প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : ভারতের মেয়েদের ক্রিকেটে যেন সিনেমার মতো এক গল্প লিখলেন শেফালি বর্মা (Shafali Verma)। যাঁর নাম ফাইনাল দলে ওঠার আগ পর্যন্ত আলোচনায়ও ছিল না, তিনিই বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্যাটে-বলে ছাপ ফেললেন ইতিহাসে। শেষ মুহূর্তে দলে সুযোগ পেয়ে ফাইনালে ৮৭ রানের ইনিংস খেললেন, নিলেন ২টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট, আর সেই সঙ্গে তুলে নিলেন ম্যাচ সেরার পুরস্কার। ক্রিকেটবিশ্ব এখন প্রশংসায় ভাসাচ্ছে এই তরুণীকে, যিনি নিজের ভাগ্য নিজের হাতেই লিখে দিলেন।
বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার সময় ভারতের টিম ম্যানেজমেন্টের পরিকল্পনায় ছিলেন না শেফালি। প্রতিকা রাওয়াল (Pratika Rawal) ও স্মৃতি মন্ধানার (Smriti Mandhana) ওপেনিং জুটি ভাল খেলায় তাঁকে নিয়ে আলোচনাও হচ্ছিল না। কিন্তু ভাগ্যের চাকা ঘুরল হঠাৎই। প্রতিকা ইনজুরিতে ছিটকে গেলেন, এবং ঠিক তার পরেই ফোন গেল শেফালির কাছে। তড়িঘড়ি দলে ডাকা হল তাঁকে। অনেকেই ভেবেছিলেন হয়তো ব্যাকআপ হিসেবেই এসেছেন তিনি, কিন্তু শেফালি এসে যেন ঝড় তুললেন। নিজের সুযোগ পাওয়াকে ‘ঈশ্বরের নির্দেশ’ বলেছিলেন শেফালি। তিনি বলেন, “প্রতিকার সঙ্গে যা হয়েছে, সেটা দুর্ভাগ্যজনক। কিন্তু হয়তো ঈশ্বরই চেয়েছেন আমি যেন কিছু করি দলের জন্য। এই সুযোগটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় উপহার।” সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন দেখা গেল ফাইনালের ৪৫ হাজার দর্শকের সামনে। ফাইনালে তাঁর ইনিংস ছিল এককথায় ঝড়ো। ৭৮ বলে ৮৭ রানের দাপুটে ইনিংস। শুরুর থেকেই বোলারদের চেপে ধরেছিলেন। তাঁর ব্যাটে ভর করেই ভারত তুলল বিশাল স্কোর ২৯৮ রান। হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)-এর নেতৃত্বাধীন দলের এই ইনিংসে শেফালির অবদান ছিল অপরিসীম।

২১ বছর ২৭৮ দিনের শেফালি এই ইনিংসের মাধ্যমে নতুন রেকর্ড গড়লেন। বিশ্বকাপ ফাইনালে পুরুষ ও মহিলা ক্রিকেট মিলিয়ে সবচেয়ে কম বয়সে অর্ধশতরান করা ওপেনার তিনি। এত দিন এই রেকর্ড ছিল বীরেন্দ্র সহবাগের (Virender Sehwag) দখলে, যিনি ২০০৩ সালের ফাইনালে ২৪ বছর বয়সে ৫০ করেছিলেন। শেফালি সহবাগকেই নিজের আদর্শ মনে করেন। তাঁর মতোই আক্রমণাত্মক খেলা পছন্দ করেন তিনি। এই ইনিংসে সহবাগকেও ছাপিয়ে গেলেন তিনি, একদিনের বিশ্বকাপ ফাইনালে ভারতীয় ওপেনার হিসেবে সর্বোচ্চ রান এখন শেফালির নামে। শুধু ব্যাটই নয়, বল হাতেও ম্যাজিক দেখালেন তিনি। যখন ভারতের মূল বোলাররা উইকেট পাচ্ছিলেন না, তখন হরমনপ্রীত তাঁর হাতে বল তুলে দেন। শেফালি প্রথম ওভারেই ফেরান দক্ষিণ আফ্রিকার সুনে লুস (Sune Luus)-কে। নিজেই বল করে নিজেই ধরেন ক্যাচ। পরের ওভারেই মারিজান কাপ (Marizanne Kapp)-কে ফেরান, যিনি ম্যাচের টার্নিং পয়েন্ট হতে পারতেন। সেই মুহূর্তে দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস ভেঙে পড়ল। শেষ পর্যন্ত ৭ ওভারে ৩৬ রান দিয়ে ২ উইকেট তুলে নিলেন তিনি। ম্যাচ শেষে নির্বাচিত হলেন ‘প্লেয়ার অফ দ্য ম্যাচ’।
ম্যাচ শেষে শেফালির কণ্ঠে ছিল কৃতজ্ঞতা আর বিশ্বাস। তিনি বলেন, “ঈশ্বর আমাকে ভাল কিছু করার জন্য পাঠিয়েছিলেন। এই ম্যাচে সেটাই প্রমাণিত হল। এই জয় ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।” ফাইনালের আগে নিজের মানসিক প্রস্তুতি নিয়েও বললেন তিনি, “আমি খেলার মধ্যেই ছিলাম। নিজের উপর বিশ্বাস রেখেছিলাম। শান্ত থেকেছি। জানতাম, সুযোগ পেলে পারব। পরিবার ও বন্ধুরা পাশে ছিল, তাদের সমর্থনই আমাকে শক্তি দিয়েছে।” এই ইনিংসের জন্য তিনি বিশেষভাবে পরিকল্পনাও করেছিলেন। “আমার একটাই লক্ষ্য ছিল, দলের জন্য রান করা। সবাই বলেছিল, নিজের স্বাভাবিক খেলা খেলতে। তাই তাই করেছি। শতরান করতে পারতাম, কিন্তু দলের জন্য বড় রান করাটাই ছিল গুরুত্বপূর্ণ,” যোগ করেন শেফালি।
ম্যাচে উপস্থিত ছিলেন তাঁর প্রিয় ক্রিকেটার সচিন তেন্ডুলকর (Sachin Tendulkar)। গ্যালারিতে বসে শেফালির ব্যাটিং দেখেছেন মাস্টার ব্লাস্টার। উত্তেজনায় ভরা কণ্ঠে শেফালি বলেন, “সচিন স্যারকে দেখে আত্মবিশ্বাস আরও বেড়ে গিয়েছিল। উনি সব সময়ই উৎসাহ দেন। ওঁর থেকে শেখার অনেক কিছু আছে। আজ উনি আমার খেলা দেখেছেন, এটা জীবনের অন্যতম সেরা মুহূর্ত।” শেফালি বর্মার এই পারফরম্যান্স শুধু একটা ম্যাচ জেতানো নয়, বরং তাঁর কেরিয়ারের নতুন অধ্যায়ও। ‘শেষ মুহূর্তে আসা’ ক্রিকেটারের গল্প আজ হয়ে উঠেছে কোটি ভারতীয়র প্রেরণা। যিনি প্রমাণ করেছেন, সুযোগ হঠাৎ আসে না, আসে প্রস্তুতদের দরজায়। আর সেই প্রস্তুতির নামই আজ শেফালি বর্মা।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : World Cup 2025, Cricket Final, India Champions | বিশ্বচাম্পিয়ন ভারতের মহিলা ক্রিকেট দল


