সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত দর্শনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজ্যের এক বিশেষ রূপবদলের সময় আগামী ‘২৬ যা এক নতুন যুগের সূচনা ঘটতে চলেছে। কে হবে এই রাজ্যের মুখ্য মুখ। জনগণ কি চাইছে সমস্ত কিছু নিয়ে রাজনৈতিক কলমে কলম ধরলেন–
দেবব্রত সরকার
(আজ চৌদ্দতম কিস্তি)

২০২১-এর লড়াই থেকে ২০২৬-এর প্রস্তুতি – পরিবর্তনের গল্পে কে এগিয়ে, কে পিছিয়ে?
পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি মানেই আবেগ, প্রতিবাদ, রঙ এবং পরিবর্তনের অঙ্গীকার। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন ছিল সেই ইতিহাসের নতুন অধ্যায়, যেখানে রাজ্যবাসী আবারও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) বিপুলভাবে ভরসা করেছিলেন। যদিও নন্দীগ্রামে তিনি নিজে পরাজিত হন, কিন্তু তার দল সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস (All India Trinamool Congress – AITC) ২১৩টি আসনে জয়ী হয়ে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। বিজেপি (Bharatiya Janata Party – BJP) শক্তিশালী বিরোধী শক্তি হিসেবে ৭৭টি আসন জয় করে রাজ্যের রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো একটি ঐতিহাসিক উপস্থিতি স্থাপন করে। ২০২১ সালের ২ মে ঘোষিত ফলাফল শুধু এক নির্বাচনের সমাপ্তি ছিল না, বরং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মেরুকরণের নতুন যুগের সূচনা। রাজ্যের রাজনীতি তখন ত্রিমুখী প্রতিযোগিতার মাঝে আটকে ছিল। একদিকে তৃণমূলের সংগঠনিক শক্তি ও মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, অন্যদিকে বিজেপির ‘পরিবর্তনের ডাক’, আর অন্য প্রান্তে বাম ও কংগ্রেসের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।

তৃণমূল কংগ্রেস ২৯০টি আসনে সরাসরি প্রার্থী দেয়, বাকি কয়েকটি আসনে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা (GJM) ও এক নির্দল প্রার্থীকে সমর্থন করে। অপরদিকে বিজেপি ২৯৩টি আসনে লড়ে এবং একটি আসনে জোটসঙ্গী অল ঝাড়খণ্ড স্টুডেন্টস ইউনিয়নকে (AJSU) সমর্থন জানায়। বামফ্রন্ট (Left Front), কংগ্রেস (INC) ও ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (ISF)-এর সংযুক্ত মোর্চা ছিল এক প্রয়াস বিজেপি-বিরোধী ভোট একত্র করার। কিন্তু বাস্তবে এই সমীকরণ ভোটারদের মন জিততে ব্যর্থ হয়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল যে রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছিল- “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়” তা গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কে গভীর প্রভাব ফেলে। কৃষক, মহিলা, সংখ্যালঘু এবং নিম্নআয়ের শ্রেণির মধ্যে তার প্রভাব অব্যাহত ছিল। বিশেষত, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার (Lakshmir Bhandar), স্বাস্থ্য সাথী (Swasthya Sathi) ও কন্যাশ্রী (Kanyashree)-র মতো জনমুখী প্রকল্পগুলো তৃণমূলকে রাজনৈতিক মেরুদণ্ডে রূপান্তরিত করে।
অন্যদিকে বিজেপি তাদের প্রচারে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের শক্তি ব্যবহার করে, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের (Amit Shah) একাধিক জনসভা রাজ্যে অনুষ্ঠিত হয়। “আর নয় অন্যায়”, “দিদিকে জবাব দেবে বাংলা” এই স্লোগানগুলো রাজ্যের শহুরে ও তরুণ ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেললেও, গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কে তা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। যাদিও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, ২০২১-এর ভোটে বিজেপি দ্বিতীয় দল হিসেবে যে শক্তি অর্জন করেছে, তা পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে নজিরবিহীন। পূর্ববর্তী নির্বাচনে যেখানে বিজেপির ভোট শতাংশ ছিল ১০-এর নিচে, সেখানে ২০২১ সালে তা প্রায় ৩৮% ভোটে পৌঁছায়। অর্থাৎ, বিজেপি ভোটের মেরুকরণে সফল হলেও তৃণমূলের সংগঠনিক বিস্তার এবং স্থানীয় নেতৃত্বের প্রভাবের কাছে তারা থমকে যায়।
বামফ্রন্ট ও কংগ্রেসের জন্য এটি ছিল রাজনৈতিক অস্তিত্বের সংকটের নির্বাচন। তারা একটিও আসন জয় করতে পারেনি, যা তাদের দীর্ঘ রাজনৈতিক ঐতিহ্যের জন্য এক গভীর ধাক্কা। একমাত্র ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (ISF) একটি আসন জিতে মুখরক্ষা করে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, সংযুক্ত মোর্চার ভোট তৃতীয় শক্তি হিসেবে বিভাজিত হওয়ায় তা কার্যত তৃণমূলের পক্ষে গিয়েছে।
নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরাজয় ছিল নাটকীয়। শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari), যিনি একসময় তৃণমূলেরই নেতা ছিলেন এবং পরে বিজেপিতে যোগ দেন, মাত্র ১৯৫৬ ভোটে মমতাকে হারিয়ে দেন। এই ফলাফল মমতা স্বীকার না করে কলকাতা হাইকোর্টে চ্যালেঞ্জ করেন। মামলাটি এখনও বিচারাধীন। তবুও, তার দল ২১৫ আসন নিয়ে তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করে, এবং ৫ মে ২০২১-এ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন।

