্ষণাৎ এসেছিলাম। জঙ্গিপুরে হিন্দুদের রক্ষা করার নির্দেশ দিয়েছিলাম। বাংলায় মেজরিটি সবসময় মাইনরিটিকে রক্ষা করবে এটাই বাংলার মানবিকতা।”

বক্তব্যের শেষে তিনি রাজ্যের উন্নয়ন, মহিলাদের স্বনির্ভরতা, সেল্ফ হেল্প গ্রুপ, নতুন শপিং মল প্রকল্প, এবং ছানাবড়াসহ প্রায় চল্লিশটি GI ট্যাগ প্রাপ্তির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে একদিকে যেমন ছিল রাজনৈতিক আক্রমণ, অন্যদিকে তেমনই ছিল উন্নয়নের পরিসংখ্যান ও সামাজিক সুরক্ষার আশ্বাস।উল্লেখ্য, বহরমপুরের এই সভা যে ২০২৫ সালের ভোটের আগে তৃণমূলের রাজনৈতিক কৌশলের বড় ইঙ্গিত, তা তাঁর বক্তব্যেই স্পষ্ট। সংখ্যালঘু নিরাপত্তা থেকে শুরু করে নাগরিকত্ব, গঙ্গা ভাঙন থেকে ওয়াকফ বিতর্ক, সমস্ত ইস্যুকে ঘিরে তাঁর দৃঢ় অবস্থান আসন্ন রাজনৈতিক লড়াইকে আরও তীব্র করে তুলবে।

ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee reaction, Primary teacher recruitment verdict | ‘চাকরি দেওয়া দরকার, খেয়ে নেওয়া নয়’ : হাই কোর্টের রায়ে স্বস্তির সুর মুখ্যমন্ত্রী মমতার গলায়

Sasraya News
Author: Sasraya News

আরো পড়ুন