শোভনা মাইতি, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বিয়ের বাজারে পাত্র-পাত্রীর পছন্দ, পরিবারের সম্মতি, ঘটকের মাধ্যমে সম্বন্ধ, এমন নানা রীতির সঙ্গে পরিচিত বিশ্বের বহু সমাজ। কোথাও আবার পরিবারের পছন্দই বিয়ের ক্ষেত্রে প্রধান হয়ে ওঠে। কিন্তু বিয়ের সঙ্গে অর্থের এমন সরাসরি যোগ, যেখানে অবিবাহিত তরুণীদের সাজিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় নিয়ে গিয়ে সম্ভাব্য পাত্রের সামনে হাজির করা হয় এবং পাত্রপক্ষ অর্থের বিনিময়ে পছন্দের কনেকে গ্রহণ করে, তা শুনলে অবাক হওয়ারই কথা। ইউরোপের দেশ বুলগেরিয়ার (Bulgaria Bride Market) একটি রোমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে বহু বছর ধরে চলে আসা এমন এক প্রথার কথাই সামনে আসে ‘কনে বাজার’ নামে পরিচিত সমাবেশকে ঘিরে। বুলগেরিয়ার স্তারা জাগোরা (Stara Zagora) অঞ্চলে বসন্তকালে আয়োজিত এই সমাবেশকে স্থানীয় কালাইঝি (Kalaidzhi) উপগোষ্ঠীর সামাজিক রীতির অংশ হিসেবে দেখা হয়। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে এই জনগোষ্ঠীর অবিবাহিত তরুণীরা পরিবারের সঙ্গে সেখানে উপস্থিত হন। সাজপোশাক থেকে গয়না সব কিছুতেই থাকে বিশেষ প্রস্তুতি। অন্য দিকে সম্ভাব্য পাত্রেরা সেখানে এসে তরুণীদের দেখেন এবং তাঁদের মধ্যে জীবনসঙ্গী হিসেবে কাউকে বেছে নেওয়ার প্রক্রিয়ায় অংশ নেন।

বাইরের দৃষ্টিতে এই আয়োজনের সঙ্গে ‘কনে কেনাবেচা’ -এর ধারণা জড়িয়ে গেলেও সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কাছে বিষয়টি দীর্ঘদিনের সামাজিক রীতির অংশ। তাঁদের জীবনযাপন, অর্থনৈতিক অবস্থা ও বিয়েকে ঘিরে পারিবারিক কাঠামোর সঙ্গে এই আয়োজনের সম্পর্ক রয়েছে। খ্রিস্টান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বসন্তের একটি শনিবারে এই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়। সেই দিনটিকে ঘিরে আগে থেকেই পরিবারের মধ্যে প্রস্তুতি শুরু হয়। কালাইঝি জনগোষ্ঠীর আর্থিক অবস্থা দীর্ঘদিন ধরেই দুর্বল। তাঁদের অনেকেই তামার সামগ্রী তৈরির কাজের সঙ্গে যুক্ত। পারিবারিক পেশার ধারাবাহিকতা থাকলেও আর্থিক সচ্ছলতা সর্বত্র দেখা যায় না। মেয়েদের শিক্ষা নিয়েও রয়েছে নানা সামাজিক বিধিনিষেধ। দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অনেক পরিবারে মেয়েদের অষ্টম শ্রেণির পর পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি তাঁদের সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে উঠে আসে।
পরিসংখ্যানের উল্লেখ অনুযায়ী, কালাইঝি নারীদের একটি অংশ এখনও নিরক্ষর। বিশ্ব ব্যাঙ্কের তথ্যের সঙ্গে যুক্ত দাবিতে বলা হয়েছে, এই জনগোষ্ঠীর মাত্র প্রায় ১০ শতাংশ মেয়ে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে পেরেছেন। ফলে বিয়ের বয়সে পৌঁছনোর আগেই মেয়েদের জীবনে শিক্ষা ও সামাজিক যোগাযোগের পরিসর অনেকটা সীমিত হয়ে যায়। অন্য দিকে কনে বাজারে উপস্থিত হওয়ার প্রস্তুতিতে পরিবারের তরফে খরচের কমতি থাকে না। পোশাক, জুতো, প্রসাধনী ও গয়না ইত্যাদির পিছনে অর্থ ব্যয় করা হয়। পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য থাকলে মেয়েকে সোনার গয়নায় সাজিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ এই সামাজিক রীতিতে মেয়ের সাজসজ্জা এবং বাহ্যিক সৌন্দর্যকে তাঁর বিয়ের সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই বাজারে মেয়েদের পোশাকও আলাদা গুরুত্ব পায়। হাঁটু পর্যন্ত ড্রেস বা স্কার্টের সঙ্গে মানানসই ব্লাউজ, উঁচু হিলের জুতো ও বিভিন্ন ধরনের অলংকার পরতে দেখা যায় তাঁদের। পরিবারের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলক ভাল হলে সোনার হার, কানের দুল কিংবা অন্যান্য গয়না যোগ হয় সাজে। স্থানীয় রীতির ধারণা অনুযায়ী, সোনার গয়না কনের পারিবারিক মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে। তাই অনেক পরিবার মেয়ের জন্মের পর থেকেই গয়না তৈরির জন্য অর্থ সঞ্চয়ের চেষ্টা করে।