২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আবারও এক উত্তপ্ত প্রস্তুতির পর্যায়ে— ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন সামনে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখনো রাজ্যের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু, কিন্তু বিজেপি তাদের সংগঠনকে আরও শক্তিশালী করতে জোর দিচ্ছে। রাজ্যে অমিত শাহ ও জে.পি. নাড্ডা (J.P. Nadda)-র ঘন ঘন সফর, বুথভিত্তিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি, মহিলা ভোটারদের সংযোগ অভিযান সবই ২০২৬-এর লক্ষ্যপূরণের প্রস্তুতি।
তৃণমূলও পিছিয়ে নেই। “দিদির দূত” ও “বাংলা নিজের মেয়েকেই চায়”-এর নতুন সংস্করণ নিয়ে দল মাঠে নেমেছে। স্থানীয় স্তরে প্রশাসনিক সাফল্য তুলে ধরে তৃণমূল নতুন ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। মমতার দল জানে বিজেপি গ্রামীণ ভোটে প্রবেশ করতে মরিয়া, তাই তৃণমূলও তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনকে আরও শক্ত করছে। অন্যদিকে, বাম ও কংগ্রেস এখনও নেতৃত্ব সংকটে। যদিও যুবদের নিয়ে “নতুন সংযুক্ত মোর্চা” গঠনের কথা আলোচনায় রয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক মাটিতে তারা এখনও দূর্বল।এক জনৈক রাজনীতির বিশ্লেষক (Bishwarup Bhattacharya) বলেন, “২০২৬ সালের নির্বাচন হবে এক রাজনৈতিক বাস্তবতার লড়াই। তৃণমূল তার প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও কল্যাণমূলক প্রকল্প নিয়ে মাঠে নামবে, আর বিজেপি জাতীয়তাবাদী আবেগ ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতার সমীকরণ দেখাবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেবে বাংলার সাধারণ মানুষ তারা কি স্থায়িত্ব চায়, না পরিবর্তন।” গ্রামীণ বাংলায় এখনো মমতার জনপ্রিয়তা অটুট, বিশেষত মহিলাদের মধ্যে। কিন্তু শহুরে মধ্যবিত্ত ভোটারদের একাংশ ক্রমেই বিজেপির দিকে ঝুঁকছে। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্ম চাকরির অভাব ও দুর্নীতি ইস্যুতে তৃণমূলের প্রতি আস্থা কিছুটা হারাচ্ছে।

বিজেপি “ডাবল ইঞ্জিন সরকার”-এর ডাক দিয়ে কেন্দ্র ও রাজ্যের উন্নয়নকে একত্রিত করার বার্তা দিচ্ছে। কিন্তু তৃণমূল পাল্টা বলছে- “বাংলার গরিমা, বাংলার সংস্কৃতি ও আত্মনির্ভরতা”র মডেলই রাজ্যের আসল উন্নয়নের পথ। ২০২১-এর পর থেকে রাজ্যের রাজনীতিতে ক্রমেই প্রশাসন, দুর্নীতি, শিক্ষক নিয়োগ ও ঘুষকাণ্ডের ইস্যু ভোটের আলোচনায় এসেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার দলের দুর্নীতিতে জড়িত নেতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিচ্ছেন, যাতে ২০২৬-এর আগে দলের ভাবমূর্তি উদ্ধার করা যায়। একই সঙ্গে তৃণমূল নেতৃত্ব বুঝে গেছে, শুধু উন্নয়নের বার্তা নয়, আবেগের রাজনীতিই পশ্চিমবঙ্গে ফলাফল নির্ধারণ করে। তাই দিদির জনসংযোগ অভিযান- “দিদিকে বলো”, “দিদির সুরক্ষা কবচ”-আবারও পুনরুজ্জীবিত করা হচ্ছে।
২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমবঙ্গ এখন এক দোলাচলে। একদিকে তৃণমূলের সংগঠন ও প্রশাসনিক ভিত্তি, অন্যদিকে বিজেপির জাতীয় নেতৃত্ব ও আক্রমণাত্মক প্রচার। রাজ্যের রাজনীতি যেন আবারও ফিরে যাচ্ছে আবেগ, পরিচয় ও পরিবর্তনের ত্রিমুখী সংঘর্ষে। শেষ পর্যন্ত, যে দল বাংলার মানুষকে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার ভাষায় বুঝতে পারবে, তারাই জিতবে ২০২৬-এর মঞ্চে।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত




