তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায় ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক : মহাকাশ গবেষণার ইতিহাসে নতুন পালক যোগ করল ইলন মাস্ক (Elon Musk)-এর নেতৃত্বাধীন স্পেসএক্স (SpaceX)। তাদের ড্রাগন (Dragon) মহাকাশযান প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (International Space Station বা ISS) -এর কক্ষপথ উঁচুতে তুলল। আগে শুধুমাত্র রাশিয়ার প্রোগ্রেস (Progress) মহাকাশযান এই দায়িত্ব পালন করত। এবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি দিয়ে সেই কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হল হল বলে উল্লেখ।

এ বিষয়ে স্পেসএক্সের তরফে জানানো হয়েছে, এই মাইলফলক মহাকাশযানের সক্ষমতাকে একটি নতুন মাত্রা দিল। ড্রাগনের ট্রাঙ্ক সেকশনে থাকা ড্রাকো (Draco) ইঞ্জিন ব্যবহার করে কক্ষপথকে প্রায় এক মাইল বাড়ানো হয়। পাঁচ মিনিট তিন সেকেন্ড ধরে চালানো এই ইঞ্জিন বার্নের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে, যা এখন প্রায় 260.9 বাই 256.3 মাইল কক্ষপথে ঘুরছে। নাসা (NASA)-র তরফে এই ঘটনাকে “দীর্ঘমেয়াদে মহাকাশ স্টেশনের টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ” বলে বর্ণনা করা হয়েছে। সংস্থার অধিকর্তারা আরও জানিয়েছেন, ২০২৫ সালের শরৎকালে ধারাবাহিকভাবে আরও কিছু দীর্ঘস্থায়ী বার্ন বা থ্রাস্টিং কার্যক্রমের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সুরক্ষা এবং কার্যকারিতা আরও বাড়বে। উল্লেখ্য যে, মহাকাশ স্টেশন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের টান বা ড্র্যাগের কারণে নিচের দিকে নেমে আসে। তাই তাকে নিয়মিত ‘রিবুস্ট’ বা কক্ষপথে ঠেলে তোলার প্রয়োজন হয়। এতদিন এই দায়িত্ব ছিল প্রধানত রাশিয়ার প্রোগ্রেস মহাকাশযানের হাতে। কিন্তু এখন স্পেসএক্সের ড্রাগনও সেই সক্ষমতা দেখাল, যা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য নতুন দিক খুলে দিল।
এই ড্রাগন ক্যাপসুলটি ২৫ আগস্ট উৎক্ষেপণ হয়েছিল, যা নাসার স্পেসএক্স ৩৩তম বাণিজ্যিক রিসাপ্লাই মিশনের (Commercial Resupply Mission) অংশ। এর মাধ্যমে গবেষণা সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় হাজার হাজার কেজি সরঞ্জাম আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। এই ক্যাপসুলটি ডিসেম্বরের শেষ অথবা আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মহাকাশ স্টেশনে অবস্থান করবে বলে আশা করা হচ্ছে। তারপর এটি পৃথিবীতে ফিরবে ক্যালিফোর্নিয়ার (California) উপকূলে, সঙ্গে থাকবে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফল ও প্রয়োজনীয় কার্গো।

স্পেসএক্সের এই সফল্য শুধু প্রযুক্তিগত উন্নতির পরিচয় নয়, তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ কর্মসূচির ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও। মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এর ফলে আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের রক্ষণাবেক্ষণে আরও নমনীয়তা আসবে এবং বিভিন্ন দেশের ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে। এ বিষয়ে স্পেসএক্সের এক মুখপাত্র বলেন, “আমরা সবসময় চেয়েছি ড্রাগন শুধু মালপত্র পৌঁছে দেওয়ার কাজে সীমাবদ্ধ না থেকে মহাকাশ স্টেশনের নিরাপত্তা রক্ষাতেও ভূমিকা নিক। এবার সেই পদক্ষেপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হল।”
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনে থাকা মহাকাশচারীদের জন্যও এই ঘটনা এক স্বস্তির বার্তা। কারণ কক্ষপথ উঁচুতে তোলার মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হল। নাসার কর্মকর্তারা আরও জানান, ভবিষ্যতে ড্রাগন মহাকাশযানের মাধ্যমে নিয়মিত রিবুস্ট কার্যক্রম চালানো যেতে পারে। এর ফলে মহাকাশ স্টেশনের দীর্ঘমেয়াদি কার্যক্রমের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি হল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, স্পেসএক্স এর আগেও মহাকাশ গবেষণার বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনন্য সাফল্য দেখিয়েছে। পুনর্ব্যবহারযোগ্য রকেট থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সব ক্ষেত্রেই তাদের ভূমিকা প্রশংসনীয়। তবে এবারকার সাফল্য একেবারেই নতুন। এটি শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতার প্রমাণ করল তা-ই নয়, বরং মহাকাশ গবেষণার ভবিষ্যৎ পথ নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মত ওয়াকিবহাল মহলের। মহাকাশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্পেসএক্সের এই সাফল্য ভবিষ্যতে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি মহাকাশ ভ্রমণ ও চাঁদ-মঙ্গল অভিযানে বড় ভূমিকা পালন করবে। কারণ মহাকাশে কোনও কক্ষপথ ধরে রাখতে পারা মানেই আরও নিরাপদ গবেষণা এবং ভবিষ্যতের মহাকাশ যাত্রার জন্য প্রস্তুতি। ইলন মাস্ক নিজেও বারবার বলেছেন যে মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ টিকে আছে মহাকাশ অন্বেষণের ওপর। ড্রাগনের এই সাফল্য সেই স্বপ্ন পূরণের পথে এক নতুন অধ্যায় রচনা করল।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Shubhanshu Shukla first Indian astronaut ISS | প্রথম ভারতীয় নভোচারীর বীরের মতো প্রত্যাবর্তন, লখনউয়ে শুভাংশু শুক্লাকে ঘিরে উচ্ছ্বাস



