শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়েও নিয়মিত শরীরচর্চা করছেন অভিনেত্রী সামান্থা রুথ প্রভু (Samantha Ruth Prabhu)। সমাজমাধ্যমে তাঁর শরীরচর্চার ছবি ও ভিডিয়ো প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই শুরু হয়েছে আলোচনা। হবু মায়েদের ক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার শেষ দিকে ব্যায়াম করা কতটা নিরাপদ, কোন ধরনের শরীরচর্চা করা যায় এবং কোন ধরনের কসরত থেকে দূরে থাকা উচিত, এই প্রশ্নই এখন ঘুরছে নেটপাড়ায়। সামান্থার পোস্ট ঘিরে তৈরি হওয়া আলোচনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের প্রচলিত নির্দেশিকাগুলিও নতুন করে সামনে এসেছে। সামান্থা গর্ভাবস্থার শরীরচর্চার রুটিন বজায় রেখেছেন। সপ্তাহে ছয় দিন পর্যন্ত জিমে যাওয়ার কথা তিনি সমাজমাধ্যমে জানিয়েছেন বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ। তাঁর এই সক্রিয় জীবনযাপন দেখে অনেকেই জানতে চাইছেন, গর্ভাবস্থার এতটা শেষ পর্যায়ে গিয়ে নিয়মিত ব্যায়াম করা কি আদৌ নিরাপদ? চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশিকা বলছে, উত্তরটি সবার জন্য এক নয়। গর্ভাবস্থায় কোনও জটিলতা না থাকলে ও স্ত্রীরোগ চিকিৎসকের অনুমতি থাকলে নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা চালিয়ে যাওয়া যেতে পারে।

আমেরিকান কলেজ অব অবস্টেট্রিশিয়ানস অ্যান্ড গাইনোকোলজিস্টস-এর নির্দেশিকা অনুযায়ী, সুস্থ ও জটিলতাহীন গর্ভাবস্থায় নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা সাধারণত নিরাপদ। বরং হাঁটা, সাঁতার, স্থির সাইকেল চালানো, পরিবর্তিত যোগাসন ও কিছু নির্দিষ্ট শক্তিবর্ধক ব্যায়াম গর্ভাবস্থায় উপকারী হতে পারে। তবে গর্ভাবস্থার সঙ্গে শরীরে যে স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে, তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যায়ামের ধরন ও তীব্রতা বদলাতে হতে পারে। গর্ভাবস্থায় শরীরচর্চার অন্যতম উদ্দেশ্য শুধু ওজন নিয়ন্ত্রণ নয়। নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা পিঠের ব্যথা কমাতে, শরীরের সামগ্রিক সক্ষমতা ধরে রাখতে এবং গর্ভকালীন অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে। ACOG-এর তথ্য অনুযায়ী, উপযুক্ত মাত্রায় ব্যায়াম করলে গর্ভকালীন ডায়াবিটিস ও উচ্চ রক্তচাপজনিত কিছু সমস্যার ঝুঁকিও কমতে পারে। তবে কোনও ব্যায়ামকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা যায় না এবং ব্যক্তিভেদে প্রয়োজনীয় পরামর্শ আলাদা হতে পারে।

গর্ভাবস্থার শেষ দিকে শরীরের ভারসাম্যও বদলে যায়। পেটের আকার বাড়ার সঙ্গে শরীরের ভারকেন্দ্র সামনের দিকে সরে যায়। ফলে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা বাড়তে পারে। গর্ভাবস্থায় হরমোনের পরিবর্তনের কারণে অস্থিসন্ধির লিগামেন্টও কিছুটা শিথিল হয়। তাই আগে যে ধরনের ব্যায়াম সহজে করা যেত, গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে সেটিই একই মাত্রায় করা সব সময় উপযুক্ত নাও হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশিকায় ঝাঁকুনি বা অতিরিক্ত আঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে এমন ব্যায়াম এড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। হাঁটা গর্ভাবস্থায় তুলনামূলক ভাবে সহজ ও কম ঝুঁকির শারীরিক কার্যকলাপগুলির একটি। শরীরের সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত হাঁটা চালানো যেতে পারে। সাঁতার বা জলে হালকা শরীরচর্চাও অনেকের ক্ষেত্রে উপযোগী হতে পারে। স্থির সাইকেলও একটি বিকল্প হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, কারণ সাধারণ সাইকেলের তুলনায় পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি এখানে কম। গর্ভবতীদের জন্য পরিবর্তিত যোগাসনও করা যায়, তবে এমন ভঙ্গি বেছে নিতে হয় যাতে শরীরের ভারসাম্যের উপর অতিরিক্ত চাপ না পড়ে।

গর্ভাবস্থায় সব ধরনের শরীরচর্চা নিরাপদ নয়। পেটে আঘাত লাগার সম্ভাবনা রয়েছে এমন খেলা বা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি এমন কার্যকলাপ থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। ফুটবল, বাস্কেটবল, বক্সিংয়ের মতো সংঘর্ষের সম্ভাবনা থাকা খেলাগুলি এড়ানো উচিত। ঘোড়ায় চড়া, স্কিইং, স্কাইডাইভিংয়ের মতো পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এমন কাজও গর্ভাবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতিরিক্ত গরম তৈরি করে এমন ‘হট যোগা’ বা ‘হট পিলাটিস’ও এড়ানোর কথা বলা হয়েছে। গর্ভাবস্থায় মেঝেতে চিৎ হয়ে দীর্ঘ সময় শুয়ে থেকে ব্যায়াম করার বিষয়েও সতর্কতা রয়েছে। গর্ভাবস্থার পরের দিকে জরায়ুর ওজন শরীরের একটি বড় শিরায় চাপ তৈরি করতে পারে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে রক্তচাপ কমে যাওয়া বা অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। তাই দীর্ঘ সময় চিৎ হয়ে থাকা অবস্থায় ব্যায়াম না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। বিশেষ করে তৃতীয় ত্রৈমাসিকে ব্যায়ামের ভঙ্গি বাছাইয়ের সময় এই বিষয়টি মাথায় রাখা প্রয়োজন।

আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল শরীরের তাপমাত্রা ও জলশূন্যতা। গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম করার সময় পর্যাপ্ত জল পান করা জরুরি। অত্যধিক গরম পরিবেশে দীর্ঘ সময় শরীরচর্চা না করাই ভাল। অতিরিক্ত ঘাম, মাথা ঘোরা বা দুর্বলতা দেখা দিলে শরীরচর্চা চালিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে বিশ্রাম নেওয়া দরকার। ACOG-ও ব্যায়ামের আগে, চলাকালীন এবং পরে পর্যাপ্ত জল পান করার পরামর্শ দিয়েছে। শরীরচর্চার সময় কিছু উপসর্গ দেখা দিলে আর অপেক্ষা করা উচিত নয়। যোনিপথে রক্তপাত, মাথা ঘোরা বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার অনুভূতি, বুকে ব্যথা, ব্যায়াম শুরুর আগেই শ্বাসকষ্ট, পেশির দুর্বলতা, পায়ের পেশিতে ব্যথা বা ফোলা, নিয়মিত ও যন্ত্রণাদায়ক জরায়ুর সঙ্কোচন কিংবা যোনিপথ দিয়ে তরল বেরিয়ে আসার মতো লক্ষণ দেখা দিলে ব্যায়াম বন্ধ করে চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।

গর্ভাবস্থায় আগে থেকে যাঁরা নিয়মিত শরীরচর্চা করতেন, তাঁদের পরিস্থিতি আবার এমন ব্যক্তির তুলনায় আলাদা হতে পারে, যাঁরা আগে প্রায় কোনও ব্যায়ামই করতেন না। তাই শুধু অন্য কাউকে দেখে নিজের জন্য একই রুটিন তৈরি করা ঠিক নয়। ACOG-এর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, আগে থেকে শারীরিক ভাবে সক্রিয় থাকা মহিলারা জটিলতাহীন গর্ভাবস্থায় অনেক সময় তাঁদের রুটিন কিছুটা বদলে চালিয়ে যেতে পারেন। অন্য দিকে, যাঁরা আগে শরীরচর্চায় অভ্যস্ত ছিলেন না, তাঁদের ধীরে শুরু করার পরামর্শ দেওয়া হয়। সামান্থার পোস্ট নিয়ে আলোচনার অন্যতম কারণ অবশ্য তাঁর পরিচিতি। অভিনেত্রীর ব্যক্তিগত জীবন, কাজ ও শরীরচর্চার রুটিন নিয়ে অনুরাগীদের আগ্রহ দীর্ঘদিনের। তাই গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়েও তাঁর জিমে যাওয়ার ছবি সামনে আসতেই তা দ্রুত আলোচনার বিষয় হয়েছে। তবে সমাজমাধ্যমে কোনও তারকার শরীরচর্চার ছবি দেখে প্রত্যেক হবু মায়ের নিজের শরীরের ক্ষেত্রে একই রুটিন অনুসরণ করা নিরাপদ নয়। গর্ভাবস্থার ইতিহাস, বয়স, শারীরিক অবস্থা, আগে থেকে থাকা কোনও রোগ ও গর্ভাবস্থায় তৈরি হওয়া জটিলতা ইত্যাদির ওপর ব্যায়ামের ধরন নির্ভর করতে পারে।

গর্ভকালীন ডায়াবিটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যার ক্ষেত্রেও ব্যায়াম নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা দরকার। জটিলতাহীন গর্ভাবস্থায় শারীরিক সক্রিয়তা অনেকের জন্য উপকারী হলেও, যাঁদের গর্ভাবস্থায় চিকিৎসাগত সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য ব্যায়ামের সময়, ধরন এবং তীব্রতা আলাদা হতে পারে। ACOG-এর নির্দেশিকাতেও গর্ভাবস্থায় কোনও চিকিৎসাগত বা প্রসূতিসংক্রান্ত জটিলতা থাকলে শারীরিক সক্রিয়তার বিষয়ে আলাদা ভাবে মূল্যায়নের কথা বলা হয়েছে। আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, গর্ভাবস্থায় শরীরচর্চার লক্ষ্য কোনও নির্দিষ্ট শরীরের গঠন বজায় রাখা নয়। এই সময়ে শরীরের স্বাভাবিক পরিবর্তন ঘটে ও সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সক্রিয় থাকার পরিকল্পনা করাই মূল কথা। পর্যাপ্ত বিশ্রাম, জলপান, সুষম খাবার আর চিকিৎসকের পরামর্শের পাশাপাশি উপযুক্ত শারীরিক কার্যকলাপ গর্ভাবস্থার স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের অংশ হতে পারে। সামান্থার শরীরচর্চা নিয়ে আলোচনা তাই কেবল একজন তারকার ব্যক্তিগত রুটিনে আটকে থাকছে না। গর্ভাবস্থার শেষ পর্যায়ে ব্যায়াম করা যায় কি না, কোন ধরনের ব্যায়াম তুলনামূলক নিরাপদ, কখন শরীরচর্চা বন্ধ করতে হবে ও কখন চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা প্রয়োজন, সেই প্রশ্নগুলিও সামনে এসেছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের নির্দেশিকা অনুযায়ী, জটিলতাহীন গর্ভাবস্থায় নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তা চালিয়ে যাওয়া অনেকের ক্ষেত্রেই সম্ভব। তবে গর্ভাবস্থা যেহেতু ব্যক্তি বিশেষে আলাদা, তাই সমাজমাধ্যমে দেখা কোনও তারকার রুটিনকে নিজের জন্য সরাসরি অনুসরণ না করে স্ত্রীরোগ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যায়ামের ধরন ঠিক করাই নিরাপদ পথ।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Samantha Ruth Prabhu AI Deepfake | সামান্থার নাম-ছবি-গলা নকল করে AI ডিপফেক! বম্বে হাই কোর্টের কড়া নির্দেশ, সরাতে হবে আপত্তিকর কনটেন্ট



