সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ মুম্বাই : কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির ব্যবহার যত বাড়ছে, ততই তার অপব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। বিশেষ করে তারকাদের ছবি, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিগত পরিচয় নকল করে তৈরি করা ডিপফেক ভিডিয়ো নিয়ে একাধিক বার আইনি পদক্ষেপের খবর সামনে এসেছে। এবার সেই তালিকায় যুক্ত হলেন দক্ষিণী ও বলিউডের পরিচিত অভিনেত্রী সামান্থা রুথ প্রভু (Samantha Ruth Prabhu)। অভিনেত্রীর ব্যক্তিত্ব ও পরিচয় ব্যবহার করে তৈরি করা আপত্তিকর, বিকৃত এবং এআই-নির্ভর কনটেন্ট নিয়ে করা মামলায় তিনি সাময়িক সুরক্ষা পেলেন। সাম্প্রতিক নির্দেশে বম্বে হাই কোর্ট (Bombay High Court) তাঁর নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর-সহ পরিচয়ের বিভিন্ন দিক অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা কনটেন্ট সরানোর নির্দেশ দিয়েছে। অভিনেত্রীর আবেদনের পর বিচারপতি মাধব জামদারের (Justice Madhav Jamdar) নেতৃত্বে আদালত বিষয়টি বিবেচনা করে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়। সামান্থার অভিযোগের মধ্যে ছিল তাঁর ছবি বিকৃত করে ব্যবহার করা, এআই প্রযুক্তির সাহায্যে মুখ বা কণ্ঠস্বর নকল করা, আপত্তিকর ভিডিও তৈরি করা এবং এমন কিছু ডিজিটাল কনটেন্ট ছড়িয়ে দেওয়া, যার মাধ্যমে তাঁর পরিচয় ও ব্যক্তিত্বকে অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ। আদালতের সামনে তাঁর আইনজীবীও এমন একাধিক কনটেন্টের কথা তুলে ধরেন।
আরও পড়ুন : Samantha Ruth Prabhu Workout | মাতৃত্বের নতুন পরে শারীরচর্চা, শরীরের কথা শুনছেন সমান্থা রুথ প্রভু
মামলাটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে কারণ এর আওতায় রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল সংস্থা ও প্ল্যাটফর্ম। মামলায় মোট ১৮ জন বিবাদীকে যুক্ত করা হয়েছে বলে আদালতে জানানো হয়েছে। তালিকায় রয়েছে বড় প্রযুক্তি সংস্থা, সমাজমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম, এআই-নির্ভর পরিষেবা, ডিজিটাল মাধ্যম এবং অন্যান্য সংস্থা। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেও ‘John Doe’ বা ‘Ashok Kumar’ নামে মামলার আওতায় আনা হয়েছে। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক (Ministry of Electronics and Information Technology) ও টেলিকম দফতরকেও (Department of Telecommunications) মামলায় পক্ষ করা হয়েছে। সামান্থার আইনজীবীর বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি শুধু কোনও একটি ছবি বা ভিডিয়ো নিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। অভিনেত্রীর নাম, চেহারা, কণ্ঠস্বর ও ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে নানা ধরনের ডিজিটাল সামগ্রী। তার মধ্যে রয়েছে মরফ করা ছবি, ডিপফেক ভিডিয়ো, এআই দিয়ে তৈরি কণ্ঠস্বর এবং আপত্তিকর ভিডিয়ো। এমনকী অভিনেত্রীকে কেন্দ্র করে তৈরি ইন্টার্যাক্টিভ এআই চ্যাটবটের বিষয়টিও আদালতের নজরে আনা হয়েছে। এই ধরনের ব্যবহারের ফলে একজন পরিচিত ব্যক্তির পরিচয় কী ভাবে তাঁর অনুমতি ছাড়াই ডিজিটাল পরিসরে পুনর্গঠিত হতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
আদালত সামান্থার দায়ের করা মামলায় উপস্থাপিত কনটেন্ট খতিয়ে দেখে প্রাথমিক ভাবে তাঁর ব্যক্তিত্ব, প্রচার-সংক্রান্ত অধিকার ও নৈতিক অধিকারের লঙ্ঘনের বিষয়টি গ্রহণ করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, অভিনেত্রীর ব্যক্তিত্ব ও প্রচার-সংক্রান্ত অধিকার ভারতীয় সংবিধানের ১৯(১)(ক) এবং ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের সুরক্ষার সঙ্গে যুক্ত। পাশাপাশি একজন শিল্পী হিসেবে তাঁর নৈতিক অধিকার কপিরাইট আইনের ৩৮বি ধারার আওতায় সুরক্ষিত। আদালতের মতে, অনুমতি ছাড়া এই পরিচয় ব্যবহার করে তৈরি কনটেন্ট ওই অধিকারগুলির উপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। এই মামলার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল, এখানে শুধু সমাজমাধ্যমে কোনও ছবি ছড়িয়ে পড়ার প্রশ্ন নেই। প্রযুক্তির সাহায্যে কোনও ব্যক্তির মুখ, কণ্ঠস্বর কিংবা উপস্থিতিকে এমন ভাবে পুনর্নির্মাণ করা যায়, যাতে দর্শকের কাছে সেটি আসল বলে মনে হতে পারে। ডিপফেক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এই ঝুঁকিই সবচেয়ে বেশি। কোনও ব্যক্তির বাস্তবে না বলা কথা, না করা কাজ কিংবা উপস্থিত না থাকা কোনও পরিস্থিতিকে তাঁর মুখ ও কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে দেখানো সম্ভব। ফলে ব্যক্তিগত পরিচয় এবং ডিজিটাল কনটেন্টের মধ্যে সীমারেখা আরও জটিল হয়ে উঠছে।
সামান্থার মামলায় আদালতের সামনে এমন কনটেন্টের কথাই এসেছে বলে জানা গিয়েছে। অভিনেত্রীর আইনজীবী রাশমিন খান্দেকর (Rashmin Khandekar) আদালতে তাঁর মক্কেলের অধিকারের উপর বিভিন্ন ধরনের লঙ্ঘনের কথা তুলে ধরেন। তাঁর সঙ্গে সামান্থার হয়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন আইনজীবী আনন্দ মোহন (Anand Mohan), লাভিন হিরানি (Lavin Hirani), বিক্রমাদিত্য চাভান (Vikramaditya Chavan) ও জানভি চোপড়া (Jaanvi Chopra)। তাঁদের বক্তব্য ছিল, এআই-নির্ভর কনটেন্টের মাধ্যমে অভিনেত্রীর পরিচয় এমন ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার জন্য তাঁর অনুমতি নেওয়া হয়নি। আদালতের অন্তর্বর্তী নির্দেশের ফলে আপত্তিকর কনটেন্ট সরানোর প্রক্রিয়া শুরু করার আইনি ভিত্তি তৈরি হয়েছে। এর অর্থ, সামান্থার নাম, ছবি বা কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে তৈরি যে সমস্ত কনটেন্ট মামলায় আপত্তিকর হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলির বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মগুলিকে পদক্ষেপ করতে হবে। অভিনেত্রীর অভিযোগের পর আদালত এই পর্যায়ে তাঁর ব্যক্তিত্ব ও পরিচয় রক্ষার জন্য অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিয়েছে।
এখানে ‘personality rights’ বা ব্যক্তিত্বের অধিকার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সাধারণ ভাবে এই অধিকারের মাধ্যমে একজন পরিচিত ব্যক্তি নিজের নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর, পরিচিত বৈশিষ্ট্য এবং ব্যক্তিগত পরিচয়ের বাণিজ্যিক বা অন্য ধরনের ব্যবহারের উপর নিয়ন্ত্রণ দাবি করতে পারেন। ভারতে ব্যক্তিত্বের অধিকার নিয়ে আলাদা একটি পূর্ণাঙ্গ আইন এখনও নেই। তবে বিভিন্ন মামলায় আদালতের নির্দেশের মাধ্যমে এই অধিকারের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিচারব্যবস্থায় অবস্থান তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলিতে এআই এবং ডিপফেককে ঘিরে এই ধরনের মামলার সংখ্যা আরও বেড়েছে। উল্লেখ্য যে, এর আগে বলিউডের একাধিক তারকাও এআই-নির্ভর কনটেন্ট নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। ২০২৬ সালে বম্বে হাই কোর্ট অভিনেত্রী শ্রুতি হাসান (Shruti Haasan) -এর ক্ষেত্রেও এআই ডিপফেক ও আপত্তিকর কনটেন্ট নিয়ে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দিয়েছিল। জুলাই মাসে অভিনেত্রী প্রীতি জ়িন্টা (Preity Zinta) -এর মামলাতেও ডিপফেক ও এআই-নির্ভর কনটেন্ট সরানোর নির্দেশের খবর সামনে আসে।
শুধু বম্বে হাই কোর্ট নয়, দিল্লি হাই কোর্টেও চলতি বছরে একাধিক পরিচিত ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে ব্যক্তিত্বের অধিকার সংক্রান্ত মামলা হয়েছে। অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে শুরু করে বিভিন্ন ক্ষেত্রের পরিচিত ব্যক্তির ছবি, কণ্ঠস্বর ও পরিচয় ব্যবহার করে তৈরি এআই কনটেন্ট নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। ফলে প্রযুক্তির বিকাশের সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় রক্ষার আইনি প্রশ্নও ক্রমশ সামনে আসছে। সামান্থার মামলায় আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, অভিনেত্রীর নাম বা ছবি ব্যবহার করা হয়েছে শুধু সাধারণ পোস্টে নয়, বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল কনটেন্টে। মামলায় এআই চ্যাটবটের প্রসঙ্গও এসেছে। কোনও তারকার পরিচয় ব্যবহার করে এমন চ্যাটবট তৈরি হলে ব্যবহারকারীর সঙ্গে কথোপকথনে সেই তারকার কণ্ঠ বা ব্যক্তিত্বের অনুকরণ করা সম্ভব। এর ফলে একজন বাস্তব মানুষের পরিচয় ও একটি কৃত্রিম ডিজিটাল চরিত্রের মধ্যে বিভ্রান্তির সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। আদালতে এই ধরনের ব্যবহারের বিষয়টি তোলা হওয়ায় এআই-ভিত্তিক বিনোদন ও ব্যক্তিগত অধিকারের সংঘাত নিয়েও আলোচনা বাড়তে পারে। সামান্থার ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ কারণ তিনি শুধু দক্ষিণী ছবির পরিচিত মুখ নন, হিন্দি বিনোদন জগতেও তাঁর পরিচিতি রয়েছে। ‘দ্য ফ্যামিলি ম্যান’ (The Family Man) এবং ‘সিটাডেল: হানি বানি’ (Citadel: Honey Bunny) -এর মতো প্রকল্পের মাধ্যমে হিন্দি দর্শকদের মধ্যেও তাঁর পরিচিতি বেড়েছে। ফলে তাঁর নাম, মুখ বা কণ্ঠস্বর ব্যবহার করে তৈরি কোনও ভুয়ো কনটেন্ট দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও থাকে।
ডিপফেক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হল, সাধারণ দর্শকের পক্ষে অনেক সময় আসল ও কৃত্রিম কনটেন্টের পার্থক্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, মুখের অভিব্যক্তি, কণ্ঠস্বর এবং শরীরের নড়াচড়া নকল করাও তত সহজ হচ্ছে। কোনও তারকার পরিচিতিকে কেন্দ্র করে তৈরি কনটেন্ট ভাইরাল হলে সেটি দ্রুত একাধিক প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পরে মূল উৎস সরিয়ে ফেললেও কপি বা পুনরায় আপলোড করা কনটেন্ট থেকে যেতে পারে। সামান্থার মামলায় আদালতের হস্তক্ষেপ সেই ডিজিটাল বিস্তারের বিষয়টিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। আদালতের সাম্প্রতিক পদক্ষেপ তাই শুধু সামান্থা রুথ প্রভুর ব্যক্তিগত মামলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিনোদন জগতের তারকাদের পরিচয় এআই দিয়ে পুনর্নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমতি, গোপনীয়তা, মর্যাদা ও প্রচার-সংক্রান্ত অধিকারের প্রশ্নও সামনে এসেছে। এর আগে সুনীল শেট্টি (Suniel Shetty), অক্ষয় কুমার (Akshay Kumar), শ্রুতি হাসান এবং প্রীতি জিন্টার মতো তারকার মামলাতেও একই ধরনের আইনি প্রশ্ন উঠে এসেছে। সামান্থার মামলায় আদালতের দেওয়া অন্তর্বর্তী সুরক্ষা সেই ধারাবাহিকতারই সাম্প্রতিক উদাহরণ। এখন নজর থাকবে মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে ও বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম আদালতের নির্দেশ কী ভাবে কার্যকর করে তার দিকে। এআই প্রযুক্তির ব্যবহার বিনোদন, বিজ্ঞাপন ও ডিজিটাল যোগাযোগে আরও বাড়তে থাকলে তার সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় রক্ষার আইনি কাঠামোও ভবিষ্যতে আরও আলোচনার কেন্দ্রে আসতে পারে। সামান্থার ক্ষেত্রে আপাতত আদালতের নির্দেশের মূল বিষয় হল, অভিনেত্রীর অনুমতি ছাড়া তাঁর নাম, ছবি, কণ্ঠস্বর বা পরিচয়ের অন্য কোনও অংশ ব্যবহার করে তৈরি আপত্তিকর ও ডিপফেক কনটেন্টের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা। একজন তারকার ডিজিটাল পরিচয় কী ভাবে ব্যবহার করা যাবে এবং কোথায় তার সীমা টানা হবে, সেই বৃহত্তর আলোচনায় বম্বে হাই কোর্টের এই অন্তর্বর্তী নির্দেশ নতুন একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক যোগ করল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Sonali Kulkarni Aamir Khan | কেন ‘দঙ্গল’-এর আমিরকে আসল হিরো বললেন সোনালী?




