সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ বাঁকুড়া: রাজ্যের ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পকে ঘিরে ফের দুর্নীতির অভিযোগে উত্তাল বাঁকুড়া জেলার শালতোড়া গ্রাম পঞ্চায়েত। অভিযোগ, পঞ্চায়েত প্রধানের দাবি মতো মাথাপিছু ১২ হাজার টাকা দিতে না পারায় একের পর এক উপভোক্তার নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। এই অভিযোগ তুলে পঞ্চায়েত কার্যালয়ে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় গ্রামবাসীরা। তালডাংরা ব্লকের (Taldangra Block) শালতোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের (Shaltora Gram Panchayat) কাশিডাঙা বুথের (Kashidanga Booth) অন্তত ১১ জন উপভোক্তার নাম বাদ পড়ার পরই পরিস্থিতি চরম আকার নেয়। বিক্ষোভের ভিডিও সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হতেই জেলাজুড়ে শোরগোল শুরু হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রথম দফার সমীক্ষা ও খসড়া তালিকায় তাঁদের নাম থাকলেও পরে রহস্যজনক ভাবে তা বাদ দেওয়া হয়েছে। গ্রামবাসীদের দাবি, তৃণমূল কংগ্রেস পরিচালিত শালতোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মৌসুমী ঠাকুর (Mousumi Thakur) প্রত্যেক উপভোক্তার কাছে ১২ হাজার টাকা দাবি করেছিলেন। সেই টাকা দিতে না পারাতেই তাঁদের নাম চূড়ান্ত তালিকা থেকে বাদ পড়েছে বলে অভিযোগ। বিক্ষুব্ধদের আরও দাবি, যাঁদের নাম বাদ পড়েছে তাঁদের অনেকেরই পাকা বাড়ি নেই, অথচ নির্মীয়মান দোতলা বাড়ির মালিক হওয়া সত্ত্বেও খোদ পঞ্চায়েত প্রধানের নাম ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পের তালিকায় রয়েছে।
এই অভিযোগ ঘিরে ক্ষোভ এতটাই বেড়ে যায় যে, গ্রামবাসীরা পঞ্চায়েত কার্যালয়ে গিয়ে প্রতিবাদে শামিল হন। তাঁদের বক্তব্য, ‘গরিব মানুষের মাথা গোঁজার ঠাঁই দেওয়ার প্রকল্পে যদি ঘুষ না দিলে নাম কেটে দেওয়া হয়, তা হলে ন্যায়বিচার কোথায়?’ একজন বিক্ষুব্ধ উপভোক্তা বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল, টাকা না দিলে নাম থাকবে না। আমরা দিতে পারিনি, তাই আজ রাস্তায় নেমেছি।’ সরকারি সূত্রে খবর, সম্প্রতি রাজ্য সরকার ‘বাংলার বাড়ি’ প্রকল্পে উপভোক্তাদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করেছে। সেই তালিকায় বাঁকুড়ার তালডাংরা ব্লকের একাধিক গ্রাম পঞ্চায়েতে সংশোধন হয়েছে। শালতোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের ক্ষেত্রেও খসড়া তালিকার সঙ্গে চূড়ান্ত তালিকার বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। কাশিডাঙা বুথের ১১ জনের নাম বাদ পড়ায় প্রশ্ন উঠছে, কীসের ভিত্তিতে এই বাছাই করা হয়েছে।
গ্রামবাসীদের অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন পঞ্চায়েত প্রধান মৌসুমী ঠাকুর। তাঁদের দাবি, প্রধানের নিজের নাম থাকা নিয়ে কোনও স্বচ্ছতা নেই। এলাকাবাসীর বক্তব্য, প্রধান বর্তমানে ভাড়া বাড়িতে থাকলেও গত এক বছর ধরে এক আত্মীয়ের জমিতে তাঁর নিজস্ব দোতলা পাকা বাড়ি নির্মাণের কাজ চলছে। সেই অবস্থায় কীভাবে তিনি ‘পাকা বাড়ি নেই’ এই শর্তে আবাস প্রকল্পের উপভোক্তা হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। এ বিষয়ে ওই বাড়ির মালিক তথা যাঁর জমিতে বাড়িটি তৈরি হচ্ছে, তিনি জানান, ‘নিজের জমিতে না হলেও আত্মীয়ের জমিতে মৌসুমী ঠাকুরের দোতলা বাড়ি তৈরি হচ্ছে। কাজ অনেকটাই এগিয়েছে।’ এই বক্তব্যের পর গ্রামবাসীদের অভিযোগ আরও জোরালো হয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, যেখানে পঞ্চায়েত প্রধানের নির্মীয়মান পাকা বাড়ি রয়েছে, সেখানে তাঁর নাম কীভাবে তালিকায় এল, আর যাঁদের একচালা বা কাঁচা বাড়ি, তাঁদের নামই বা কেন বাদ গেল? অন্য দিকে, সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন শালতোড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান মৌসুমী ঠাকুর (Mousumi Thakur)। তাঁর দাবি, ‘এটা সম্পূর্ণ বিরোধীদের অপপ্রচার। আমার নিজের কোনও বাড়ি নেই। আমি ভাড়া বাড়িতে থাকি। নিয়ম মেনেই আমার নাম তালিকায় এসেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কাশিডাঙা বুথের যাঁদের নাম বাদ পড়েছে, তাঁদের প্রত্যেকেরই পাকা বাড়ি রয়েছে। সুপার চেকিংয়ের সময় তা ধরা পড়ায় তাঁদের নাম কাটা হয়েছে।’ উপভোক্তাদের কাছ থেকে টাকা চাওয়ার অভিযোগও তিনি সরাসরি নাকচ করে দিয়ে বলেন, ‘এটা বিজেপির (BJP) চক্রান্ত ছাড়া কিছু নয়।’
কিন্তু, গ্রামবাসীরা এই যুক্তিতে সন্তুষ্ট নন। তাঁদের দাবি, সমীক্ষার সময় পাকা বাড়ির সংজ্ঞা কী ছিল, তা স্পষ্ট করা হয়নি। অনেকেরই টিনের ছাউনি বা আধা পাকা দেওয়াল থাকলেও তাঁদের ‘পাকা বাড়ি’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। এক গ্রামবাসীর কথায়, ‘আমাদের ঘরে ছাদ নেই, দেওয়াল ভাঙা। তা হলে পাকা বাড়ি কাকে বলে?’ উল্লেখ্য, এই ঘটনায় স্থানীয় রাজনৈতিক মহলেও চাপানউতোর শুরু হয়েছে। বিজেপির স্থানীয় নেতৃত্বের দাবি, আবাস প্রকল্পে দুর্নীতি নতুন নয়, কিন্তু শালতোড়ার ঘটনা তার জ্বলন্ত উদাহরণ। তাঁদের বক্তব্য, অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে বৃহত্তর আন্দোলনে নামা হবে। যদিও তৃণমূলের দাবি, পুরো বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রশাসনিক স্তরে যা যা পরীক্ষা করার, তা ইতিমধ্যেই করা হয়েছে। প্রশাসনের একাংশ সূত্রে খবর, অভিযোগগুলি খতিয়ে দেখতে ব্লক প্রশাসনের কাছে রিপোর্ট চাওয়া হতে পারে। তবে এখনও পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক তদন্তের ঘোষণা হয়নি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে যে, মাথাপিছু ১২ হাজার টাকা না দেওয়াই কী সত্যিই আবাসের তালিকা থেকে বাদ পড়ার কারণ? নাকি সমীক্ষার ত্রুটিতেই বাদ পড়েছে প্রকৃত উপভোক্তাদের নাম? উত্তর খুঁজতেই এখন তাকিয়ে গোটা বাঁকুড়া।
ছবি: প্রতীকী
আরও পড়ুন : Anandapur fire incident, PM Narendra Modi compensation | আনন্দপুর অগ্নিকাণ্ডে গভীর শোকপ্রকাশ প্রধানমন্ত্রীর, নিহতদের পরিবারপিছু ২ লক্ষ টাকার ক্ষতিপূরণ ঘোষণা



