সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের ব্যক্তিগত দর্শনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাজ্যের এক বিশেষ রূপবদলের সময় আগামী ‘২৬ যা এক নতুন যুগের সূচনা ঘটতে চলেছে। কে হবে এই রাজ্যের মুখ্য মুখ। জনগণ কি চাইছে সমস্ত কিছু নিয়ে রাজনৈতিক কলমে কলম ধরলেন–
দেবব্রত সরকার
(আজ তেরোতম কিস্তি)

পশ্চিমবঙ্গের ভোট রাজনীতি: তেরোতম অধ্যায়ে স্পর্শকাতর আসনে হাইভোল্টেজ লড়াই
পশ্চিমবঙ্গের (West Bengal) রাজনীতি সবসময়ই দেশের রাজনীতিতে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। এখানে নির্বাচন মানেই শুধু ভোট নয়! এটি আবেগ, প্রতিরোধ, সাংগঠনিক কৌশল, আর জনমতের স্রোতের সংঘাত। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, রাজ্যের রাজনৈতিক সমীকরণ ততই উত্তপ্ত হচ্ছে। স্পর্শকাতর ও প্রধান প্রধান বিধানসভা কেন্দ্রগুলোতে এখন হাইভোল্টেজ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress), ভারতীয় জনতা পার্টি (Bharatiya Janata Party – BJP), বাম-কংগ্রেস জোট (Left-Congress Alliance) – তিন পক্ষই সমান তৎপরতায় মাঠে নেমেছে। প্রতিটি দলের কৌশল, নেতৃত্বের স্টাইল, এবং তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনই এখন ভোটযুদ্ধের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।
দক্ষিণবঙ্গের বীরভূম (Birbhum), হাওড়া (Howrah), হুগলি (Hooghly) এবং উত্তরবঙ্গের কোচবিহার (Cooch Behar), আলিপুরদুয়ার (Alipurduar), মালদা (Malda) -এই সব জেলা রাজনৈতিকভাবে “স্পর্শকাতর” হিসেবে চিহ্নিত। প্রশাসনের একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এই এলাকাগুলোতেই সবচেয়ে বেশি ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, বীরভূম ও নদীয়া (Nadia) জেলা এবারও ভোট রাজনীতির কেন্দ্রে থাকবে। একদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) নেতৃত্বাধীন তৃণমূল, অন্যদিকে বিজেপির (BJP) সাংগঠনিক আগ্রাসন আর মাঝখানে কংগ্রেস-বামের মরিয়া প্রত্যাবর্তনের চেষ্টা। বিজেপি রাজ্যের গ্রামীণ ভোটব্যাঙ্কে তাদের প্রভাব ধরে রাখতে চাইছে, অন্যদিকে তৃণমূল শহরাঞ্চলে নিজেদের সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্পের সাফল্য তুলে ধরছে।
তৃণমূলের কৌশল
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) নেতৃত্বে ‘নব জোয়ার’ (Nabo Jowar) কর্মসূচি ইতিমধ্যেই বহু ব্লকে শক্তিশালী সাড়া ফেলেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ ২৪ পরগনা (South 24 Parganas), পূর্ব মেদিনীপুর (East Midnapore), এবং উত্তর ২৪ পরগনা (North 24 Parganas) জেলায় অভিষেকের মাঠপর্যায়ের সফর ভোটারদের মধ্যে নতুন আস্থা তৈরি করেছে। তৃণমূলের বার্তা স্পষ্ট “আমাদের লড়াই উন্নয়নের, বিভেদের নয়।” দলের এক শীর্ষ নেতা বলেন, “বাংলার মানুষ শান্তি ও উন্নয়ন চায়। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে আমরা সেটা পৌঁছে দিতে সক্ষম হয়েছি।”
বিজেপির পরিকল্পনা
অন্যদিকে বিজেপির লক্ষ্য এখন স্পষ্টভাবে উত্তরবঙ্গ (North Bengal) ও জঙ্গলমহল (Junglemahal) অঞ্চল। ২০২১-এর নির্বাচনে এই এলাকাগুলোয় বিজেপি উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছিল। এবার দল সেই ঘাঁটি ধরে রাখতে চায়। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের সাফ বক্তব্য- “আমরা উন্নয়নের রাজনীতি করি, দুর্নীতির নয়। মমতার সরকার দুর্নীতি ঢাকতে উন্নয়নের নাম নিচ্ছে। মানুষ এবার হিসাব চাইবে।” বিশেষ করে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি (Jalpaiguri), বাঁকুড়া (Bankura) এবং পুরুলিয়া (Purulia)-তে বিজেপির সাংগঠনিক কর্মসূচি এখন তুঙ্গে। কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাধিক সফরও ইতিমধ্যেই নির্ধারিত হয়েছে।
বাম ও কংগ্রেসের প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন
বাম-কংগ্রেস জোটের (Left-Congress Alliance) লক্ষ্য এবার নিজেদের রাজনৈতিক অস্তিত্ব পুনরুদ্ধার করা। তারা গ্রামীণ ভোটারদের মধ্যে “দুর্নীতি-বিরোধী বিকল্প” হিসেবে নিজেদের তুলে ধরছে। সিপিএমের (CPI(M)) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম (Mohammed Salim) বলেছেন, “দু’টি দলই (তৃণমূল ও বিজেপি) জনগণকে বিভক্ত করছে। আমরা চাই এক মানবিক রাজনীতি, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, নারী সবার কণ্ঠস্বর থাকবে।” মালদা ও মুর্শিদাবাদে (Murshidabad) কংগ্রেস এখনো তাদের পুরনো প্রভাব ধরে রেখেছে। অধীর রঞ্জন চৌধুরী (Adhir Ranjan Chowdhury) প্রকাশ্যে বলেছেন, “বাঙলার রাজনীতিতে বিকল্প আমরা। মানুষ ধীরে ধীরে সেটা উপলব্ধি করছে।”
স্পর্শকাতর আসনগুলোর তালিকা
রাজ্য নির্বাচন কমিশনের (Election Commission of West Bengal) সূত্রে জানা গেছে, অন্তত ৫৬টি বিধানসভা আসন ‘স্পর্শকাতর’ হিসেবে চিহ্নিত। এর মধ্যে রয়েছে-
- নন্দীগ্রাম (Nandigram)
- বীরভূমের লাভপুর (Labhpur)
- হাওড়ার উলুবেড়িয়া দক্ষিণ (Uluberia South)
- কোচবিহারের দিনহাটা (Dinhata)
- উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ দক্ষিণ (Bongaon South)
- মালদা দক্ষিণ (Malda South)
এই আসনগুলিতে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন বিশেষ নজর রাখছে। ২০২১ সালের নির্বাচনের সময় যেখানে অশান্তি হয়েছিল, সেগুলোতেই এবার অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের সম্ভাবনা রয়েছে।

মাঠে সংগঠন ও কর্মী-যুদ্ধ
তৃণমূলের ভোটযন্ত্র এখনো গ্রামীণ স্তরে শক্তিশালী। রাজ্যজুড়ে মহিলা ভোটারদের মধ্যে তৃণমূলের জনপ্রিয়তা স্থিতিশীল। ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ (Lakshmir Bhandar), ‘সাস্থ্য সাথী’ (Swasthya Sathi), এবং ‘খেলা হবে দিবস’-এর মতো উদ্যোগ ভোটারদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে, বিজেপির প্রচারে “দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই” এবং “কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সঠিক বাস্তবায়ন” – এই দুই বার্তা কেন্দ্রে রয়েছে। তারা দাবি করছে, তৃণমূলের প্রশাসনিক ব্যবস্থা এখন ঘুণধরা, যা জনগণ বদলাতে চায়।
ভোটের আগের জনমত
সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, শহরাঞ্চলে তৃণমূলের প্রভাব এখনো প্রবল, কিন্তু উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলে বিজেপি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় শক্ত অবস্থান নিচ্ছে। বাম-কংগ্রেস জোটের সমর্থন গ্রামীণ মধ্যবিত্ত ও ছাত্রসমাজে কিছুটা বাড়ছে, তবে তাদের সংগঠনের সীমাবদ্ধতা এখনো বড় বাধা। জনৈক রাজনৈতিক বিশ্লেষক বলেন, “২০২৬-এর নির্বাচন হবে এক অদ্ভুত মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। ভোটারদের মনে এবার প্রশ্ন ‘আমরা পরিবর্তন চাই, নাকি স্থিতিশীলতা?’ এই দ্বন্দ্বই নির্ধারণ করবে ফলাফল।”
রাজনৈতিক সহিংসতা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি
রাজ্য প্রশাসন ইতিমধ্যেই জেলা প্রশাসনগুলিকে স্পর্শকাতর এলাকায় বিশেষ সতর্কতা নিতে নির্দেশ দিয়েছে। নিরাপত্তা, ভোটার তালিকা, এবং আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ সুপারদের সঙ্গে মুখ্যসচিবের বৈঠক হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের (West Bengal Police) এক আধিকারিক বলেন, “নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করা আমাদের প্রধান লক্ষ্য। কোনও প্রকার রাজনৈতিক হিংসা সহ্য করা হবে না।”
(চলবে)
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত




