বিনীত শর্মা, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : মাত্র পনেরো বছর বয়সে ঘর ছেড়ে পালানো এক কিশোরী, হাতে ছিল মাত্র ৩০০ টাকা আর পিঠে ছিল জীবনের কঠিন বাস্তবতা। সেই মেয়েটিই আজ ভারতের অন্যতম সফল ফ্যাশন জুয়েলারি ব্র্যান্ডের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর নাম চিনু কলা (Chinu Kala)। রাজস্থানের এক সাধারণ পরিবারের মেয়ের জীবন সংগ্রামের পথ আজ ৩০০ কোটির ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের শক্ত ভিত হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাফল্যের শিখরে পৌঁছতে তাঁর যে লড়াই, তা আজ কোটি মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখায়। ১৯৮১ সালের ১০ অক্টোবর জন্ম, চিনুর শৈশব খুব সুখের ছিল না। মাত্র এক বছর বয়সেই তাঁর মা সৌদি আরবে চলে যান। বাবা ও সৎমায়ের সঙ্গে বড় হওয়া এই মেয়েটির জীবনে ছিল অশান্তি, আর্থিক অনটন এবং অদম্য বেঁচে থাকার তাগিদ। সে বুঝত, নিজের পথ নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে। আর এই উপলব্ধিই তাঁকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছিল।
১৫ বছর বয়সে দিনের পর দিন চলতে থাকা পারিবারিক অশান্তি থেকে মুক্তি পেতে চিনু একদিন হঠাৎ বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েন। শুধু তিনশো টাকা ও পরনের পোশাক নিয়েই তাঁর যাত্রা শুরু হয় অজানার পথে। স্বপ্ননগরী মুম্বইয়ে এসে প্রথম দু’দিন রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই রাত কাটাতে হয়েছিল তাঁকে। মুম্বই শহরের হাজারো ব্যস্ততার মধ্যে এক অপরিচিত কিশোরীর সেই অসহায়তা আজও তিনি ভুলতে পারেন না। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, “ওই দুই রাত আমাকে ভেঙে দিতে পারত। কিন্তু বরং আমাকে শক্ত করে দিয়েছিল।” তাঁর সেই লড়াইয়ের দিনগুলোয় ভাগ্যের চাকা ঘুরতে শুরু করে এক অচেনা মহিলার সৌজন্যে। স্টেশনে বিমর্ষ হয়ে বসে থাকা চিনুকে সাহায্যের প্রস্তাব দেন তিনি। তাঁর মাধ্যমেই চিনু প্রথম কাজ পান, দরজায় দরজায় ঘুরে ছুরির সেট, কোস্টারসহ নানান ছোটো পণ্য বিক্রি করতে হতো তাঁকে। দিনে কখনও ২০ টাকা, কখনও ৬০ টাকা প্রাপ্তিই তাঁর রোজগার ছিল। আবার ২০ টাকার বিনিময়ে ছোটো একটি ডর্মিটরিতে রাত কাটানোর সামান্য আশ্রয় জুটেছিল।
প্রতিদিন অজস্র বাড়ির দরজা মুখের উপর বন্ধ হয়ে যেত। তবু থামেননি চিনু। কঠোর পরিশ্রম ও ধৈর্যই তাঁকে এগিয়ে দেয়। মাত্র এক বছরের মধ্যেই একই সংস্থা তাঁকে সুপারভাইজার পদে উন্নীত করে, এ যেন জীবনের প্রথম বড় জয়। তারপর ২০০০ সালে ঘাটকোপারে এক পোশাকের দোকানে সেলস গার্ল হিসাবে কাজ শুরু করেন চিনু। সেখানে গ্রাহকের আচরণ, পরিষেবার গুরুত্ব, এসব শিখে নেন হাতে-কলমে। পরে রেস্তরাঁয় ওয়েট্রেস, টেলিকলার, রিসেপশনিস্ট সব ধরনের কাজ তিনি করেছেন। কখনও সকাল থেকে বিক্রি, আবার সন্ধ্যায় রেস্তরাঁয় খাবার পরিবেশন, এই ডুবসাঁতারের মধ্যেই তিনি জীবনের নতুন পথ খুঁজে পেয়েছিলেন। পাশাপাশি কিছু মডেলিংয়ের কাজও করেছিলেন তিনি, যা পরে তাঁর কেরিয়ারের মোড় ঘোরাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়।
মুম্বাইয়ের টাটা কমিউনিকেশনসে টেলিমার্কেটিং বিভাগে কাজ করার সময় অমিত কলা (Amit Kala)-র সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। পরে ২০০৪ সালে তাঁদের বিয়ে হয়। চিনুর কথায়, “অমিত আমাকে বিশ্বাস করতে শিখিয়েছিলেন, নিজেকে, নিজের সামর্থ্যকে।” স্বামীর উৎসাহেই তিনি জীবনে বড় ঝুঁকি নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। শুধু তা-ই নয়, ২০০৮ সালে একটি সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায় শীর্ষ দশে জায়গা করে নেন চিনু। পরে মিসেস ইন্ডিয়া প্রতিযোগিতার ফাইনালেও পৌঁছেছিলেন, যদিও ইংরেজিতে উত্তর দিতে না পারায় শেষ পর্যন্ত বাদ পড়তে হয়। তবে এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে কর্পোরেট দুনিয়ায় প্রবেশের অনুপ্রেরণা দেয়। তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘Fonte Corporate Solutions’, যা অল্প সময়েই Sony, ESPN, Airtel-এর মতো নামী ব্র্যান্ডের জন্য পণ্য তৈরি করে সুনাম অর্জন করে।
মডেলিংয়ের অভিজ্ঞতা থেকে চিনুর মনে ফ্যাশন জুয়েলারির প্রতি ভালবাসা জন্ম নেয়। সচ্ছলতার সঙ্গে সঙ্গে ব্যবসা শুরু করার সাহসও বাড়ে। ২০১৪ সালে বেঙ্গালুরুর ফিনিক্স মল-এ মাত্র ৩৬ বর্গফুট জায়গা নিয়ে তাঁর জুয়েলারি ব্র্যান্ডের যাত্রা শুরু হয়। পুঁজি ছিল মাত্র ৩ লক্ষ টাকা। কিন্তু প্রথম দিনেই বিক্রি হয়েছিল দেড় লক্ষ টাকার পণ্য, এ যেন আগাম সাফল্যের বার্তা। কোভিডের সময়ে যখন দেশের বহু ব্যবসা ধাক্কা খেল, চিনুর ব্র্যান্ড অনলাইন বিক্রিতে নতুন গতি পেল। ২০২৪ সালে তাঁর সংস্থার বার্ষিক আয় পৌঁছে যায় ৪০ কোটি টাকায়। বর্তমানে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ ও কোচিতে রয়েছে তাঁদের আউটলেট। অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও বিপুল সাফল্য পেয়েছে ব্র্যান্ডটি। এমনকী ‘শার্ক ট্যাঙ্ক’-এও ১.৫ কোটি টাকার চুক্তি পেয়েছেন চিনু। প্রতিষ্ঠার পর থেকে তাঁর সংস্থার মোট বিক্রি ইতিমধ্যেই ছাড়িয়েছে ৩১০ কোটি টাকা। যে ১৫ বছরের কিশোরী দুই রাত স্টেশনে কাটিয়েছিলেন, তিনিই এখন ভারতীয় ফ্যাশন জুয়েলারি বাজারে এক সফল আইকন। চিনু কালার গল্প শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের নয়, এটি সাহস, অধ্যবসায়, আত্মবিশ্বাস আর অদম্য লড়াইয়ের এক অনন্য উদাহরণ।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Palak Muchhal charity, Palak Muchhal Guinness Book | নিঃশব্দে ৩,৮০০ শিশুর প্রাণরক্ষা! গিনেস বুকে ইতিহাস গড়লেন পালক মুচ্ছল, মানবসেবায় নতুন নজির




