সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★নতুন দিল্লি: ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ (TMC) নাম এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) ও ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় (Ritabrata Banerjee) -এর নেতৃত্বাধীন দুই শিবিরের বিরোধ এবার নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মেটাতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর, সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India) নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দিয়েছে, দুই পক্ষের বক্তব্য, নথি ও পাল্টা বক্তব্য গ্রহণের প্রক্রিয়া চার সপ্তাহের মধ্যে শেষ করতে হবে। তার পরে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য কমিশন পাবে আরও তিন মাস। ফলে চার মাসের মধ্যেই ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘জোড়াফুল’ প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত সামনে আসার কথা।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত (Surya Kant), বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী (Joymalya Bagchi) এবং বিচারপতি ভি মোহনাকে (V. Mohana) নিয়ে গঠিত বেঞ্চ এই সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। মামলাটি উঠেছিল নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে। ওই সিদ্ধান্তে মূল দলের নাম ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ ও দলের সংরক্ষিত ‘জোড়াফুল’ প্রতীক আপাতত ব্যবহারের বাইরে রাখা হয়েছে। দুই গোষ্ঠীকেই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থায় আলাদা নাম ও প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিতে হচ্ছে। সোমবারের শুনানিতে মূল প্রশ্ন ছিল, কমিশনের সামনে দুই পক্ষকে নিজেদের দাবি, প্রমাণ ও বক্তব্য জানানোর জন্য কতটা সময় দেওয়া হবে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ দ্রুত প্রক্রিয়া শেষ করার পক্ষে সওয়াল করে।
অন্য দিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে আরও সময় চাওয়ার আবেদন করা হয়েছিল বলে আদালতে উঠে আসে। তবে শীর্ষ আদালত দীর্ঘ সময়ের বদলে একটি নির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত সময়সীমা বেঁধে দেয়। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, প্রথম চার সপ্তাহে দুই পক্ষের বক্তব্য ও প্রয়োজনীয় নথিপত্রের প্রক্রিয়া শেষ করতে হবে। এর পরের তিন মাসে নির্বাচন কমিশনকে সেই সমস্ত তথ্য পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এই নির্দেশের ফলে তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তার একটি সময়সীমা অন্তত নির্ধারিত হল। আদালত অবশ্য মামলার মূল দাবিদাওয়া বা কোন পক্ষের দাবি গ্রহণযোগ্য, সে বিষয়ে কোনও মত দেয়নি। অর্থাৎ, নাম ও প্রতীক শেষ পর্যন্ত কোন গোষ্ঠীর হাতে থাকবে, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনই আদালতের নির্দেশ থেকে পাওয়া যাচ্ছে না। সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়ার মধ্যেই থাকছে।
বিরোধের সূত্রপাত হয় নির্বাচন কমিশনের অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাকে ঘিরে। ১৭ সেপ্টেম্বর রাতে কমিশন ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ‘ফ্লাওয়ার্স অ্যান্ড গ্রাস’ বা জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহারে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেয়। কমিশনের বক্তব্য ছিল, দুই প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর দাবি মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত মূল নাম ও প্রতীক কোনও একটি পক্ষকে ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না। পরিবর্তে আসন্ন নির্বাচনের জন্য দুই শিবিরকে পৃথক নাম ও প্রতীক বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের ওই সিদ্ধান্তের পরেই বিষয়টি দ্রুত আইনি লড়াইয়ের দিকে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষ থেকে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করে কমিশনের অন্তর্বর্তী সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করা হয়। মামলার গুরুত্বের কথা মাথায় রেখে দ্রুত শুনানির আবেদনও করা হয়েছিল। ২১ সেপ্টেম্বর শীর্ষ আদালত মামলাটি দ্রুত শুনানির জন্য গ্রহণ করে এবং পরবর্তী শুনানিতে কমিশনের সামনে দুই পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য একটি নির্দিষ্ট সময়সীমা তৈরির বিষয়টি সামনে আসে।
এরই মধ্যে ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম (Nandigram) ও রেজিনগর (Rejinagar) বিধানসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন রয়েছে। সেই ভোটের আগে মূল তৃণমূলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক ব্যবহার করতে না পারায় দুই গোষ্ঠীকেই অন্তর্বর্তী নাম ও প্রতীক নিয়ে মাঠে নামতে হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ অনুযায়ী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের জন্য ‘মমতা অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং ফুটবল খেলোয়াড় প্রতীক বরাদ্দ হয়েছে। অন্য দিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবির ‘ডেমোক্র্যাটিক তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং খাম প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এই অন্তর্বর্তী বন্দোবস্তের ফলে নির্বাচনী প্রচারেও বদল এসেছে। যে দল দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট নাম ও প্রতীকের সঙ্গে ভোটারদের কাছে পরিচিত ছিল, সেই পরিচয়ের পরিবর্তে দুই পক্ষকে সাময়িক পৃথক পরিচয় ব্যবহার করতে হচ্ছে। তবে এই ব্যবস্থা স্থায়ী নয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্ধারিত সময়সীমা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত না হওয়া পর্যন্ত এই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থাই কার্যকর থাকবে।
মামলার পরবর্তী ধাপও তাই এখন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। আগামী চার সপ্তাহে দুই পক্ষকে নিজেদের দাবি সমর্থনে প্রয়োজনীয় নথি, বক্তব্য এবং পাল্টা বক্তব্য কমিশনের সামনে উপস্থাপন করতে হবে। এরপর কমিশন সেই সমস্ত তথ্য বিচার করে সিদ্ধান্ত নেবে। আদালত কমিশনকে আরও তিন মাস সময় দিয়েছে। অর্থাৎ, শুধু শুনানি শেষ করাই নয়, প্রাপ্ত নথি ও দাবিদাওয়া খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর দায়িত্বও ওই সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। শীর্ষ আদালতে শুনানির সময় নির্বাচন কমিশনের তরফে আরও দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজনের কথা বলা হয়েছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ। কমিশনের পক্ষ থেকে ছয় মাস সময় চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু আদালত চার সপ্তাহের মধ্যে দুই পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ এবং তার পর তিন মাসের মধ্যে সিদ্ধান্তের সময়সীমা নির্ধারণ করে। বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য তিন মাস সময় যথেষ্ট বলে আদালত মনে করেছে।
এখন মূল নজর থাকবে কমিশনের সামনে দুই পক্ষ কী কী দাবি পেশ করে তার উপর। একটি রাজনৈতিক দলের নাম এবং নির্বাচনী প্রতীক নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব নির্ধারিত প্রক্রিয়া রয়েছে। এই মামলাতেও সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই দুই পক্ষকে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে হবে। আদালতের সোমবারের নির্দেশ সেই প্রক্রিয়াকে দ্রুত একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে নিয়ে এসেছে। এদিকে বাংলার রাজনৈতিক পরিসরে এই বিরোধের প্রভাব ইতিমধ্যেই দেখা যাচ্ছে। এত দিন ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নাম এবং জোড়াফুল প্রতীক যে রাজনৈতিক পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিল, এখন সেই পরিচয় নিয়ে আইনি ও সাংগঠনিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। আসন্ন উপনির্বাচনে দুই পক্ষের পৃথক নাম ও প্রতীক ব্যবহারের সিদ্ধান্ত সেই পরিবর্তনের সরাসরি প্রতিফলন। তবে এই ব্যবস্থা আগামী দিনের স্থায়ী রাজনৈতিক পরিচয় কি না, তা নির্ভর করবে নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উপর।
নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরের উপনির্বাচনের আগে তাই আদালতের নির্দেশ নতুন করে গুরুত্ব পেল। ভোটের সময় দুই পক্ষকে যে অন্তর্বর্তী নাম ও প্রতীক দেওয়া হয়েছে, তা ব্যবহার করেই নির্বাচনী লড়াই এগোবে। অন্য দিকে চার সপ্তাহের মধ্যে কমিশনের শুনানি-পর্ব এগিয়ে যাওয়ার কথা। তার পর শুরু হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য নির্ধারিত তিন মাসের সময়। ফলে এখন প্রশ্ন শুধু জোড়াফুল প্রতীক কে পাবে, তা নয়; ‘অল ইন্ডিয়া তৃণমূল কংগ্রেস’ নামের সাংগঠনিক অধিকার নিয়েও কমিশনের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সেই সিদ্ধান্তের পথে সময়সীমা নির্দিষ্ট হয়েছে। এখন দুই শিবিরের বক্তব্য, কমিশনের সামনে পেশ করা নথি এবং পরবর্তী প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার দিকে দৃষ্টি থাকবে। তবে, চার মাসের এই সময়সীমা শেষ হলে তৃণমূলের নাম ও জোড়াফুল প্রতীক নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ কোন পর্যায়ে পৌঁছয়, সেটিই হবে পরবর্তী বড় প্রশ্ন। তার আগে অবশ্য দুই পক্ষকেই কমিশনের সামনে নিজেদের অবস্থান যথাযথভাবে তুলে ধরতে হবে। আদালত কোনও পক্ষের পক্ষে রায় না দিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছে। ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন নির্বাচন কমিশনের হাতেই।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Modi stops speech for Xi Jinping, Modi Xi Jinping BRICS Summit | ‘উনি ঠিক আছেন তো?’ জিনপিংকে দেখে বক্তৃতা থামালেন মোদী, ব্রিক্সের দ্বিতীয় দিনে ঐক্যের ডাক




