সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ডিসেম্বরে পা দিতেই অর্থনীতি ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে দেশজুড়ে। বাজারে টাকা প্রবাহ বাড়াতে কেন্দ্রীয় সরকার একাধিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। পণ্য ও পরিষেবা কর (GST) কমানো হয়েছে, হোম লোন সহ বিভিন্ন ঋণের সুদের হার কমেছে, রিজার্ভ ব্যাঙ্কও কমিয়েছে রেপো রেট, সব মিলিয়ে ভোক্তাদের হাতে কিছুটা বাড়তি অর্থ রাখাই প্রধান লক্ষ্য। কারণ মানুষের হাতে অতিরিক্ত অর্থ থাকলে কেনাকাটা বাড়বে, বাজারে লেনদেন বাড়বে, আর সেই সঙ্গে গতি ফেরাতে শুরু করবে দেশের অর্থনীতিও।
এদিকে একই সময় ভারতীয় মুদ্রা, টাকা, ডলারের তুলনায় আরও দুর্বল হচ্ছে। ডলারের বিনিময়ে টাকার দাম ইতিমধ্যেই ৯০ ছাড়িয়েছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, শিগগিরিই এটি ৯১ -এর কাছাকাছি চলে যেতে পারে। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে এর প্রভাব যেমন নেতিবাচক, তেমনই রয়েছে কিছু ইতিবাচক দিকও, যা ভারতের অর্থনীতিকে বড় সাপোর্ট দিতে পারে আগামী দিনে। অনেকে মনে করছেন টাকার দরপতন মানেই দেশের জন্য খারাপ খবর। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিয়ম বলছে, স্থানীয় মুদ্রা দুর্বল হলে রপ্তানিতে বাড়তি সুবিধা মেলে। টাকার দামে এই পতনের ফলে বিশ্ববাজারে ভারতীয় পণ্যের দাম তুলনায় আরও সাশ্রয়ী হচ্ছে। এর ফলে রপ্তানি বাড়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। দাম কমলে পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়ে, চাহিদা বাড়ে এবং রপ্তানি খাতে নতুন গতি আসে। বিশেষজ্ঞদের মতে, “টাকা দুর্বল হলে বিদেশি বাজারে Made in India পণ্য আরও সস্তা হয়, ফলে রপ্তানির সুযোগ ব্যাপকভাবে বাড়ে।”
ভারতের আইটি শিল্প সবসময়ই বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ক্ষেত্রে শীর্ষে রয়েছে। টাকার দাম কমলে বিদেশে আইটি পরিষেবার খরচ তুলনামূলকভাবে কমে যায়। ফলে ভারতীয় তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর লাভ বাড়তে পারে। আইটি সেক্টরের এক সিনিয়র বিশ্লেষক জানিয়েছেন, “রুপি-ডলার রেট যে দিকে যাচ্ছে, তাতে আইটি এক্সপোর্টারদের আয় বাড়বে। পরিষেবা খাতটা সবচেয়ে বেশি লাভবান হতে পারে।” প্রযুক্তিভিত্তিক দুনিয়ায় বর্তমানে ভারতের অবস্থান যেখানে উল্লেখযোগ্য, সেখানে টাকার দরপতন আইটি রপ্তানির জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারে। ফার্মাসিউটিক্যাল খাতের অবস্থাও অনেকটা একই। বিশ্বব্যাপী ভারতীয় ওষুধের বাজার বড়। এই সেক্টরও বিদেশে পরিষেবা ও পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য আয় করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টাকার দাম কমলে ‘ইন্ডিয়ান ফার্মা’ -এর বিদেশি আয়ের পরিমাণ আরও বাড়বে। এতে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় ভারত আরও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।টাকার দরপতনের আরও একটি বড় দিক হলো রেমিট্যান্স। বিদেশে থাকা ভারতীয়দের পাঠানো অর্থ ভারতের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা পালন করে। রেমিট্যান্সের পরিমাণ বিশ্বে সর্বাধিক যে দেশ থেকে আসে, সেই তালিকার শীর্ষে রয়েছে ভারত। ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমে গেলে বিদেশে থাকা ভারতীয়রা যে অর্থ পাঠান, তা দেশে রুপান্তরিত হলে তা আগের তুলনায় বেশি হবে। ফলে বিদেশি আয় বাড়তে পারে। এক আর্থিক বিশেষজ্ঞ বলেন, “রেমিট্যান্সই ভারতের ফরেক্স রিজার্ভে সবচেয়ে বড় অবদান রাখে। টাকার দর কমলে প্রবাসীরা পাঠানো অর্থের পরিমাণ বাস্তবে ভারতের মানুষের হাতে আরও বেশি পৌঁছবে।”
কিন্তু, টাকার এই পতন নিয়ে উদ্বেগও কম নয়। ২০২৫ সালে এখনও পর্যন্ত ভারতীয় মুদ্রার দরপতন ৫ শতাংশেরও বেশি। এশিয়ার অন্যান্য মুদ্রার তুলনায় ভারতীয় টাকা বর্তমানে সবচেয়ে দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। মাত্র ৭৭৩টি ট্রেডিং সেশনে ভারতীয় মুদ্রা ৮০ থেকে ৯০-এ নেমে এসেছে, যা রেকর্ড পতনের কাছাকাছি। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলার শক্তিশালী হওয়া, বিদেশি বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ টাকার উপরে স্পষ্ট প্রভাব ফেলছে। তবে সামগ্রিক চিত্র বিচার করলে অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, টাকার দুর্বলতা যেমন আমদানিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে, তেমনি রপ্তানি ও বিদেশমুখী পরিষেবা খাতে নতুন সুযোগ তৈরি করছে। ভারতে প্রযুক্তি, ফার্মাসিউটিক্যাল, রেমিট্যান্স, এই তিন সেক্টরের শক্ত ভিত রয়েছে। ফলে টাকার পতন অর্থনীতির চাকা ঘোরাতে একটি ‘গোপন সুবিধা’ও এনে দিতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আর্থিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেই ভবিষ্যতের সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। ভারতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রেও হয়তো এটাই সময়। বাজারে লেনদেন বাড়বে, কর্মসংস্থান বাড়বে, এবং রপ্তানি শক্তিশালী হলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থাও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াতে পারে। টাকার দুর্বলতা তাই সবসময় দুর্বলতা নয়, সঠিক দিকনির্দেশনায় এটি অর্থনীতির জন্য নতুন শক্তিও হয়ে উঠতে পারে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Indian Talent in USA, Elon Musk Immigration Comment | আমেরিকার উন্নয়নে ভারতীয়দের বিশাল অবদান : অভিবাসন নিয়ে ইলন মাস্কের মন্তব্য আলোচনায়




