সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : আন্তর্জাতিক কূটনীতির মঞ্চে নতুন করে উত্তাপ ছড়াল বেজিঙের এক বৈঠককে ঘিরে। চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিঙ (Xi Jinping)-এর সঙ্গে প্রায় তিন ঘণ্টার দীর্ঘ বৈঠক করলেন ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টার্মার (Keir Starmer)। এই বৈঠক শুধু লন্ডন ও বেজিঙের সম্পর্কের দিক বদলের ইঙ্গিতই দেয়নি, বরং অস্বস্তিতে ফেলেছে আমেরিকাকেও। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) -এর এক লাইনের সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন করে জল্পনার জন্ম দিয়েছে, চিনের দিকে ঝুঁকলে কি ‘বিশেষ বন্ধুত্বে’ ফাটল ধরবে ব্রিটেন ও আমেরিকার মধ্যে? বৃহস্পতিবার বেজিঙে বৈঠক শেষে স্টার্মার জানান, চিনের সঙ্গে ব্রিটেনের সম্পর্ক আরও ‘পরিশীলিত ও ঘনিষ্ঠ’ হতে চলেছে। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার পাশাপাশি বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো, শুল্ক হ্রাস এবং পারস্পরিক বিনিয়োগ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই আলোচনার ফলে চিন ও ব্রিটেনের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও মজবুত ভিত্তির উপর দাঁড়াবে। আন্তর্জাতিক বাজারে অনিশ্চয়তার সময়ে এই সহযোগিতা উভয় দেশের জন্যই লাভজনক হতে পারে বলে মত আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের।
কিন্তু এই ঘনিষ্ঠতার খবরে খুশি নয় ওয়াশিংটন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ট্রাম্প এক লাইনে ব্রিটেনকে সতর্ক করে বলেন, ‘ওরা যদি এটা করে, তবে ওদের পক্ষে খুবই বিপজ্জনক হবে।’ ঠিক কোন বিপদের কথা তিনি বলছেন, তা খোলসা করেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। আমেরিকা কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে, সে বিষয়েও তিনি কোনও স্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি। তবে তাঁর এই মন্তব্যই যথেষ্ট ছিল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে আলোড়ন তুলতে। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সতর্কবার্তার নেপথ্যে রয়েছে আমেরিকার দীর্ঘদিনের উদ্বেগ, চিনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব। অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও ভূরাজনীতিতে চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নামতে গিয়ে আমেরিকা চায় তার ঘনিষ্ঠ মিত্ররা বেজিঙের থেকে দূরত্ব বজায় রাখুক। সেই প্রেক্ষিতেই ব্রিটেনের এই পদক্ষেপকে সন্দেহের চোখে দেখছে ট্রাম্প প্রশাসন।
এই ঘটনার আগে বেজিঙে গিয়েছিলেন আমেরিকার প্রতিবেশী দেশ কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নে (Mark Carney)। সেই সফরের পরেই কানাডার উপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ব্রিটেনের ক্ষেত্রেও কি একই ধরনের কড়া অবস্থান নিতে পারে আমেরিকা? যদিও এখনও পর্যন্ত তেমন কোনও সরকারি ঘোষণা আসেনি, তবু সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকেরা। ডাউনিং স্ট্রিট কিংবা চিনের বিদেশ মন্ত্রক, কেউই ট্রাম্পের অসন্তোষ নিয়ে প্রকাশ্যে মন্তব্য করতে চায়নি। তবে স্টার্মার জিনপিঙের সঙ্গে বৈঠককে অত্যন্ত ইতিবাচক বলেই ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর কথায়, এই আলোচনায় শুধু বাণিজ্য নয়, ভিসা ছাড়াই যাতায়াত, ব্রিটিশ হুইস্কির উপর শুল্ক হ্রাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও উঠে এসেছে। এর ফলে পর্যটন ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
চিনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলেও আমেরিকার সঙ্গে ব্রিটেনের বন্ধুত্বে কোনও আঁচ পড়বে না, এই দাবি জোর গলায় করেছেন স্টার্মার। তিনি বলেছেন, ‘আমেরিকার সঙ্গে প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা ও বাণিজ্য, সব ক্ষেত্রেই আমাদের ঘনিষ্ঠতম সম্পর্ক রয়েছে।’ তাঁর মতে, আমেরিকা ও চিনের মধ্যে থেকে একটিকে বেছে নেওয়ার কোনও প্রশ্নই নেই। ব্রিটেন স্বাধীনভাবে নিজের জাতীয় স্বার্থ দেখেই কূটনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তুলবে। তবে বাস্তব রাজনীতিতে বিষয়টি এতটা সহজ নয় বলেই মত পর্যবেক্ষকদের। আমেরিকা ও চিনের মধ্যে চলা ভূরাজনৈতিক টানাপড়েনের মাঝে ব্রিটেনকে ভারসাম্য রক্ষা করে চলতে হবে। একদিকে ঐতিহাসিক ‘বিশেষ সম্পর্ক’ বজায় রাখা, অন্যদিকে চিনের বিশাল বাজার ও বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানো, এই দুইয়ের সমন্বয়ই এখন স্টার্মারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
উল্লেখ্য যে, আগামী এপ্রিল মাসে চিন সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের। তার আগে এই মন্তব্যকে অনেকেই কৌশলগত চাপ সৃষ্টি বলেই দেখছেন। চিনের সঙ্গে আলোচনায় বসার আগে মিত্র দেশগুলিকে সতর্ক করে নিজের অবস্থান শক্ত করতে চাইছেন ট্রাম্প, এমন ব্যাখ্যাও উঠে আসছে। আন্তর্জাতিক কুটনৈতিক মহল সূত্রে উল্লেখ, বেজিঙের এই তিন ঘণ্টার বৈঠক শুধু চিন-ব্রিটেন সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ই নয়, বরং আমেরিকা-কেন্দ্রিক বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। স্টার্মার ট্রাম্পের সতর্কবার্তার পর কী কৌশল নেন, আমেরিকা আদৌ কোনও বাস্তব পদক্ষেপ করে কি না, এই প্রশ্নগুলির উত্তরই আগামী দিনে নির্ধারণ করবে আন্তর্জাতিক কূটনীতির গতিপথ।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Modi Xi Jinping meeting, India China relations, SCO | মোদী-শি জিনপিং বৈঠকে নতুন বার্তা: প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার- ভারত-চীন সম্পর্ক ঘিরে চীনা ও মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ



