সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দুর্গাপূজারপরেই রাজ্য জুড়ে শুরু হওয়া তৃণমূল কংগ্রেসের বিজয়া সম্মেলন শেষ হল এক অনন্য বার্তার মধ্য দিয়ে। দলের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় (Abhishek Banerjee) বৃহস্পতিবার আলিপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে এক উন্মুক্ত ও প্রাণবন্ত আলোচনায় মিলিত হন, যা রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। চা ও টিফিনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এই সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন মন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী (Snehasis Chakraborty), শশী পাঁজা (Shashi Panja), সাংসদ পার্থ ভৌমিক (Partha Bhowmik) ও ডেরেক ও’ ব্রায়ান (Derek O’Brien)। সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি মুখোমুখি আলোচনায় অভিষেক তুলে ধরেন সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার গুরুত্ব, গণতন্ত্রে তাদের অপরিহার্য ভূমিকা এবং তৃণমূল কংগ্রেসের ভবিষ্যৎ কর্মসূচীর দিশা। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক্স (Twitter/X)-এ লেখেন: “আজ, আমি মিডিয়ার সদস্যদের সঙ্গে এক অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ-অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছি। এটি ছিল দৃষ্টিভঙ্গি বিনিময়, অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের কাছ থেকে শেখা এবং বাংলার উন্নয়ন সম্পর্কে আমাদের ভাবনা ভাগ করে নেওয়ার এক অনন্য সুযোগ।”
তিনি আরও লেখেন, “একটি স্বাধীন ও প্রাণবন্ত সংবাদমাধ্যম (Free and Vibrant Media) গণতন্ত্রের মেরুদণ্ড। সংবাদমাধ্যম জনসাধারণকে সচেতন রাখে, প্রতিষ্ঠানগুলিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনে এবং সমাজের কাঠামোকে আরও মজবুত করে তোলে। আমি বিশ্বাস করি, সরকারের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা, উন্মুক্ততা এবং সহযোগিতা থাকা জরুরি।”এই বক্তব্যে অভিষেক স্পষ্ট করে দেন যে, সরকার বা দল সংবাদমাধ্যমের সমালোচনাকে ভয় পায় না; গঠনমূলক সংলাপের মাধ্যমে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী করতে চায়। তাঁর এই বক্তব্য ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
এদিকে বিজয়া সম্মেলনের শেষে তৃণমূলের সংগঠনে দেখা গিয়েছে এক নতুন রূপান্তর। জেলা ও ব্লক স্তরে যাঁরা গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য কাজ করেছেন, তাঁদের পুরস্কৃত করা হয়েছে। অন্যদিকে, যারা বছরের পর বছর একই পদে থেকেও কার্যকর কাজ করতে পারেননি, তাঁদের সরিয়ে নতুন নেতৃত্বকে সুযোগ দেওয়া হয়েছে। অভিষেক নিজেই জানিয়েছেন,
“কর্মক্ষমতাই একমাত্র মানদণ্ড। কেউ আমার বিরোধী মত পোষণ করলেও যদি কাজ ভালো করে থাকেন, তবে তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন একই পদে থেকেও কোনও ফল না আনা নেতাদের সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।” সূত্রের খবর অনুযায়ী, এই সাংগঠনিক পরিবর্তনের মাধ্যমে তৃণমূল কংগ্রেস বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-কে সামনে রেখে নিজেদের কর্মব্যবস্থাকে আরও দৃঢ় করতে চাইছে।
অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘নব জোয়ার’ (Nabo Jowar) কর্মসূচী নিয়েও তিনি কথা বলেন। তিনি বলেন, “মানুষ আজ মৌলিক চাহিদাকে প্রাধান্য দিচ্ছে, জল, বিদ্যুৎ, রাস্তা। দুর্নীতি বা রাজনৈতিক নাটক নয়, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধানই রাজনীতির মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।” রাজনৈতিক মহলে এখন আলোচ্য বিষয়, এই মানবিক বার্তা তৃণমূলের ভোট কৌশলে কী প্রভাব ফেলবে। এদিকে রাজ্যে নতুন রাজনৈতিক সংযোজন নিয়েও সরগরম আলাপ। সূত্র জানাচ্ছে, বিজয়া সম্মেলনের সময় কয়েকটি পরিচিত মুখ তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন, যাঁদের প্রত্যেকেরই স্পষ্ট জনসমর্থন এবং ইতিবাচক কাজের রেকর্ড রয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই আরও কয়েকজন ‘বড় নাম’ যোগ দিতে পারেন বলে ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে।
রাজ্যের প্রাক্তন মেয়র শোভন চট্টোপাধ্যায় (Sovan Chatterjee)-এর তৃণমূলে প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনাও জোরালো। সম্প্রতি তাঁর সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি রুদ্ধদ্বার বৈঠক হয়, যা সাত বছর পর অনুষ্ঠিত হয়। সূত্রের দাবি, শোভন দল ছাড়ার জন্য অনুতপ্ত বলে জানিয়েছেন। তাঁকে নিউ টাউন কলকাতা ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NKDA)-এর চেয়ারম্যান পদে নিযুক্ত করা হয়েছে।
তৃণমূল কংগ্রেসের অন্যতম আলোচিত ইস্যু ছিল বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision – SIR) প্রক্রিয়া। এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করেই অভিষেক ঘোষণা করেন, আগামী মাসের শুরু থেকে দল আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ শুরু করবে। তাঁর বক্তব্য, কেন্দ্রীয় সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাকে লক্ষ্য করে এই উদ্যোগ নিচ্ছে, যার বিরোধিতায় তৃণমূল রাস্তায় নামবে। লোকসভায় তৃণমূল কংগ্রেসের উপস্থিতিও এখন বেশ চোখে পড়ার মতো। ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ অভিষেক নিজেই সংসদে দলের অবস্থানকে মজবুত করছেন। সূত্রের খবর, বর্ষাকালীন অধিবেশনের শেষ পর্যায়ে টিএমসি সাংসদরা দুই কক্ষেই (Lok Sabha ও Rajya Sabha) একযোগে SIR ইস্যুতে প্রতিবাদ জানান।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, অভিষেকের এই নতুন রাজনৈতিক কৌশল, সাংবাদিকদের সঙ্গে সরাসরি সংলাপ, দলের সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং জনমুখী রাজনীতি, রাজ্যের রাজনীতিতে নতুন দিক নির্দেশ করছে। অভিষেকের কথায়, “আমরা সমালোচনা থেকে শিখতে চাই। জনগণের কথা শুনে এগোতে চাই। বাংলা আজ উন্নয়নের পথে, এবং আমরা চাই সেই পথে সাংবাদিক, জনগণ এবং প্রশাসন, সকলে একসাথে হোক।” উল্লেখ্য, তাঁর এই মানবিক, স্বচ্ছ এবং সমবেত ভাবনার রাজনীতি অনেকের কাছে ভবিষ্যতের তৃণমূলের রূপরেখা।
ছবি : সংগৃহীত




