বিনীত শর্মা ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, নতুন দিল্লি: সংসদে পেশ হল চলতি বছরের ইকোনমিক সার্ভে (Economic Survey)। ১ ফেব্রুয়ারি কেন্দ্রীয় বাজেটের ঠিক আগে, ২৯ জানুয়ারি এই সমীক্ষা প্রকাশ করে কেন্দ্র সরকার দেশের অর্থনীতির বর্তমান ছবি ও আগামী দিনের দিশা স্পষ্ট করল। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং মুদ্রাস্ফীতির চাপের মধ্যেও ভারতের অর্থনীতি যে স্থিতিশীল ও গতিশীল রয়েছে, তা স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে এই প্রতিবেদনে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণে এসেছে, ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা আরও শক্ত ভিতের উপর দাঁড়িয়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার ঐতিহাসিক উচ্চতায় পৌঁছেছে। ইকোনমিক সার্ভে অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে ভারতের প্রকৃত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার বা জিডিপি (GDP) বৃদ্ধির সম্ভাবনা ৭.৪ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। একই সঙ্গে চলতি অর্থবর্ষেও ভারত বিশ্বের দ্রুততম বর্ধনশীল প্রধান অর্থনীতি হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রেখেছে। সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বিনিয়োগের ধারাবাহিকতা এবং কাঠামোগত সংস্কারের ফলে দেশের অর্থনীতি এই গতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। সরকারের এক শীর্ষ আধিকারিকের কথায়, ‘বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও ভারতের অর্থনৈতিক ভিত্তি যথেষ্ট মজবুত।’
আগামী অর্থবর্ষের আগাম পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬.৮ শতাংশ থেকে ৭.২ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। অর্থাৎ গড় হিসেবে প্রায় ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত মিলছে। সমীক্ষার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই প্রবৃদ্ধির মূল চালিকা শক্তি হবে উৎপাদন খাত, পরিষেবা ক্ষেত্র এবং অবকাঠামো বিনিয়োগ। বিশেষ করে দেশীয় চাহিদা এবং সরকারি পুঁজিবিনিয়োগ অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে। রাজস্ব ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ছবি তুলে ধরেছে ইকোনমিক সার্ভে। ২০২৫ অর্থবর্ষে কেন্দ্রের মোট রাজস্ব আয় জিডিপির ৯.২ শতাংশে পৌঁছেছে। নন-কর্পোরেট কর আদায় বৃদ্ধি এবং সরাসরি কর ব্যবস্থার বিস্তার এই সাফল্যের অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন এবং করদাতার সংখ্যা বৃদ্ধি রাজস্ব সংগ্রহকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ব্যাঙ্কিং খাতের উন্নতি ইকোনমিক সার্ভের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে গ্রস নন পারফর্মিং অ্যাসেট বা এনপিএ (NPA) কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২.২ শতাংশে, যা বহু দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। আর্থিক সংস্কার, ব্যাঙ্কগুলির ব্যালান্স শিট পরিষ্কার করা এবং কঠোর নজরদারির ফলেই এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে বলে মত বিশেষজ্ঞদের। এক ব্যাঙ্কিং বিশেষজ্ঞের মন্তব্য, ‘এই এনপিএ হ্রাস প্রমাণ করে যে ভারতের আর্থিক ব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি স্থিতিশীল।’ আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য সাফল্যের কথা জানিয়েছে সমীক্ষা। প্রধানমন্ত্রী জন ধন যোজনা (PMJDY) -এর আওতায় ২০২৫ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত মোট ৫৫.০২ কোটি ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৬.৬৩ কোটি অ্যাকাউন্ট গ্রামীণ ও শহরতলি এলাকায়। এই প্রকল্প দেশের প্রান্তিক মানুষের আর্থিক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথ সুগম করেছে বলে মত সরকারের। এছাড়াও, শেয়ার বাজারেও খুচরা বিনিয়োগকারীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে ১২ কোটির বেশি ইউনিক বিনিয়োগকারী তৈরি হয়েছে, যাঁদের বড় অংশ প্রথমবারের মতো বাজারে পা রেখেছেন। এর মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ মহিলা বিনিয়োগকারী, যা দেশের আর্থিক সচেতনতা ও অন্তর্ভুক্তির প্রসারকে তুলে ধরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সহজ বিনিয়োগ ব্যবস্থাই এই প্রবণতার পিছনে বড় কারণ।
বৈদেশিক মুদ্রা ভাণ্ডারেও ভারতের অবস্থান অত্যন্ত শক্তিশালী। ২০২৬ সালের ১৬ জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের ফরেক্স রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৭০১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতিও নিম্নমুখী, যা সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির খবর। সমীক্ষায় বলা হয়েছে, খাদ্য ও জ্বালানির দামের স্থিতিশীলতা মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়ক হয়েছে। কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ছবি তুলে ধরা হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে খাদ্যশস্যের মোট উৎপাদন হয়েছে ৩,৫৭৭.৩ লাখ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় ২৫৪.৩ লাখ মেট্রিক টন বেশি। ধান, গম, ভুট্টা সহ একাধিক শস্যের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে। পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী কিসান সম্মান নিধি বা পিএম-কিসান যোজনা (PM-KISAN Yojana) -এর আওতায় এখন পর্যন্ত কৃষকদের ৪.০৯ লক্ষ কোটি টাকার বেশি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে গ্রামীণ চাহিদা এবং কৃষকের আয় বৃদ্ধিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও ইকোনমিক সার্ভে প্রত্যাশার ছবি দেখিয়েছে। প্রোডাকশন লিঙ্কড ইনসেনটিভ বা পিএলআই (PLI) স্কিমের আওতায় ১৪টি খাতে মোট ২ লক্ষ কোটি টাকার বেশি প্রকৃত বিনিয়োগ হয়েছে। এর ফলে অতিরিক্ত উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৮.৭ লক্ষ কোটি টাকা এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১২.৬ লক্ষের বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সরকারের দাবি, ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ উদ্যোগকে আরও শক্তিশালী করছে এই প্রকল্প।
প্রযুক্তি খাতে বিশেষ করে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বড় জোর দিয়েছে ভারত। ইন্ডিয়া সেমিকন্ডাক্টর মিশন (India Semiconductor Mission)-এর আওতায় ইতিমধ্যে ১০টি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে, যেখানে মোট বিনিয়োগ প্রায় ১.৬০ লক্ষ কোটি টাকার বেশি। দেশের বিভিন্ন রাজ্যে দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর হাব গড়ে তোলার কাজও শুরু হয়েছে, যা ভবিষ্যতে প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতার পথে বড় পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে। তবে, সার্বিক মূল্যায়নে ইকোনমিক সার্ভে বলছে, শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদা, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং ধারাবাহিক কাঠামোগত সংস্কারের জোরে ভারত বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও স্থায়ী উচ্চ প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে চলেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আসন্ন বাজেটে যদি এই গতি বজায় রাখার মতো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে আগামী বছরগুলিতে ভারতের অর্থনীতি আরও শক্ত ভিত পাবে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India GDP growth forecast, MoSPI | উৎপাদন ও পরিষেবা খাতে গতি সঞ্চার, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধি ৭.৪ শতাংশে পৌঁছনোর পূর্বাভাস



