পালকি সিং, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : মহাকাশে গ্রহের জন্ম কী ভাবে হয়, কত দ্রুত একটি বিশাল গ্যাসীয় গ্রহ তৈরি হতে পারে ও নক্ষত্রের চারপাশের গ্যাস-ধূলির চাকতি থেকে গ্রহ গঠনের প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত এগোয়, এই সব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নতুন এক মহাজাগতিক চমকের সন্ধান পেলেন জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৫০ আলোকবর্ষ দূরে তরুণ নক্ষত্র এলিয়াস ২-২৪ (Elias 2-24)-কে ঘিরে থাকা গ্যাস ও ধূলির চাকতির মধ্যে সন্ধান মিলেছে এলিয়াস ২-২৪ বি (Elias 2-24 b) -এর। বয়স দশ লক্ষ বছরেরও কম, অথচ ভর বৃহস্পতির (Jupiter) কাছাকাছি। ফলে এখনও পর্যন্ত জানা সবচেয়ে নবীন গ্রহ হিসেবে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে এই মহাজাগতিক বস্তু। বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটারস’ (The Astrophysical Journal Letters)-এ। গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন চিলির ইউনিভার্সিদাদ দিয়েগো পোর্তালেস (Universidad Diego Portales) -এর আন্দ্রেয়া বার্নার্দি (Andrea Bernardi)। গবেষকেরা সরাসরি নতুন গ্রহ খুঁজতে গিয়ে প্রথমে সাফল্য পাননি। তরুণ নক্ষত্রগুলিকে ঘিরে থাকা গ্যাস ও ধূলির চাকতির অস্বাভাবিক গঠন তাঁদের নজর কাড়ে। সেই চাকতিতে তৈরি হওয়া সরু ফাঁক বা ‘গ্যাপ’-এর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল সদ্য গঠিত এই গ্রহের গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায়, সদ্য জন্ম নেওয়া নক্ষত্রের চারপাশে সাধারণত গ্যাস, ধূলিকণা, বরফ ও পাথুরে কণার বিশাল চাকতি থাকে। সময়ের সঙ্গে সেই চাকতির উপাদান থেকেই গ্রহ তৈরি হতে শুরু করে। কোনও গ্রহ বড় হতে থাকলে তার মহাকর্ষীয় প্রভাবে চারপাশের বস্তু সরে যায় আর তার কক্ষপথের আশপাশে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা অঞ্চল তৈরি হতে পারে। তাই এমন গ্যাপ বিজ্ঞানীদের কাছে গ্রহ গঠনের সম্ভাব্য চিহ্ন হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে শুধু গ্যাপ দেখা গেলেই সেখানে গ্রহ রয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায় না। এলিয়াস ২-২৪ বি-এর ক্ষেত্রে একাধিক পর্যবেক্ষণ ও তথ্য বিশ্লেষণের পরে তার গ্রহীয় পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। গবেষক দলটি হাওয়াইয়ের ডব্লিউ এম কেক অবজারভেটরি (W. M. Keck Observatory) -এর তথ্য ব্যবহার করে সাতটি তরুণ নক্ষত্রের পর্যবেক্ষণ খতিয়ে দেখেছিল। সেই তালিকায় ছিল এলিয়াস ২-২৪।
নক্ষত্রটিকে ঘিরে থাকা চাকতির একটি সরু গ্যাপের মধ্যে অত্যন্ত ক্ষীণ আলোর একটি উৎস দেখা যায়। প্রথম পর্যবেক্ষণে সেই সংকেতকে গ্রহ বলে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। কারণ এত দূরের একটি তরুণ গ্রহের আলো তার উজ্জ্বল নক্ষত্রের চারপাশের গ্যাস, ধূলি এবং নক্ষত্রের নিজস্ব আলোর তুলনায় অত্যন্ত ক্ষীণ। পরবর্তী পর্যায়ে গবেষকেরা কেক অবজারভেটরির পুরনো তথ্য আবার পরীক্ষা করেন। ২০১৮ এবং ২০২০ সালের পর্যবেক্ষণেও একই ক্ষীণ বস্তুর উপস্থিতি খুঁজে পাওয়া যায়। বিভিন্ন সময়ের ছবিতে বস্তুটির অবস্থানের পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা বুঝতে পারেন, এটি কোনও দূরবর্তী পটভূমির নক্ষত্র বা যন্ত্রের ত্রুটিজনিত সংকেত নয়। তার গতিবিধি গ্রহের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এই ধারাবাহিক তথ্যের ভিত্তিতেই এলিয়াস ২-২৪ বি-এর গ্রহীয় পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। এই আবিষ্কারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক তার বয়স। গবেষণাপত্র অনুযায়ী, এলিয়াস ২-২৪ বি-এর বয়স সর্বোচ্চ প্রায় দশ লক্ষ বছর। অর্থাৎ মহাজাগতিক সময়ের হিসাবে এটি একেবারেই সদ্যোজাত। এর আগের সবচেয়ে কমবয়সি গ্রহগুলির বয়স ছিল পাঁচ মিলিয়ন বছরেরও বেশি। ফলে নতুন এই আবিষ্কারটি আগের রেকর্ডের তুলনায় বয়সের ক্ষেত্রে বিরাট ব্যবধান তৈরি করেছে।
শুধু বয়স নয়, গ্রহটির অবস্থানও গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এলিয়াস ২-২৪ বি তার নক্ষত্র থেকে প্রায় ৫৫ অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট দূরে প্রদক্ষিণ করছে। একটি অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল ইউনিট হল পৃথিবী ও সূর্যের মধ্যবর্তী গড় দূরত্ব। অর্থাৎ গ্রহটি তার নক্ষত্র থেকে পৃথিবীর সূর্য থেকে দূরত্বের প্রায় ৫৫ গুণ দূরে রয়েছে। এই দূরত্ব নেপচুন (Neptune)-এর সূর্য থেকে দূরত্বেরও প্রায় দ্বিগুণ। এখানেই গবেষণার অন্যতম বড় প্রশ্ন। এত কম সময়ে এত দূরে বৃহস্পতির কাছাকাছি ভরের একটি গ্রহ কী ভাবে তৈরি হল? প্রচলিত গ্রহ গঠন মডেল অনুযায়ী, বড় গ্যাসীয় গ্রহ তৈরির ক্ষেত্রে প্রথমে কঠিন পদার্থের একটি ভারী কেন্দ্র তৈরি হওয়ার কথা। পরে সেই কেন্দ্র চারপাশের গ্যাস টেনে নিয়ে ধীরে ধীরে বিশাল আকার নেয়। কিন্তু এত অল্প সময়ে, আবার নক্ষত্র থেকে এত দূরে, বৃহস্পতির মতো ভরের একটি গ্রহের অস্তিত্ব সেই প্রক্রিয়ার সময়কাল নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে।
গবেষকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এলিয়াস ২-২৪ বি এখনও গ্যাস ও ধূলিকণা সংগ্রহ করছে। অর্থাৎ এটি এমন একটি পর্যায়ে রয়েছে, যখন গ্রহটির গঠনপ্রক্রিয়া পুরোপুরি শেষ হয়নি। এই কারণেই বিজ্ঞানীদের কাছে আবিষ্কারটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত আমাদের সৌরজগতের গ্রহগুলি কী ভাবে তৈরি হয়েছিল, তা বোঝার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের কয়েকশো কোটি বছর আগের ঘটনাকে বিভিন্ন মডেল ও প্রমাণের মাধ্যমে পুনর্গঠন করতে হয়। কিন্তু এলিয়াস ২-২৪ বি-এর মতো একটি গ্রহের ক্ষেত্রে সেই প্রক্রিয়া এখনই ঘটছে এবং তার কিছু পর্যায় সরাসরি পর্যবেক্ষণের সুযোগ তৈরি হয়েছে। গবেষণার সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীদের মতে, এলিয়াস ২-২৪ নক্ষত্রটির ভর সূর্যের তুলনায় কিছুটা কম। তাই একে আমাদের সূর্যের হুবহু প্রতিরূপ বলা না গেলেও, সূর্যের মতো একটি নক্ষত্রের জীবনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায় বোঝার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সৌরজগত এখন প্রায় ৪.৬ বিলিয়ন বছরের পুরনো। ফলে তার জন্মের সময়কার সরাসরি দৃশ্য আমাদের হাতে নেই। কিন্তু এলিয়াস ২-২৪-এর মতো তরুণ ব্যবস্থা সেই সুদূর অতীতের কিছু প্রক্রিয়া বোঝার সুযোগ করে দিতে পারে।
গ্রহটির সন্ধানে ব্যবহৃত প্রযুক্তিও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। কেক টেলিস্কোপের NIRC2 বা Near-Infrared Camera 2-এর সঙ্গে ভর্টেক্স করোনাগ্রাফ ব্যবহার করা হয়েছিল। করোনাগ্রাফের কাজ হল কেন্দ্রীয় নক্ষত্রের তীব্র আলোকে যতটা সম্ভব আটকে দিয়ে তার আশপাশে থাকা অপেক্ষাকৃত ক্ষীণ বস্তু শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি করা। এত ক্ষীণ একটি গ্রহকে শনাক্ত করার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে। গবেষকেরা পুরনো পর্যবেক্ষণগুলিকে নতুন ভাবে বিশ্লেষণ করে একই বস্তুর অবস্থান ও গতিপথ মিলিয়ে দেখেন। এলিয়াস ২-২৪ বি-এর ভর নিয়ে অবশ্য আরও পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে। বিভিন্ন মডেল থেকে এর ভর বৃহস্পতির ভরের কয়েক গুণ পর্যন্ত হতে পারে বলে বিভিন্ন হিসাব পাওয়া যায়। গবেষণার মূল তথ্য এটিকে বৃহস্পতির কাছাকাছি ভরের একটি নবীন গ্রহ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কিন্তু গ্রহটি যেহেতু এখনও তার চারপাশ থেকে পদার্থ সংগ্রহ করছে, তাই তার উজ্জ্বলতা ও অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা থেকে ভর নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু অনিশ্চয়তা রয়েছে। ভবিষ্যতের পর্যবেক্ষণে এই বিষয়টি আরও নির্ভুল ভাবে বোঝা সম্ভব হতে পারে।
এই আবিষ্কারের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে গ্রহ তৈরির সময়কাল নিয়ে বিজ্ঞানীদের দীর্ঘদিনের ধারণা। আগে যে গ্রহগুলিকে সবচেয়ে নবীন বলে ধরা হত, তাদের বয়সও ছিল কয়েক মিলিয়ন বছর। সেখানে দশ লক্ষ বছরেরও কম বয়সে বৃহস্পতির কাছাকাছি ভরের একটি গ্রহের সন্ধান গ্রহ গঠনের গতি নিয়ে নতুন করে গবেষণার দরজা খুলেছে। গবেষণার সহলেখক লুকাস সিয়েজা (Lucas Cieza) -এর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের রেকর্ডধারী তরুণ গ্রহগুলিকেও প্রচলিত গ্রহ-গঠন মডেল দিয়ে ব্যাখ্যা করতে সমস্যা ছিল। এলিয়াস ২-২৪ বি সেই প্রশ্নকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে। এই গ্রহের আরও পর্যবেক্ষণে আগামী দিনে জানা যেতে পারে তার বায়ুমণ্ডলের বৈশিষ্ট্য, তাপমাত্রা, কক্ষপথ এবং এখনও কতটা পদার্থ সে নিজের মধ্যে টেনে নিচ্ছে। নাসার (NASA) নতুন ন্যান্সি গ্রেস রোমান স্পেস টেলিস্কোপ (Nancy Grace Roman Space Telescope) -এর মতো উন্নত পর্যবেক্ষণযন্ত্র ভবিষ্যতে আরও এমন তরুণ গ্রহ শনাক্ত করতে পারে বলে গবেষকেরা আশা করছেন। বিশেষ করে নক্ষত্রের তীব্র আলোর আড়ালে থাকা অপেক্ষাকৃত ছোট কক্ষপথের গ্রহ শনাক্ত করার ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের যন্ত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে।
মহাকাশের বিশাল পরিসরে দশ লক্ষ বছরকে অত্যন্ত ক্ষুদ্র সময় বলে মনে হয়। অথচ সেই ক্ষুদ্র সময়ের মধ্যেই একটি গ্রহ গ্যাস, ধূলি ও বরফের উপাদান থেকে বেড়ে বৃহস্পতির কাছাকাছি ভরের জগতে পরিণত হতে পারে, এলিয়াস ২-২৪ বি সেই প্রক্রিয়ারই এক বিরল জানালা খুলে দিয়েছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪৫০ আলোকবর্ষ দূরে থাকা এই ‘নবজাতক’ গ্রহ তাই শুধু একটি মহাজাগতিক রেকর্ডের নাম নয়; গ্রহের জন্ম, বৃদ্ধি এবং নক্ষত্রের চারপাশের প্রাথমিক জগতের বিবর্তন বোঝার ক্ষেত্রেও এটি নতুন তথ্যের উৎস হয়ে উঠেছে।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ranbir Kapoor secret Instagram | রণবীর কাপুরের গোপন ‘ফিনস্টা’ নিয়ে চাঞ্চল্য! কেন আলিয়াকেও ফলো করতে দেন না অভিনেতা? দুবাইয়ের ইভেন্টে মুখ খুলেই চমকে দিলেন তারকা




