সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : প্রাথমিকে ৩২ হাজার শিক্ষক নিয়োগ মামলায় কলকাতা হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চ বুধবার যে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছে, তা নিয়ে কার্যত স্বস্তি প্রকাশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী (Justice Tapabrata Chakraborty) এবং বিচারপতি ঋতব্রতকুমার মিত্রের (Justice Rittobroto Kumar Mitra) ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়ে দিয়েছে, দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলেও চাকরিরত শিক্ষকদের বরখাস্ত করা হবে না। অর্থাৎ, ৩২ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক-শিক্ষিকার চাকরি বহাল থাকবে। আর সেই সিদ্ধান্ত ঘোষণা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মালদহে এক কর্মসূচির মঞ্চ থেকে সরাসরি প্রতিক্রিয়া দেন মুখ্যমন্ত্রী। এদিন তিনি বলেন, “কথায় কথায় কোর্টে গিয়ে চাকরি খেয়ে নেওয়া, এটা তো ঠিক নয়। চাকরি দেওয়া দরকার, খেয়ে নেওয়া নয়। বিচারকে আমরা শ্রদ্ধা করি। আমি সবচেয়ে খুশি যে আমার চাকরিরত ভাইবোনেদের চাকরি থাকল।”
প্রাথমিক নিয়োগ দুর্নীতির অভিযোগে আগের রায়ে ৩২ হাজার চাকরি বাতিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন হাই কোর্টের তৎকালীন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় (Abhijit Gangopadhyay), যিনি বর্তমানে বিজেপি সাংসদ। তাঁর সেই সিদ্ধান্ত নিয়েই শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক তরজা। তৃণমূলের অভিযোগ ছিল, বিচারপতি অভিজিতের রায়ে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীও বহুবার তার প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন। এ দিন তাঁর বক্তব্যে পরিষ্কার, ডিভিশন বেঞ্চের রায় তাঁর কাছে স্বস্তিদায়ক।
রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) অভিযানের সময় মালদহে জনসভায় দাঁড়িয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে মমতা বলেন, “বিচার বিচারের মতো চলবে। আদালতের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা রয়েছে। কিন্তু খেতে নেওয়ার মতো চাকরি বাতিলের সংস্কৃতি চলতে পারে না।” এদিকে রায়ের পরপরই প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসুও (Bratya Basu)। তিনি সমাজমাধ্যমে লিখেছেন,
“মহামান্য হাই কোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ের প্রেক্ষিতে প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদকে অভিনন্দন। সিঙ্গল বেঞ্চের রায় বাতিল হয়েছে। ৩২ হাজার শিক্ষকের চাকরি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকল। সত্যের জয় হল।”
এমন এক সময়ে এই রায় এল যখন রাজ্যের চাকরিপ্রার্থীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন চালিয়ে আসছিলেন। ২০২২ সাল থেকে নিয়োগ দুর্নীতি নিয়ে মামলা আদালতে ঘুরপাক খাচ্ছিল। দফায় দফায় তদন্ত, পরিদর্শন, সিবিআই তৎপরতা, সব মিলিয়ে রাজ্যের শিক্ষা দপ্তর কার্যত চাপে ছিল। সেই চাপে ফের এক রাজনৈতিক মুখ যোগ করেছিলেন অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়, যিনি বিজেপিতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তৃণমূলের নিশানায় ছিলেন। তাঁদের অভিযোগ ছিল, “রাজনীতিতে যোগ দেওয়া মাত্রই তাঁর পুরনো রায়গুলি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত বলে প্রমাণিত”, যদিও অভিজিৎ কখনও এই অভিযোগ মানেননি। হাই কোর্টের নতুন রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে, দুর্নীতির প্রমাণ থাকলেও, নয় বছর ধরে যারা কাজ করছেন তাঁদের বরখাস্ত করলে পরিবার-পরিজনের উপর গুরুতর প্রভাব পড়বে। সেই মানবিক দিক বিবেচনা করেই চাকরি বহাল রাখার সিদ্ধান্ত নেয় ডিভিশন বেঞ্চ। আদালতের মন্তব্য অনুযায়ী, “কাজ করার সময় কর্মীদের বিরুদ্ধে কোনও অভিযোগ ওঠেনি। কয়েকজনের অসাধুতা গোটা প্যানেলকে শাস্তি দেওয়ার কারণ হতে পারে না।”
কিন্তু এখানেই শেষ নয়। আদালত জানিয়েছে, নিয়োগ দুর্নীতির তদন্ত চলবে। অর্থাৎ, চাকরি রক্ষা পেলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ পদক্ষেপ বন্ধ হচ্ছে না। এই রায়ের ফলে রাজনৈতিক মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তৃণমূল যেখানে এটিকে ‘মানবিক’ রায় বলে স্বাগত জানিয়েছে, অন্যদিকে বিরোধীরা বলছে, চাকরি রক্ষা পেলেও দুর্নীতির দায় থেকে সরকার মুক্ত নয়।এদিকে প্রাথমিক নিয়োগের পাশাপাশি স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) মামলাও ফের আলোচনায় উঠে এসেছে। আগে একই ধরনের দুর্নীতির অভিযোগে ২৬ হাজার চাকরি বাতিল হয়েছিল এবং সুপ্রিম কোর্টও সেই নির্দেশ বহাল রেখেছে। ২০১৬ সালের সম্পূর্ণ প্যানেল বাতিল করে নতুন করে নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল কমিশনকে। কিন্তু প্রাথমিকে সেই পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, এ নিয়েও শুরু হয়েছে আইনি বিতর্ক। সর্বোপরি, রায় ঘোষণার পর রাজ্যের হাজার হাজার শিক্ষক-শিক্ষিকার মুখে এখন স্বস্তির হাসি।আর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “আমার ভাইবোনেরা চাকরি ফিরে পেয়েছে, এর চেয়ে আনন্দের খবর আর কী?
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : SIR Panic Bengal, Mamata Banerjee Financial Aid | ‘এসআইআর আতঙ্কে’ মৃত্যুমিছিল থামাতে উদ্যোগ মুখ্যমন্ত্রীর! ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের হাতে অর্থসাহায্য, অসুস্থদের জন্যও বিশেষ সহায়তা ঘোষণা




