সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক আরও এক ধাপ এগোতে চলেছে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন (Vladimir Putin) ভারতে পৌঁছনোর পর তাঁকে স্বাগত জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। ভারতের কূটনৈতিক সূচীতে এই সফর বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। দেশের সামনে অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা এবং জ্বালানি নিরাপত্তা, এই তিন ক্ষেত্রেই রাশিয়া একটি দীর্ঘমেয়াদি সহযোগী, আর তা নতুন করে তুলে ধরলেন প্রধানমন্ত্রী। সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্টে মোদী লেখেন, “Delighted to welcome my friend, President Putin to India. Looking forward to our interactions later this evening and tomorrow. India-Russia friendship is a time tested one that has greatly benefitted our people.” এতেই বুঝিয়ে দেন, সম্পর্ক শুধু আনুষ্ঠানিক নয়, তা গভীর বিশ্বাসের ওপর দাঁড়িয়ে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে দ্রুত বদলে যাওয়া জোট-সাম্য, পশ্চিমাদের সঙ্গে রাশিয়ার টানাপোড়েন, ইউক্রেন যুদ্ধ সবকিছু মিলিয়ে এই সফর দুই দেশের জন্যই কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত এমন এক অবস্থানে আছে যেখানে পশ্চিমা শক্তিগুলির সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখার পাশাপাশি রাশিয়ার সঙ্গেও ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব অটুট রাখতে চায়। পুতিনের সফর সেই নীতি বজায় রাখার স্পষ্ট উদাহরণ।
দিল্লির কূটনৈতিক মহল সূত্রে জানা যায়, দু’দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকে প্রতিরক্ষা সহযোগিতাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাবে। ভারত বহু দশক ধরে রাশিয়ার সামরিক প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। সেনাবাহিনীর বিভিন্ন অত্যাধুনিক অস্ত্র, যুদ্ধবিমান, সাবমেরিন- সব কিছুতেই রাশিয়ার উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রয়েছে। যদিও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারত আমেরিকা, ফ্রান্স, ইসরায়েল সহ একাধিক দেশের সঙ্গে সামরিক চুক্তি করেছে, তবুও রাশিয়া এখনও আগের মতোই গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এদিনও মোদীর পোস্টে বন্ধুত্বের ‘time tested’ বা পরীক্ষিত সম্পর্কের কথাটি বিশেষ করে উল্লেখ করেছিলেন, যা বিশেষজ্ঞরা পুনরায় রাশিয়াকে নিশ্চিত বার্তা হিসেবেই দেখছেন। উল্লেখ্য, জ্বালানি- নিরাপত্তাও আলোচনার বড় অংশ হতে চলেছে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ভারতের রাশিয়া থেকে ছাড়মূল্যে অপরিশোধিত তেল কেনা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নানা আলোচনা হয়েছে। যদিও ভারত বহুবার জানিয়েছে, তার লক্ষ্য একটাই, দেশের জনগণের স্বার্থে জ্বালানি-সংকটের সমাধান। জল্পনা রয়েছে, মোদী-পুতিন বৈঠকে তেলের সরবরাহ, পেমেন্ট মেকানিজম এবং জ্বালানি চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়েও আলোচনা হবে। দুই দেশের অর্থনৈতিক বোঝাপড়াকে আরও মজবুত করার দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে মনে করছেন কূটনীতিবিদেরা।
এদিকে ভারত-রাশিয়া সাংস্কৃতিক সম্পর্কও দীর্ঘদিনের। চলচ্চিত্র, শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি- সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা নজরকাড়া। পুতিনের সফর এই সহযোগিতাকে আরও বাড়ানোয় সাহায্য করবে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বে যখন মেরুকরণ প্রকট, তখন ভারত একধরনের ভারসাম্য রক্ষা করে চলেছে। এই কৌশল আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের প্রভাব ও গ্রহণযোগ্যতাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক এটিও উল্লেখ করছেন যে, কয়েক বছর ধরে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের বিদেশ সফর তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। সেই পরিস্থিতিতে ভারতের মাটিতে এসে এই উচ্চপর্যায়ের আলাপ, আলোচনায় যোগ দেওয়া- এই দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের গুরুত্বকেই আরও প্রতিষ্ঠিত করছে। ক্রেমলিনের তরফেও বারবার জানানো হয়েছে, ভারত শুধু এশিয়ার নয়, বিশ্বের অন্যতম নির্ভরযোগ্য ও গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তাই পুতিনের সফর রাশিয়ার কৌশলগত অগ্রাধিকারেরই প্রতিফলন। প্রসঙ্গত, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর পোস্ট ঘিরে ইতিমধ্যেই আলোচনা শুরু হয়েছে। অনেকেই মন্তব্য করছেন, ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক নতুন যুগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে। বর্তমানে আন্তর্জাতিক অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও ভূরাজনীতি- সব ক্ষেত্রেই দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বিশ্ব রাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। অন্যদিকে বিরোধীদের একাংশ আবার মনে করছেন, রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ালে পশ্চিমাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক কীভাবে প্রভাবিত হবে, সেটিও বিবেচনার বিষয়।
কিন্তু, যে দিকটি সবচেয়ে স্পষ্ট তা হল, ভারত-রাশিয়া বন্ধুত্ব কোনও তাৎক্ষণিক লাভ-ক্ষতির হিসাব নয়, তা, সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এক সম্পর্ক। মোদীর সোশ্যাল পোস্টে ‘friend’ শব্দটির ব্যবহারের মধ্যেই একরকম রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে, এটি শুধু কূটনৈতিক সফর নয়, বরং বহু দশকের ঐতিহাসিক বন্ধনকে আরও দৃঢ় করার এক প্রয়াস। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আগামী বৈঠকে প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, জ্বালানি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহ একাধিক বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হতে পারে বলেই মনে করা হচ্ছে। বিশ্বরাজনীতির উত্তাল সময়ে এই সফর ভবিষ্যৎ ভারত-রাশিয়া সম্পর্ককে কোন পথে নিয়ে যায়, সেটাই এখন দেখার অপেক্ষা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :




