তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দীপাবলির আগে ধনতেরস (Dhanteras) নিয়ে উৎসাহ চরমে। সোনার গয়না থেকে নতুন বাসন, এমনকী গৃহস্থালির সামগ্রী সবকিছুতেই যেন লেগেছে শুভ কেনাকাটার ছোঁয়া। কিন্তু জ্যোতিষ শাস্ত্র বলছে, ধনতেরসের দিনে শুধু শখের জিনিস কিনলেই হবে না, ত্রয়োদশী তিথি ও শুভ অমৃতযোগ (Amrit Yog) মেনে কেনাকাটা করলে তবেই দেবী লক্ষ্মী (Goddess Lakshmi) সত্যিকারের প্রসন্ন হন। তাই ২০২৫ সালের ধনতেরসে কখন, কোন সময়ে কেনা শুভ, তা জানাই জরুরি।
ধনতেরস শব্দটি এসেছে ‘ধন’ ও ‘তেরস’ থেকে, অর্থাৎ সম্পদের ত্রয়োদশী তিথি। সংস্কৃত নাম ‘ধনত্রয়োদশী’ (Dhamtrayodashi)। শাস্ত্রমতে, এই দিনেই দেবী লক্ষ্মী এবং আয়ুর্বেদের দেবতা ধন্বন্তরি (Dhanvantari) সমুদ্রমন্থন থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন। বলা হয়, দেব-অসুরের সমুদ্র মন্থনের সময় এই শুভ তিথিতেই অমৃত পাত্র হাতে উঠে আসেন ধন্বন্তরি, আর সঙ্গে জন্ম নেন মহালক্ষ্মী, সমৃদ্ধি, সৌভাগ্য ও ধনের প্রতীক হিসেবে। তাই এই তিথিকে অর্থভাগ্যের সূচনাতিথি হিসেবে মানা হয়।বিশ্বাস করা হয়, এই দিন ঘরে ধনসম্পদ বা কোনও মূল্যবান জিনিস কেনা মানেই ঘরে লক্ষ্মীর আগমন। তবে খেয়াল রাখতে হবে, সময়টি যেন শুভ হয়। কারণ শাস্ত্রমতে, ত্রয়োদশী তিথি ও অমৃতযোগে কেনা জিনিস সারাজীবন সমৃদ্ধি আনে, অশুভ সময় কেনা জিনিসে থাকে অশান্তির প্রভাব।
ধনতেরস ২০২৫-এর শুভ সময় (পঞ্জিকা অনুযায়ী)
বিশুদ্ধ সিদ্ধান্ত পঞ্জিকা অনুসারে, ত্রয়োদশী তিথি শুরু হবে বাংলা ১ কার্তিক, শনিবার, অর্থাৎ ১৮ অক্টোবর দুপুর ১২টা ২১ মিনিটে। শেষ হবে ২ কার্তিক, রবিবার (১৯ অক্টোবর) দুপুর ১টা ৫২ মিনিটে। এই সময়ের মধ্যে অমৃতযোগ পড়ছে-
ভোর ৬টা ২৪ মিনিট পর্যন্ত, পুনরায় সকাল ৭টা ১০ মিনিট থেকে ৯টা ২৭ মিনিট পর্যন্ত, এরপর ১১টা ৪৫ মিনিট থেকে দুপুর ২টা ৪৭ মিনিট পর্যন্ত, এছাড়াও বিকেল ৩টা ৩৩ মিনিট থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত এবং রাত ১২টা ৩৯ মিনিট থেকে রাত ২টা ১৮ মিনিট পর্যন্ত। অর্থাৎ এই সময়গুলির মধ্যে যে কোনও সময়ে কেনাকাটা শুভ বলে ধরা হচ্ছে।
অন্যদিকে গুপ্তপ্রেস পঞ্জিকা অনুসারে, ত্রয়োদশী আরম্ভ হবে ১৮ অক্টোবর দুপুর ১টা ১৯ মিনিটে এবং শেষ হবে ১৯ অক্টোবর দুপুর ১টা ৫২ মিনিট ৩৯ সেকেন্ডে। এই সময়ের মধ্যেও একাধিক অমৃতযোগ পড়ছে, ভোর ৬টা ২৩ মিনিট থেকে ৯টা ২৭ মিনিট পর্যন্ত, ১১টা ৪৪ মিনিট থেকে দুপুর ২টা ৪৮ মিনিট পর্যন্ত, বিকেল ৩টা ৩৪ মিনিট থেকে ৫টা ৫ মিনিট পর্যন্ত এবং রাত ১২টা ৩৬ মিনিট থেকে রাত ২টা ১৭ মিনিট পর্যন্ত। অর্থাৎ, শনিবার দুপুর থেকে রবিবার দুপুর পর্যন্ত সময়জুড়ে ধনতেরসের শুভ তিথি বিরাজ করছে।
ধনতেরসে কেন কিছু কিনবেন?
ধনতেরস মানেই সোনা বা রূপা কেনা, এটাই ভারতীয় প্রথার অঙ্গ। তবে জ্যোতিষ শাস্ত্র বলছে, শুধু গয়না নয়, দেবী লক্ষ্মীর আরাধনার উদ্দেশ্যে তামা, পিতল, ইস্পাত কিংবা ব্রোঞ্জের পাত্রও কেনা অত্যন্ত শুভ। ত্রয়োদশীতে বাসনপত্র বা গৃহস্থালির জিনিস কেনা মানে ঘরে স্থায়িত্ব ও আর্থিক শান্তি আসে। যাঁরা সোনায় বিনিয়োগ করতে চান, তাঁরা এই তিথিতে স্বর্ণমুদ্রা বা ‘লক্ষ্মী গণেশ’ খোদাই করা মুদ্রা কিনলে তা আরও শুভ ফল দেয়। আবার যারা নতুন গাড়ি, ইলেকট্রনিক্স বা সম্পত্তি কিনতে চান, তাদেরও এই সময়টি বিশেষভাবে উপযুক্ত বলে মনে করা হয়।
জ্যোতিষীদের মতামত
জ্যোতিষাচার্য সৌমেন মুখার্জি বলেন, ‘ধনতেরসের মূল তাৎপর্য হলো ধন ও স্বাস্থ্য উভয়ের বৃদ্ধি। তাই শুধু সোনা নয়, ধন্বন্তরি দেবের আরাধনায় আয়ুর্বেদ বা স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জিনিস কেনাও অত্যন্ত মঙ্গলজনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘ত্রয়োদশী তিথিতে অমৃতযোগে কেনা যে কোনও দ্রব্যই বহুকাল টেকে এবং ঘরে স্থায়ী শুভ শক্তি বৃদ্ধি করে।’ অন্যদিকে পঞ্জিকাবিদ তপন চক্রবর্তী জানান, ‘শুধু সময় নয়, মনোভাবও গুরুত্বপূর্ণ। ধনতেরসে কেনাকাটার সময় ইতিবাচক চিন্তা, দেবীর নামস্মরণ ও শুদ্ধ মন থাকলে তবেই পূর্ণ ফল পাওয়া যায়।’
শাস্ত্রীয় কারণ ও আধুনিক তাৎপর্য
আজকের ব্যস্ত জীবনে ধনতেরস কেবল ধর্মীয় রীতি নয়, অর্থনৈতিক প্রেরণাও বটে। বাজারে এই সময়েই বিক্রির জোয়ার ওঠে। স্বর্ণালংকার, ইলেকট্রনিক্স, গৃহস্থালী জিনিস, গাড়ি, সব ক্ষেত্রেই বিক্রি বেড়ে যায় কয়েকগুণ। একদিকে ঐতিহ্য, অন্যদিকে আর্থিক গতিশীলতা, এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই ধনতেরস আজ এক সর্বভারতীয় উৎসব। ধনতেরসের দিন সন্ধ্যায় ঘরের উত্তর-পূর্ব দিকে প্রদীপ জ্বালিয়ে দেবী লক্ষ্মী ও ধন্বন্তরির পূজা করলে বিশেষ ফল পাওয়া যায়। যাঁরা দোকান বা ব্যবসা চালান, তাঁদের উচিত ওই দিন নতুন খাতা বা ব্যবসার হিসাব শুরু করা। বিশ্বাস করা হয়, এতে অর্থভাগ্য বৃদ্ধি পায় এবং বছরের শেষ পর্যন্ত সমৃদ্ধি বজায় থাকে। উল্লেখ্য যে, ধনতেরস ২০২৫ শুধু কেনাকাটার দিন নয়, এটি শুভ শক্তি আহ্বানের তিথি। তাই শখের জিনিস কিনুন ঠিকই, কিন্তু সময় মেনে কিনুন। তবেই দেবী লক্ষ্মী প্রসন্ন হয়ে দান করবেন ধন, শান্তি ও সৌভাগ্যের আশীর্বাদ।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী




