সুজয়নীল দাশগুপ্ত ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, মুম্বাই : ভারতের মহিলা ক্রিকেট ইতিহাসে অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত এল। তিনবারের প্রচেষ্টার পর অবশেষে বিশ্বকাপের ট্রফি উঠল হরমনপ্রীত কৌর (Harmanpreet Kaur)-এর হাতে। দেশের প্রথম মহিলা অধিনায়ক হিসাবে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন তিনি। ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে (DY Patil Stadium) ফাইনালের শেষ মুহূর্তে যখন ভারতের মেয়েরা উল্লাসে ভাসছিলেন, তখন হরমনপ্রীতের চোখেমুখে ফুটে উঠেছিল এক অদম্য দৃঢ়তা—যেন জানিয়ে দিচ্ছিলেন, “এটা শেষ নয়, এ তো সবে শুরু!” ম্যাচের শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে হরমনপ্রীত বলেন, “বেড়াটা ভাঙতে চেয়েছিলাম। এই জয় দরকার ছিল। সবে শুরু। এ বার জেতা অভ্যাসে পরিণত করতে চাই। এই মুহূর্তের অপেক্ষা করছিলাম। আমরা আরও উন্নতি করতে চাই। এটাই শেষ নয়।”
হরমনের এই কথাগুলো যেন গোটা দলের মানসিকতাকেই তুলে ধরল, যেখানে ভয় নয়, আত্মবিশ্বাসই তাঁদের চালিকা শক্তি। বিশ্বকাপের শুরুটা সহজ ছিল না ভারতের জন্য। টানা তিনটি ম্যাচে পরাজয়ের মুখ দেখতে হয়েছিল। কিন্তু হার মানেননি হরমনপ্রীতরা। তিনি বলেন, “আমরা পর পর তিনটে ম্যাচে হেরেছিলাম। কিন্তু তার পরেও নিজেদের উপর বিশ্বাস ছিল। জানতাম, ঠিক কিছু একটা ভাল হবে। দলের সকলে আত্মবিশ্বাসী ছিল। দিন-রাত খেটেছি। একটা দল হয়ে খেলেছি।” এমন বিশ্বাসই হয়ত ভারতের ভাগ্য ঘুরিয়ে দিয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকার (South Africa) বিরুদ্ধে ফাইনালে এক সময় খেলার নিয়ন্ত্রণ প্রতিপক্ষের হাতেই ছিল। কিন্তু অধিনায়ক হরমনপ্রীতের এক কৌশলী সিদ্ধান্তই বদলে দেয় ম্যাচের মোড়।
হরমনপ্রীত বলেন, “লরা ও সুনে (Laura & Sune) তখন দারুণ খেলছিল। হঠাৎ শেফালির (Shafali Verma) দিকে আমার নজর গেল। মনে হল, একটা ফাটকা খেলি। ওকে খালি একটা ওভার দিতে চেয়েছিলাম। ভাবিনি, ও খেলাটাই বদলে দেবে। এত ভাল বল করছিল যে ওকে আরও কয়েকটা ওভার দিই। যেভাবে ও বল করেছে, তার পুরো কৃতিত্ব শেফালির।”এই সিদ্ধান্তই ফাইনালের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে দাঁড়ায়। শেফালি তুলে নেন গুরুত্বপূর্ণ দুই উইকেট, ভারত আবারও খেলায় ফিরে আসে। দর্শকদের উল্লাসে ফেটে পড়ে স্টেডিয়াম।
সেই একই মাঠে (DY Patil Stadium) কয়েকদিন আগেই সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার (Australia) বিরুদ্ধে ভারত ৩৩৯ রান তাড়া করে জয় পেয়েছিল। এবার ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকার সামনে লক্ষ্য ছিল ২৯৯ রান। তবে হরমনপ্রীত জানতেন, ফাইনালের পিচ আলাদা হবে। তিনি বলেন, “এই ম্যাচের পিচ গত ম্যাচের মতো ছিল না। বোলারদের জন্য কিছু ছিল। জানতাম, খেলা যত গড়াবে পিচ মন্থর হবে। স্পিনাররা সুবিধা পাবে। তাই ৩০০ রান না হলেও চাপ নিইনি। জানতাম, ভাল বল ও ফিল্ডিং করলে ম্যাচ জিতব। সেটাই করে দেখিয়েছি।” ফাইনালের নায়িকা দীপ্তি শর্মা (Deepti Sharma) ও শেফালি বর্মা, তাঁদের পারফরম্যান্সের প্রশংসায় পঞ্চমুখ অধিনায়ক। তিনি বলেন, “দীপ্তি আজ অসাধারণ বল করেছে। শেফালি শুধু ব্যাট নয়, বলেও দলকে টেনেছে। ওদের মতো তরুণ খেলোয়াড়দের নিয়ে আমি গর্বিত। এরা ভারতীয় ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ।”
দলের সাফল্যের পেছনে যে পরিকাঠামো ও মানসিক প্রস্তুতি, তাতেও নজর দিয়েছেন হরমনপ্রীত। তিনি বিশেষভাবে কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন কোচ অমল মুজুমদার (Amol Muzumdar)-এর প্রতি। “কোচ আমাদের প্রতিটি খেলায় আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে শিখিয়েছেন। গত দু’বছরে তিনি যা পরিশ্রম করেছেন, তা দলের ভিত শক্ত করেছে। ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (BCCI) যেভাবে আমাদের সুযোগ-সুবিধা দিয়েছে, তা আগের তুলনায় অনেক উন্নত। এই জয়ের কৃতিত্ব গোটা দলের পাশাপাশি সাপোর্ট স্টাফদেরও।” এই জয় ভারতীয় নারী ক্রিকেটের আত্মবিশ্বাসের স্তম্ভ। অতীতে দুইবার ফাইনালে গিয়ে হারতে হয়েছিল। এবার হরমনপ্রীতের নেতৃত্বে সেই ইতিহাস ভাঙল। ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ভারতীয় নারী ক্রিকেটের জন্য এক নতুন অধ্যায়, যেখানে জেতা এখন শুধু লক্ষ্য নয়, অভ্যাস হয়ে উঠছে। ভারতীয় দলের সদস্যরা যখন ট্রফি হাতে উল্লাসে মাতছেন, তখন গোটা দেশ গর্বে বুক ভরে উঠছে। সামাজিক মাধ্যমে ট্রেন্ড করছে #WomenInBlue এবং #WorldChampions। কোটি কোটি মানুষ তাঁদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন।
হরমনপ্রীতের চোখেমুখে এখন কেবল তৃপ্তি নয়, আছে ভবিষ্যতের দৃষ্টি। তিনি বলেন, “এই জয় আমাদের আত্মবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে দেবে। আমরা চাই, মেয়েরা আরও বড় স্বপ্ন দেখুক, ক্রিকেটে নিজেদের জায়গা তৈরি করুক। এখন থেকে জেতা আমাদের অভ্যাস হয়ে উঠুক।” তাঁর এই কথা যেন ভারতের নারী ক্রিকেটের নতুন যুগের ঘোষণা, যেখানে সীমা ভাঙা আর আত্মবিশ্বাসের মেলবন্ধনেই জন্ম নিচ্ছে নতুন ইতিহাস।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : World Cup 2025, Cricket Final, India Champions | বিশ্বচাম্পিয়ন ভারতের মহিলা ক্রিকেট দল




