সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে টানাপোড়েনের আবহ আরও ঘনীভূত। বিধানসভা ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই তৃণমূল কংগ্রেস -এর অন্দরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রকাশ্যে। এই পরিস্থিতিতেই কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরী (Adhir Chowdhury) সরাসরি তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) নিশানা করে কটাক্ষ করেছেন এবং একই সঙ্গে তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের জন্য কংগ্রেসের দরজা খুলে দেওয়ার ঘোষণা করেছেন।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হল বহিষ্কৃত তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) -এর বিরোধী দলনেতা হিসেবে উত্থান। তাঁর পাশে ৫৮ জন বিধায়কের সমর্থনের দাবি নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতিকে সামনে রেখেই অধীর চৌধুরী বলেন, ‘যে খেলা একসময় আপনারাই শুরু করেছিলেন, যেখানে রেফারি-আম্পায়ারও আপনারাই ছিলেন, আজ সেই একই খেলা চলছে। শুধু পরিচালনাকারীরা বদলে গিয়েছে।’ তাঁর এই মন্তব্য সরাসরি তৃণমূল নেতৃত্বকে উদ্দেশ্য করে। বহরমপুরে একটি সাংবাদিক বৈঠকে অধীর চৌধুরী তৃণমূলের কর্মীদের উদ্দেশে বলেন, ‘যাঁরা বুথে বুথে লড়াই করেছেন, আঘাত পেয়েছেন, দলকে ভালবেসে কাজ করেছেন, তাঁদের বলছি, কংগ্রেসের দরজা খোলা রয়েছে।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘আপনারা আসুন, আমরা আলোচনা করে আগামী দিনে বিজেপি (Bharatiya Janata Party) এবং তথাকথিত তৃণমূলের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়াইয়ের মঞ্চ তৈরি করব।’ তাঁর এই আহ্বান রাজ্যের বিরোধী রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
অধীরের বক্তব্যে উঠে আসে বৃহত্তর বিরোধী ঐক্যের প্রসঙ্গও। তিনি বলেন, ‘বাংলায় অন্য বিরোধী শক্তিগুলিকে একত্রিত করে একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা জরুরি। তা না হলে রাজ্যের রাজনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।’ এই মন্তব্য থেকে বোঝা যায়, কংগ্রেস এখন নতুন করে নিজেদের অবস্থান মজবুত করতে চাইছে। এই প্রসঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যও আলোচনায় এসেছে। তিনি বিরোধী দলগুলিকে ‘ইগো’ সরিয়ে একসঙ্গে বিজেপির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এমনকি ‘অতিবাম’ শক্তিকেও সঙ্গে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে অধীরের কটাক্ষ, ‘আজ যাঁরা ঐক্যের কথা বলছেন, একসময় তাঁরাই অন্য দল ভাঙিয়ে নিজেদের শক্তি বাড়িয়েছিলেন।’ তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে অধীর চৌধুরীর পর্যবেক্ষণও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘যাঁরা এখন বিদ্রোহী অবস্থানে রয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নির্দিষ্ট ভোটব্যাঙ্কের সমর্থনে জিতেছেন। ফলে তাঁরা সরাসরি বিজেপিতে যেতে পারছেন না।’ তাঁর কথায়, ‘এঁরা আপাতত দূরত্ব বজায় রাখছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থান কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এঁদের অনেকের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন অভিযোগে কেন্দ্রীয় তদন্ত চলছে। ফলে জনসমক্ষে দূরত্ব বজায় রাখলেও বাস্তবে অন্য চাপ কাজ করছে।’ অধীরের এই মন্তব্য রাজ্যের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ভোটের আগে অধীর চৌধুরী অভিযোগ করেছিলেন, তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) এবং তাঁর দলের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাক (I-PAC) -এর বিরুদ্ধে। তাঁর দাবি ছিল, কংগ্রেস প্রার্থীদের ফোন করে বিভিন্ন প্রলোভন দেওয়া হচ্ছিল। যদিও তৃণমূল সেই অভিযোগ অস্বীকার করেছিল, কিন্তু ভোটের পরবর্তী পরিস্থিতিতে উল্টো ছবি সামনে এসেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
বর্তমানে তৃণমূলের অন্দরে যে মতপার্থক্য তৈরি হয়েছে, তা একাধিক ঘটনায় প্রকাশ পেয়েছে। একদিকে নেতৃত্বের প্রশ্ন, অন্যদিকে সংগঠনের পুনর্গঠন, সব মিলিয়ে দলের ভিতরে চাপ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দলগুলি সুযোগ খুঁজছে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার। অধীর চৌধুরীর এই আহ্বান সেই প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তৃণমূলের তৃণমূল স্তরের কর্মীদের উদ্দেশে তাঁর সরাসরি ডাক রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। বিশেষ করে গ্রাম ও বুথ স্তরে কর্মীদের মনোভাব কোন দিকে যাচ্ছে, তা আগামী দিনে বড় ফ্যাক্টর হতে পারে। রাজনৈতিক মহলে এখন প্রশ্ন, তৃণমূলের এই অস্থিরতার সুযোগ কতটা নিতে পারবে কংগ্রেস। একই সঙ্গে বিজেপির অবস্থানও নজরে রাখা হচ্ছে। তিনটি বড় রাজনৈতিক শক্তির টানাপোড়েনে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি নতুন মোড়ে দাঁড়িয়ে।
আগামী দিনে এই পরিস্থিতি কোন দিকে এগোয়, তা নির্ভর করবে দলগুলির কৌশল, নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত এবং তৃণমূল স্তরের প্রতিক্রিয়ার উপর। তবে আপাতত বাংলার রাজনৈতিক মঞ্চে উত্তেজনা যে তুঙ্গে, তা নিয়ে কোনও সংশয় নেই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Adhir Ranjan Chowdhury on Mamata Banerjee | ‘রাহুল গান্ধীর কাছে হাতজোড় করতে হবে মমতাকে’ তৃণমূলকে তীব্র কটাক্ষ অধীর রঞ্জন চৌধুরীর



