কৌশিক রায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : রাজ্যে ‘এসআইআর আতঙ্কে’ মৃত্যুর ঘটনা ক্রমশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision–SIR) ঘিরে সাধারণ মানুষের আতঙ্ক, অস্বচ্ছতা অভিযোগ এবং কাজের অতিরিক্ত চাপ, এই সব মিলিয়ে গত এক মাসে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, নিজে থেকেই সামনে এসে ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। মঙ্গলবার নবান্নে তিনি ঘোষণা করেন, ‘এসআইআর আতঙ্কে’ মৃত প্রত্যেকের পরিবারকে দেওয়া হবে আর্থিক সহায়তা। পাশাপাশি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি বা চিকিৎসাধীন থাকা ব্যক্তিরাও পাবেন সরকারি আর্থিক সাহায্য। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এখনও পর্যন্ত ‘এসআইআর আতঙ্কে’ ৩৯ জন সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে আত্মহত্যা-সহ রয়েছে একাধিক ঘটনা। তিনি বলেন, “যারা অমানসিক চাপের ফলে মারা গিয়েছেন, তাঁদের পরিবারের পাশে আমরা আছি। প্রত্যেক পরিবারকে দু’লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।” তাঁর বক্তব্যে ছিল ক্ষোভও, কারণ মানুষের মধ্যে এমন আতঙ্ক তৈরির জন্য তিনি সরাসরি কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনকে কাঠগড়ায় তোলেন।
এর পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৩ জন ব্যক্তি পাবেন এক লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা। এঁদের মধ্যে রয়েছেন বুথ-লেভেল অফিসার বা বিএলও-রা (BLO), যাঁরা অতিরিক্ত কাজের চাপ এবং সময়সীমার চাপ সামলাতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই ১৩ জনের মধ্যে তিন জন বিএলও-ও রয়েছেন। তাঁরা কাজের চাপে ভেঙে পড়েছেন। সরকার তাঁদের পাশে থাকবে।”
রাজ্যে মাত্র এক মাসের মধ্যে বিএলওদের মৃত্যুর হারও উদ্বেগজনক। সরকারি সূত্র অনুযায়ী, ‘কাজের চাপে’ এখনও পর্যন্ত চার জন বিএলও-র মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই চার জনের মধ্যে দু’জনের পরিবারকে ইতিমধ্যেই দুই লক্ষ টাকা করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। বাকি পরিবারগুলির ক্ষেত্রেও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বাংলায় এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ২৮ অক্টোবর। প্রথম দিনেই উত্তর ২৪ পরগনার খড়দহে প্রদীপ কর (Pradip Kar) নামে এক ব্যক্তির আত্মহত্যার ঘটনা রাজ্যকে নাড়িয়ে দেয়। এরপর থেকে একের পর এক মৃত্যু, আতঙ্কে হৃদ্রোগ, ব্রেন স্ট্রোক, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়। মুখ্যমন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, গণনাপত্র বা এনুমারেশন ফর্ম পূরণ এবং যাচাইয়ের মধ্যেই মোট ৩৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর প্রায় অর্ধেকই আত্মহত্যা করেছেন বলে দাবি। অন্যদের মৃত্যু হয়েছে হৃদ্রোগ ও স্ট্রোকে, যা চিকিৎসকদের মতে অতিরিক্ত মানসিক চাপের ফল। এই ঘটনাগুলিকে কেন্দ্র করে রাজনীতির পারদও চড়ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের পক্ষ থেকে অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়া কেন্দ্রের চাপিয়ে দেওয়া ‘অযৌক্তিক এবং অমানবিক’ ব্যবস্থা, যা সাধারণ মানুষের মাথায় বিপুল চাপ সৃষ্টি করেছে। অন্যদিকে বিরোধী দল বিজেপি (BJP) দাবি করছে, এটা সম্পূর্ণ রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যর্থতা, এবং সরকার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিষয়টিকে অতিরঞ্জিত করছে।
রাজনৈতিক টানাপড়েনের মাঝে মুখ্যমন্ত্রীর এই আর্থিক সাহায্যের ঘোষণা সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি জাগিয়েছে। বিশেষত সেই পরিবারগুলির কাছে যাঁরা আকস্মিক মৃত্যুর পর চরম অনিশ্চয়তায় রয়েছেন। নবান্ন সূত্রে জানা যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা জেলা প্রশাসন থেকে পাঠানো হয়েছে এবং দ্রুত আর্থিক সাহায্য পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ঘোষণা রাজ্যের সামাজিক পরিস্থিতিকে কিছুটা স্থিতিশীল করবে। কারণ এসআইআর-এর জটিলতা এবং তথ্য সংগ্রহের চাপ বহু মানুষের মনে ভয় সৃষ্টি করেছে। বিশেষত যাঁরা ডিজিটাল প্রক্রিয়া বা নথিপত্র সংগ্রহে অভ্যস্ত নন, তাঁদের জন্য এটি আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে। মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায়, “মানুষকে ভয় দেখানো আমাদের কাজ নয়। তাঁরা যাতে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।”
রাজ্যের প্রশাসনিক মহলও মনে করছে, এই আর্থিক সহায়তা এবং সরকারের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি ভবিষ্যতে অনুরূপ আতঙ্ক রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ফেলবে। তবে রাজনৈতিক বিতর্ক যে এখানেই শেষ নয়, তা দিনের দিন স্পষ্ট হচ্ছে। আগামী সপ্তাহেও বিধানসভায় এই বিষয় নিয়ে তীব্র আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত আরও বাড়বে, এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে মঙ্গলবারের ঘোষণাটি নিঃসন্দেহে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির জন্য বড় স্বস্তি এবং মানবিক উদ্যোগ বলেই ধরা হচ্ছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Berhampore Mamata Banerjee Rally | বহরমপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভা সফল করতে ধুলিয়ানে প্রস্তুতি সভা, আনারুল হক বিপ্লবের নেতৃত্বে কর্মীদের উৎসাহ




