সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কাঠমান্ডু: পর্বতারোহণের ইতিহাসে বিরল ঘটনা এভারেস্টের (Mount Everest) ‘ডেথ জোন’ থেকে পাঁচ দিন নিখোঁজ থাকার পর জীবিত উদ্ধার হলেন অভিজ্ঞ শেরপা হিলারি দাওয়া শেরপা (Hilary Dawa Sherpa)। পরিবারের কাছে যখন তাঁর মৃত্যুর খবর প্রায় নিশ্চিত ধরে নেওয়া হয়েছিল এবং অন্ত্যেষ্টির প্রস্তুতিও শুরু হয়ে গিয়েছিল, ঠিক সেই সময়েই ঘটে এই অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। নেপালের (Nepal) এই ঘটনাকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে পর্বতারোহী মহলে তৈরি হয়েছে তীব্র আলোড়ন। ৫২ বছর বয়সী এই শেরপা গত ৩০ মে থেকে নিখোঁজ ছিলেন। এভারেস্ট অভিযানের সময় এক বিদেশি পর্বতারোহীকে সঙ্গে নিয়ে ফেরার পথে তিনি হারিয়ে যান বলে জানা যায়। দীর্ঘ সময় কোনো খোঁজ না মেলায় পরিবারের সদস্যরা তাঁকে মৃত বলে ধরে নেন। কাঠমান্ডুতে (Kathmandu) তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার প্রাথমিক আয়োজনও শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু সেই শোকের আবহ হঠাৎই বদলে যায় উদ্ধার অভিযানের খবর সামনে আসতেই।
এভারেস্ট দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটির (Everest Pollution Control Committee) একটি দল গত বৃহস্পতিবার তাঁকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করে। ‘ডেথ জোন’ নামে পরিচিত প্রায় ৮ হাজার মিটার উচ্চতার সেই এলাকায় অক্সিজেনের মাত্রা অত্যন্ত কম থাকে, যেখানে দীর্ঘ সময় বেঁচে থাকা প্রায় অসম্ভব। সেই জায়গায় পাঁচ দিন টিকে থাকা কার্যত অবিশ্বাস্য বলেই মনে করছেন পর্বতারোহীরা। উদ্ধারের পর হিলারি দাওয়া শেরপাকে দ্রুত হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুতে নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে তিনি এইচএএমএস হাসপাতালে (HAMS Hospital) চিকিৎসাধীন। চিকিৎসকদের প্রাথমিক রিপোর্টে জানা গিয়েছে, তিনি গুরুতর ‘ফ্রস্টবাইট’-এ আক্রান্ত। শরীরের বিভিন্ন অংশে ঠান্ডাজনিত ক্ষত রয়েছে, তবে তাঁর চেতনা ফিরে এসেছে এবং ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। এই উদ্ধার অভিযানের একটি ভিডিও ইতিমধ্যেই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ক্লান্ত ও দুর্বল অবস্থায় শেরপাকে উদ্ধার করে নিয়ে আসছেন কমিটির সদস্যরা। এই দৃশ্য বিশ্বজুড়ে বহু মানুষকে বিস্মিত করেছে। কীভাবে খাবার ও অতিরিক্ত অক্সিজেন ছাড়া তিনি এতদিন বেঁচে ছিলেন, সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
সূত্রের খবর, পোল্যান্ডের (Poland) এক পর্বতারোহীকে সঙ্গে নিয়ে শিখর জয়ের চেষ্টা করেছিলেন হিলারি দাওয়া শেরপা। কিন্তু সফল না হয়ে তাঁরা ফিরে আসছিলেন। সেই সময় ক্যাম্প-৩ এবং ক্যাম্প-৪-এর মাঝামাঝি এলাকায় তাঁদের মধ্যে বিচ্ছিন্নতা ঘটে। শেষবার তাঁকে দেখা গিয়েছিল প্রায় ৭৫০০ মিটার উচ্চতায়। সঙ্গী পর্বতারোহী নিরাপদে বেস ক্যাম্পে ফিরলেও শেরপার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। পাঁচ দিন পর এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের (Everest Base Camp) কাছাকাছি ক্র্যাম্পন পয়েন্ট এলাকায় তাঁকে খুঁজে পান এভারেস্ট দূষণ নিয়ন্ত্রণ কমিটির এক সদস্য। সেখান থেকে তাঁকে গোরকশেপ (Gorakshep) নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে হেলিকপ্টারে করে কাঠমান্ডুতে পাঠানো হয়। জানা যায়, বাঁচার জন্য তিনি দীর্ঘ পথ হামাগুড়ি দিয়ে অতিক্রম করেছেন। পরিবারের কাছে এই খবর পৌঁছনোর পর আবেগঘন মুহূর্ত তৈরি হয়। তাঁর মেয়ে মেন্ডো লামু শেরপা (Mendo Lhamu Sherpa) জানান, ‘আমরা তখন অন্ত্যেষ্টির দ্বিতীয় দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। খবরটা শুনে প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারিনি। পরে নিশ্চিত হওয়ার জন্য ছবি পাঠাতে বলি।’ ছবি দেখে তাঁরা বুঝতে পারেন, সত্যিই জীবিত রয়েছেন হিলারি দাওয়া শেরপা।
এভারেস্ট অভিযানের এই মরশুমে এক হাজারেরও বেশি পর্বতারোহী এবং গাইড অংশ নিয়েছেন। প্রতি বছরই এই অভিযানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। চলতি মরশুমেও ইতিমধ্যেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। কয়েকদিন আগেই ভারতের হায়দ্রাবাদের (Hyderabad) বাসিন্দা অরুণকুমার তিওয়ারি (Arun Kumar Tiwari) এভারেস্ট জয় করে ফেরার পথে প্রাণ হারান। এই পরিস্থিতিতে হিলারি দাওয়া শেরপার ফিরে আসা এক বিরল নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্বতারোহণের ঝুঁকি, আবহাওয়ার বৈরিতা এবং শারীরিক সীমাবদ্ধতার মধ্যে দাঁড়িয়ে এই ঘটনা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ‘ডেথ জোন’-এর মতো এলাকায় টিকে থাকার ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। উল্লেখ্য যে, নেপালের পর্যটন ও পর্বতারোহণ শিল্পের ক্ষেত্রেও এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। শেরপারা এই অভিযানের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। তাঁদের অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং সাহসের উপর নির্ভর করেই বহু পর্বতারোহী শিখর স্পর্শ করেন। সেই শেরপাদের একজনের এমন প্রত্যাবর্তন বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আবার এভারেস্টের দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। এই ঘটনার পর একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, কীভাবে সম্ভব হল এই বেঁচে ফেরা? উত্তর হয়তো সময়ই দেবে। আপাতত হিলারি দাওয়া শেরপার সুস্থ হয়ে ওঠার অপেক্ষায় রয়েছেন পরিবার ও শুভানুধ্যায়ীরা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mount Everest, Everest expedition, Sir Edmund Hillary | বিশ্বের সর্বোচ্চ শৃঙ্গে যাত্রার অদৃশ্য নায়ক কাঞ্চা শেরপা প্রয়াত, পর্বতারোহণ জগতে শোক



