সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নয়া দিল্লি, পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির দৌড়ে এবার বড় পদক্ষেপ নিল ভারত। দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি প্রথম হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন বাণিজ্যিক ট্রায়াল ও পরীক্ষামূলক চলাচলের অনুমোদন পেয়েছে ভারতীয় রেলওয়ে বোর্ড (Indian Railways Board) -এর তরফে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী-এর (Narendra Modi) ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ (Make in India) এবং আত্মনির্ভর ভারতের লক্ষ্যে এই উদ্যোগকে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। উন্নত দেশগুলির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এবার দূষণমুক্ত রেল প্রযুক্তির দুনিয়ায় নিজেদের জায়গা পাকা করতে চলেছে ভারত। রেল সূত্রে খবর, এই হাইড্রোজেন ট্রেনটি প্রথমে হরিয়ানার জিন্দ (Jind) থেকে সোনিপত (Sonipat) পর্যন্ত প্রায় ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ রেলপথে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো হবে। এই রুটে ট্রেনটির কার্যক্ষমতা, নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরযোগ্যতা খতিয়ে দেখা হবে। ট্রায়াল সফল হলে দেশের অন্যান্য রুটেও ধাপে ধাপে এই প্রযুক্তি চালু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এই ট্রেনটি ১০ কোচের একটি আধুনিক ট্রেনসেট, যেখানে ব্যবহার করা হয়েছে ১,২০০ কিলোওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল প্রোপালশন সিস্টেম। এই প্রযুক্তির মূল বৈশিষ্ট্য হল, ট্রেন চালাতে কোনও ডিজেল বা জীবাশ্ম জ্বালানির প্রয়োজন হয় না। হাইড্রোজেন ফুয়েল সেলের মাধ্যমে ট্রেনের ভেতরেই বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এবং সেই শক্তিতেই ট্রেন চলে। এর ফলে বায়ুদূষণ অনেকটাই কমে আসবে। এই প্রযুক্তির অন্যতম বড় দিক হল কার্বন নির্গমন প্রায় শূন্যে নামিয়ে আনা। সাধারণ ডিজেল ট্রেন যেখানে বিপুল পরিমাণ কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাস ছাড়ে, সেখানে হাইড্রোজেন ট্রেন থেকে নির্গত হয় মূলত জলীয় বাষ্প। ফলে এটি পরিবেশবান্ধব পরিবহণ ব্যবস্থার একটি কার্যকর বিকল্প হিসেবে উঠে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় এই ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। পরীক্ষামূলক পর্যায়ে ট্রেনটির সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় প্রায় ৭৫ কিলোমিটার রাখা হয়েছে। যদিও এটি উচ্চগতির ট্রেন নয়, তবুও এর মূল লক্ষ্য নতুন প্রযুক্তির নিরাপত্তা এবং কার্যকারিতা যাচাই করা। ট্রায়াল সফল হলে ভবিষ্যতে আরও দ্রুতগামী এবং উন্নত ক্ষমতাসম্পন্ন হাইড্রোজেন ট্রেন তৈরি করার সম্ভাবনা তৈরি হবে।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য হরিয়ানার জিন্দ এলাকায় তৈরি করা হয়েছে বিশেষ হাইড্রোজেন সংরক্ষণ এবং রিফুয়েলিং অবকাঠামো। ট্রেনের জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হাইড্রোজেন নিরাপদে সংরক্ষণ এবং সরবরাহের জন্য অত্যাধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। রেল ব্যবস্থায় এই ধরনের অবকাঠামো দেশের জন্য এক নতুন সংযোজন।
উল্লেখ্য, এই ট্রেনের প্রোটোটাইপ তৈরি হয়েছে চেন্নাইয়ের ইন্টিগ্রাল কোচ ফ্যাক্টরিতে (Integral Coach Factory)। ভারতীয় রেলের ‘হাইড্রোজেন ফর হেরিটেজ’ (Hydrogen for Heritage) প্রকল্পের আওতায় এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মূলত ঐতিহ্যবাহী এবং পর্যটনকেন্দ্রিক রুটগুলিতে পরিবেশবান্ধব ট্রেন চালানোর লক্ষ্যেই এই পরিকল্পনা শুরু হয়েছিল। এখন তা বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতিমধ্যেই হাইড্রোজেন চালিত ট্রেন চালু হয়েছে। জার্মানি, জাপান ও ফ্রান্স এই প্রযুক্তিতে এগিয়ে রয়েছে। সেই তালিকায় ভারতের অন্তর্ভুক্তি দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিরই প্রতিফলন। দেশীয়ভাবে এই প্রযুক্তি তৈরি হওয়ায় খরচ কমার পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানির সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে। এই উদ্যোগ শুধু প্রযুক্তিগত উন্নয়ন নয়, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। দেশীয় উৎপাদন বাড়ার ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং রেল পরিষেবা আরও আধুনিক হয়ে উঠবে। একই সঙ্গে পরিবেশ সুরক্ষায় ভারতের প্রতিশ্রুতিও আরও দৃঢ় হবে। রেল কর্তৃপক্ষের এক আধিকারিকের কথায়, ‘এই ট্রেন সফলভাবে চললে আগামী দিনে একাধিক রুটে হাইড্রোজেন ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।’ এর ফলে দেশের গ্রিন ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্ক আরও শক্তিশালী হবে।
বর্তমান সময়ে যখন দূষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বজুড়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সেই প্রেক্ষাপটে ভারতের এই পদক্ষেপ ভবিষ্যতের পরিবহণ ব্যবস্থাকে নতুন পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। আগামী কয়েক মাসের ট্রায়াল পর্বের উপরই নির্ভর করছে এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ। সফল হলে ভারতীয় রেল এক নতুন যুগে প্রবেশ করবে, যেখানে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হবে প্রধান চালিকাশক্তি।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Tajpur Train News, Digha Tajpur Rail Line | তাজপুরে ট্রেনের স্বপ্ন কি সত্যি হতে চলেছে? বাংলায় একসঙ্গে একাধিক নতুন রেললাইন প্রকল্পে সবুজ সঙ্কেত



