সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অঙ্গন বৃহস্পতিবার রাত থেকেই নতুন উত্তেজনায় সরগরম। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (SIR) প্রক্রিয়া নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দুপুরে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে (Jainesh Kumar) চিঠি দেওয়ার পর সন্ধ্যা গড়াতেই পাল্টা অবস্থান নিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। চার পাতার দীর্ঘ পাল্টা চিঠিতে তিনি শুধু মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ খণ্ডন করেই থেমে থাকেননি, আরও তীব্রভাবে রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন।
উল্লেখ্য, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের চিঠি ছিল তিন পাতার। সেখানে তিনি SIR প্রক্রিয়া স্থগিতের দাবি জানান বলে উল্লেখ। কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন বিএলওদের অতিরিক্ত চাপ, দুই কর্মীর মৃত্যু, মানুষজনের হেনস্থা এবং আলু তোলার মৌসুমে এই প্রক্রিয়ার চাপিয়ে দেওয়া নিয়ে অসন্তোষ। কিন্তু শুভেন্দুর মতে, এই সমস্ত অভিযোগের আড়ালে মুখ্যমন্ত্রীর উদ্দেশ্য ভিন্ন। তাঁর বক্তব্য, “ভুয়ো ভোটার দিয়ে তালিকা ভরিয়ে রাখার রাজনৈতিক স্বার্থেই মুখ্যমন্ত্রী এই চিঠি লিখেছেন।”
‘ভোট চুরি নয়, জনপ্রতিনিধি চুরিই মমতার রাজনীতি’ : বিস্ফোরক শুভেন্দু
শুভেন্দুর চিঠিতে সবচেয়ে তীব্র আক্রমণ এসেছে মুকুল রায় প্রসঙ্গে। সম্প্রতি হাই কোর্টের নির্দেশে মুকুল রায়ের বিধায়ক পদ খারিজ হয়ে গিয়েছে। সেই বিষয়ে ইঙ্গিত করেই শুভেন্দুর দাবি, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ধরন কেবল ভোট চুরির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তাঁর দলের কায়দা হল নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকেও চুরি করে নেওয়া। তাই আদালত মুকুল রায়ের সদস্যপদ বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে।” রাজনৈতিক মহলে রাজ্য বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর এই বক্তব্য নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তাঁর কথায়, “গণতন্ত্র রক্ষার জন্য SIR প্রক্রিয়া ভিন্নপথে নেওয়ার কোনও অবকাশ নেই।”
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চিঠিতে উল্লেখ করেছিলেন :
• SIR প্রক্রিয়ার চাপ সইতে না পেরে দুই বিএলওর মৃত্যু
• সাধারণ মানুষের হয়রানি
• কৃষি মৌসুমে এই প্রক্রিয়া চাপিয়ে দেওয়ার অযৌক্তিকতা
এই অভিযোগগুলিকে তিনি ‘অতিরঞ্জিত রাজনৈতিক নাটক’ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন। তাঁর দাবি, “বিএলওদের আর্থিক বৃদ্ধির ফাইল মাসের পর মাস রাজ্যের অর্থ দফতর ফেলে রেখেছে। অথচ দায় চাপানো হচ্ছে কেন্দ্রীয় কমিশনের ওপর।”
‘বিএলওদের রাজনৈতিক দাসত্বে ঠেলে দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী’, শুভেন্দুর আর একটি বড় অভিযোগ। গত তিন মাস ধরে মুখ্যমন্ত্রী বিএলওদের উদ্দেশ্যে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা নিয়েও কড়া সমালোচনা করেছেন শুভেন্দু। তাঁর অভিযোগ, “মুখ্যমন্ত্রী নিজেই বারবার বলেছেন, ভোট শেষ হলে আপনাদের রাজ্য সরকারের কাজই করতে হবে। এভাবে কমিশনের নির্দেশ পালনের চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যকে বড় করা হচ্ছে।” রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগারওয়াল (Manoj Agarwal) -এর বিরুদ্ধে যে দুর্নীতির অভিযোগ মমতা তুলেছেন, শুভেন্দু সেই বিষয়টিও চিঠিতে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এর সবটাই রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির জন্য সাজানো।
‘চিঠিতে জঙ্গলরাজের স্বীকারোক্তি’, দাবি শুভেন্দুর
শুভেন্দুর কথায়, “যেভাবে রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধান নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ জানিয়েছেন, তা নিজেই রাজ্যের আইন-শৃঙ্খলার অবনতি প্রমাণ করে।” তাঁর বক্তব্য, কমিশনের উচিত এ নিয়ে কঠোর অবস্থান নেওয়া। চিঠিতে তিনি ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের ঘটনাগুলিও টেনে আনেন। সে সময় কমিশনের রিপোর্টে উল্লেখ ছিল-
• বহু কেন্দ্রেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা সিসিটিভি ক্যামেরা অকার্যকর ছিল
• ভোট চলাকালীন ব্যাপক অনিয়ম দেখা গিয়েছিল
শুভেন্দুর বক্তব্য, “এসবই মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর প্রশাসনের ব্যর্থতার জ্বলন্ত উদাহরণ।” অন্যদিকে, SIR প্রক্রিয়া স্থগিতের মুখ্যমন্ত্রীর দাবি এবং সেই দাবিকে নস্যাৎ করে শুভেন্দুর পাল্টা অবস্থান রাজ্যে রাজনৈতিক টানাপোড়েনকে আরও তীব্র করেছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, সরকারি কর্মীদের ওপর চাপ, ভোটার তালিকা সংশোধনের ন্যায়পরায়ণতা, সবই নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।রাজনৈতিক মহল মনে করছে, এই চিঠি- পাল্টা চিঠি ভবিষ্যৎ নির্বাচনের আগে শুধুই সূচনা। আগামী দিনে অভিযোগ- প্রত্যাঘাত আরও বেড়ে যাবে। প্রশ্ন একটাই, গণতন্ত্রের স্বচ্ছতা কোন পথে এগোবে?
ছবি : সংগৃহীত