কেবল শুধু পোশাক বা গয়না নয়, মেয়ের বয়স, চেহারা ও বৈবাহিক অবস্থাও পাত্রের পছন্দে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সূত্রের খবর, ১৬ থেকে ২১ বছর বয়সী মেয়েদের চাহিদা বেশি থাকে। অনেক পরিবার মেয়েদের অল্প বয়স থেকেই কঠোর সামাজিক নিয়মের মধ্যে রাখে, যাতে বিয়ের আগে কোনও প্রেমের সম্পর্ক তৈরি না হয়। বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গে মেলামেশার ক্ষেত্রেও থাকে নানা বিধিনিষেধ। এই কারণে কনে বাজারের দিনটি অনেক তরুণীর জীবনে ব্যতিক্রমী হয়ে ওঠে। যে মেয়েরা ছোটবেলা থেকে ছেলেদের সঙ্গে অবাধে কথা বলা কিংবা মেলামেশার সুযোগ পাননি, তাঁদের সামনে সেই দিন সম্ভাব্য পাত্রেরা উপস্থিত হন। পাত্রেরা তাঁদের দেখে কথা বলেন এবং পছন্দের কনেকে নির্বাচন করার চেষ্টা করেন। তবে প্রচলিত অর্থে পাত্র-পাত্রীর পারস্পরিক পছন্দ বা ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরির সুযোগ এখানে কতটা থাকে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয় হল অর্থের বিনিময়ে কনে নির্বাচনের প্রথা। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, কোনও তরুণীকে পছন্দ করার পর তাঁর পরিবারের সঙ্গে অর্থের অঙ্ক নিয়ে আলোচনা করেন পাত্রপক্ষ। মেয়ের বাবা-মা সেই অর্থ গ্রহণ করেন। ফলে বিয়ের আলোচনায় মেয়েটির ব্যক্তিগত মতামতের চেয়ে পরিবারের আর্থিক দরকষাকষি বড় হয়ে ওঠে বলে বর্ণনা করা হয়। এই ব্যবস্থায় কনের মূল্য কয়েক হাজার ডলার থেকে শুরু হয়ে আরও অনেকটা বাড়তে পারে। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত প্রায় ৭,৫০০ থেকে ১১,৩০০ ডলারের মধ্যে অর্থের অঙ্ক ঘোরাফেরা করে। কোনও তরুণীকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বলে মনে হলে সেই অঙ্ক ১৩ হাজার থেকে ২১ হাজার ডলার পর্যন্ত পৌঁছতে পারে বলেও বিভিন্ন বিবরণে দাবি করা হয়েছে। অর্থটি সাধারণত কনের বাবা-মায়ের হাতে যায়। অন্যদিকে, মেয়েদের কুমারীত্বও এই সামাজিক কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ। বিয়ের আগে মেয়েদের পুরুষদের সঙ্গে সম্পর্ক বা মেলামেশা নিয়ে কঠোর নিয়ম মানতে হয়। পরিবারের তরফে তাঁদের সামাজিক চলাফেরার ওপর নজর রাখা হয়। প্রেমের সম্পর্ককে গ্রহণ না করার প্রবণতার কারণে বিয়ের আগে ব্যক্তিগত সম্পর্ক গড়ে ওঠার সুযোগও সীমিত থাকে।
কনে বাজারের এই রীতি একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর সামাজিক কাঠামো, আর্থিক সংকট, নারীর শিক্ষা, পারিবারিক নিয়ন্ত্রণ ও বিবাহপ্রথার সঙ্গে জড়িত একটি জটিল বিষয়। বাইরের সমাজের কাছে যা নারীর স্বাধীনতা ও অধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলে, সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর কিছু মানুষের কাছে সেটিই আবার দীর্ঘদিনের পরিচিত সামাজিক আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। আধুনিক ইউরোপের একটি দেশে এমন প্রথার অস্তিত্বের আলোচনা তাই স্বাভাবিক ভাবেই কৌতূহল তৈরি করে। তবে এই ধরনের সামাজিক রীতিকে বিচার করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, জীবনযাপন, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সামাজিক কাঠামোকেও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। কনে বাজার নিয়ে প্রচলিত নানা বর্ণনায় মেয়েদের অর্থমূল্যে বিচার করার বিষয়টি সামনে এলেও, স্থানীয় মানুষের কাছে এর অর্থ ও সামাজিক গুরুত্ব একমাত্রিক নয়। বুলগেরিয়ার কালাইঝি জনগোষ্ঠীর এই প্রথা নিয়ে তাই বিতর্কের জায়গা যেমন রয়েছে, তেমনই রয়েছে সাংস্কৃতিক পরিচয়ের প্রশ্ন। এক দিকে মেয়েদের শিক্ষা ও স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, অন্য দিকে বহু প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি সামাজিক রীতির ধারাবাহিকতাও এখানে দেখা যায়। বিয়েকে কেন্দ্র করে পরিবার, অর্থ ও সামাজিক নিয়মের যে সম্পর্ক এই বাজারে ফুটে ওঠে, তা আধুনিক সমাজের প্রচলিত বিবাহধারণার সঙ্গে যথেষ্ট আলাদা। সেই কারণেই বুলগেরিয়ার এই কথিত ‘কনে বাজার’ এখনও বিশ্বের নানা প্রান্তে মানুষের কৌতূহলের বিষয় হয়ে রয়েছে।
সব ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sonakshi Zaheer relationship | ‘তিন বছরে ভাঙনের মুখে সম্পর্ক, তবু বিয়ে করলেন কেন?’ : সোনাক্ষীর স্বীকারোক্তি, জাহিরকে বেছে নেওয়ার নেপথ্যে আসল কারণ কী ছিল?




