সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ উত্তর দিনাজপুর : উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর শহরের চম্পাবাগ এলাকার এক আলো-আঁধারি যৌনপল্লীতে রাতভর পুলিশি অভিযানে চাঞ্চল্যকর সাফল্য মিলল। পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের উদ্যোগে উদ্ধার করা হয়েছে মোট ৪৪ জন নাবালিকা মেয়েকে (Minor girls rescued), যাদের বিভিন্ন রাজ্য থেকে প্রলোভন দেখিয়ে এনে জোর করে দেহব্যবসায় নামানো হয়েছিল বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনার পর এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে, পাশাপাশি মানব পাচার চক্র নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।পুলিশ সূত্রে খবর, গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ইসলামপুর থানার পুলিশ বিশেষ অভিযান চালায়। রাতের অন্ধকারে চম্পাবাগ এলাকার একাধিক ঘর ও আস্তানায় একযোগে তল্লাশি শুরু হয়। প্রথমে কয়েকজন নাবালিকাকে উদ্ধার করা হলেও ধীরে ধীরে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৪৪-এ। উদ্ধার হওয়া মেয়েদের অধিকাংশের বয়স ১৪ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে। তাঁদের মধ্যে বিহার, অসম এবং গুজরাতের মেয়ের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
অভিযানের সময় উপস্থিত ছিলেন বিজেপি নেত্রী শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী (Shreerupa Mitra Chaudhury), এলাকায় তিনি ‘নির্ভয়া দিদি’ নামে পরিচিত। নারী ও শিশু পাচার বিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় এই নেত্রী পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় রেখে পুরো অভিযানে যুক্ত ছিলেন। উদ্ধার পর্বের পর তিনি সরাসরি সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, ‘এটা শুধু একটা অভিযান নয়, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সূচনা। বাংলার কোথাও এই ধরনের কাজ চলতে দেওয়া হবে না। এখানেও বুলডোজার চলবে।’ পুলিশ জানায়, এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় ছিল ও বিভিন্ন প্রান্ত থেকে কিশোরীদের চাকরির লোভ দেখিয়ে এখানে নিয়ে আসা হত। পরে তাদের উপর চাপ সৃষ্টি করে দেহব্যবসায় বাধ্য করা হত। উদ্ধার হওয়া কয়েকজন নাবালিকা কান্নায় ভেঙে পড়ে জানায়, ‘চাকরি দেওয়ার নাম করে আমাদের নিয়ে আসা হয়েছিল। এখানে এসে বন্দি করে রাখা হত, বাইরে যোগাযোগ করতে দেওয়া হত না।’ কেউ কেউ জানিয়েছে, পালানোর চেষ্টা করলে মারধরও করা হত।
এই ঘটনার পর চারজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। তাঁদের বিরুদ্ধে মানব পাচার, যৌন নির্যাতন ও ভারতীয় ন্যায় সংহিতার বিভিন্ন ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। ধৃতদের জিজ্ঞাসাবাদ করে গোটা চক্রের সঙ্গে যুক্ত আরও ব্যক্তিদের খোঁজ চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারীরা মনে করছেন, এর পেছনে একটি বড় নেটওয়ার্ক কাজ করছে, যার শিকড় রাজ্যের বাইরেও ছড়িয়ে থাকতে পারে। উল্লেখ্য, অভিযানের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক হল প্রযুক্তির ব্যবহার। প্রথমবারের মতো এই ধরনের অভিযানে ড্রোন ব্যবহার করে গোটা এলাকা নজরদারি করা হয়। এর ফলে সন্দেহভাজনদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা সহজ হয়েছে এবং পালানোর পথও অনেকাংশে বন্ধ করা গিয়েছে। পুলিশ সূত্রে খবর, কয়েকজন পালানোর চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত তাদের আটক করা সম্ভব হয়েছে।
এই পুরো অভিযান পরিচালিত হয় ইসলামপুর পুলিশ জেলার সুপারিনটেনডেন্ট রাকেশ সিং (Rakesh Singh) -এর নেতৃত্বে বলে উল্লেখ। তাঁর তত্ত্বাবধানে এনফোর্সমেন্ট টিম, স্থানীয় থানার পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করে। উদ্ধার হওয়া নাবালিকাদের আপাতত নিরাপদ স্থানে রাখা হয়েছে এবং তাদের শারীরিক ও মানসিক পরিস্থিতির উপর নজর রাখা হচ্ছে। ঘটনার পর স্থানীয় মহলেও প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে। অনেকেই এই অভিযানকে সময়োপযোগী পদক্ষেপ বলে মনে করছেন। দীর্ঘদিন ধরে চলা এই ধরনের বেআইনি কার্যকলাপের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠছিল। সেই প্রেক্ষিতে এই অভিযান নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে বলেই মত অনেকের।
শ্রীরূপা মিত্র চৌধুরী অভিযানের পর আরও বলেন, ‘এই লড়াই শুধু পুলিশের নয়, সমাজেরও। যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনও রকম ছাড় দেওয়া হবে না।’ তাঁর এই মন্তব্যের পর রাজনৈতিক মহলেও চর্চা শুরু হয়েছে। উদ্ধার হওয়া মেয়েদের মধ্যে অনেকেই এখনও আতঙ্কে ভুগছে। প্রশাসনের তরফে তাদের কাউন্সেলিং এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। পাশাপাশি, পরিবারগুলির সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের ফিরিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এই ঘটনায় মানব পাচার রোধে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে ইসলামপুর। তদন্ত যত এগোবে, ততই এই চক্রের আরও তথ্য সামনে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। আপাতত পুলিশের নজর রয়েছে চক্রের মূল অভিযুক্তদের খুঁজে বের করার দিকে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Suvendu Adhikari North Bengal, Siliguri BJP meeting | উত্তরবঙ্গে উন্নয়নের অগ্রাধিকার, এক বছরের মধ্যে প্রতিশ্রুতি পূরণের ঘোষণা শুভেন্দুর




