সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ আগরতলা : টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণে ত্রিপুরার (Tripura) একাধিক জেলায় তৈরি হয়েছে বন্যা পরিস্থিতি। পরিস্থিতির জেরে প্রায় ১১ হাজার মানুষ ঘরছাড়া হয়ে আশ্রয় নিয়েছেন বিভিন্ন ত্রাণ শিবিরে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে উনকোটি (Unakoti), ধলাই (Dhalai) ও খোয়াই (Khowai) জেলায়। যদিও এখনও পর্যন্ত কোনও প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবুও ক্ষতিগ্রস্ত ঘরের সংখ্যা চার হাজারেরও বেশি বলে সরকারি তথ্য।
রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের (State Disaster Management Authority) এক আধিকারিক শুক্রবার জানান, ‘বুধবার ও বৃহস্পতিবারের ভারী বৃষ্টির ফলে হঠাৎ করে বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রায় ১১ হাজার মানুষ বাস্তুহারা হয়েছেন এবং বহু বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ তাঁর দেওয়া হিসেব অনুযায়ী, মোট ৪,০২৭টি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উনকোটি (Unakoti) জেলায় সবচেয়ে বেশি মানুষ ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। এই জেলার ৬,০৬৮ জন বাসিন্দা বর্তমানে ৩৫টি শিবিরে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন রাজ্য বিপর্যয় ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের প্রকল্প অধিকর্তা সনৎ কুমার দাস (Sanat Kumar Das)। তিনি বলেন, ‘শুক্রবার থেকে বৃষ্টি কমতে শুরু করায় মনু (Manu) নদীর জল কিছুটা নামতে শুরু করেছে, ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে।’
অন্যদিকে ধলাই (Dhalai) ও খোয়াই (Khowai) জেলাতেও বন্যার প্রভাব কম নয়। এই দুই জেলায় মিলিয়ে ৪,৯০৯ জন মানুষ ত্রাণ শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রশাসনের তরফে শিবিরগুলিতে খাদ্য, পানীয় জল ও প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলেও শুরু হয়েছে তর্ক। কংগ্রেস নেতা বিরাজিত সিনহা (Birajit Sinha) অভিযোগ করেন, ‘জলসম্পদ দফতর সময়মতো স্লুইস গেট মেরামত না করায় এই আকস্মিক বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।’ তাঁর দাবি, নিচু এলাকার মানুষদের দুর্ভোগ আরও বেড়েছে প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে। এই অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রশাসনের একজন আধিকারিক জানান, কৈলাসহর (Kailashahar) মহকুমায় মনু নদীর জল নিয়ন্ত্রণের জন্য থাকা ১৯টি স্লুইস গেট সময়মতো মেরামত করা যায়নি। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘টেন্ডার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা নিয়ে জটিলতা থাকায় কাজ শুরু করতে দেরি হয়েছে।’ তিনি আরও জানান, ‘কৈলাসহরকে বন্যার হাত থেকে বাঁচাতে দ্রুত স্লুইস গেট এবং নদীর বাঁধ মেরামত করা প্রয়োজন।’
ত্রিপুরার এই বন্যা পরিস্থিতির মূল কারণ হিসেবে ধরা হচ্ছে গত কয়েক দিনের অতি ভারী বৃষ্টিপাত। আবহাওয়া দফতর (Indian Meteorological Department) আগাম সতর্কবার্তা দিয়ে জানিয়েছে, আগামী কয়েক দিনেও রাজ্যের একাধিক জেলায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে পরিস্থিতি ফের খারাপ হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানিয়েছেন, জল দ্রুত বাড়তে থাকায় অনেকেই ঘর ছাড়তে বাধ্য হন। এক বাসিন্দার কথায়, ‘রাতারাতি জল ঢুকে পড়ে। কোনও কিছু গুছিয়ে নেওয়ার সময়ও পাইনি।’ প্রশাসনের তৎপরতায় তাঁদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। উল্লেখ্য, ত্রাণ শিবিরগুলিতে থাকা মানুষদের জন্য জরুরি পরিষেবা বজায় রাখার চেষ্টা চলছে। শিশু ও বয়স্কদের জন্য আলাদা ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। তবে দীর্ঘদিন শিবিরে থাকতে হলে আরও নানা সমস্যার মুখোমুখি হতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। ত্রিপুরার এই পরিস্থিতি পূর্বোত্তর ভারতের বর্ষাকালীন দুর্যোগের একটি চিত্র তুলে ধরছে। পাহাড়ি ঢল, নদীর জলস্তর বৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে প্রতি বছরই এই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই মুহূর্তে প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য হল ক্ষতিগ্রস্তদের নিরাপদ রাখা এবং দ্রুত স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরা। নদীর জলস্তর কমতে শুরু করলেও সম্পূর্ণ স্বস্তি এখনও আসেনি। আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে নজর রেখে পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রস্তুত রয়েছে রাজ্য প্রশাসন।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Tripura Writers Dictionary 2025 | ত্রিপুরায় বসবাসকারী লেখক অভিধান ২০২৫




