কৌশিক রায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : ২০২৫ সাল ভারতীয় খুচরো বাণিজ্যের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী বছর হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকল। এই বছরেই প্রায় শেষ হয়ে গেল ‘ডেলিভারি ডে’-এর ধারণা। পরিকল্পিত অনলাইন কেনাকাটা এবং তাৎক্ষণিক পণ্যপ্রাপ্তির মধ্যকার সীমারেখা মুছে গিয়ে ই-কমার্স (E-commerce) ও কুইক কমার্স বা কিউ-কমার্স (Quick Commerce / Q-Com) একে অপরের সঙ্গে মিশে গেল। এক সময় যেখানে গ্রাহকের প্রধান প্রশ্ন ছিল, ‘পণ্যটি আসবে তো?’, সেখানে মাত্র এক বছরের ব্যবধানে সেই প্রশ্ন বদলে দাঁড়াল, ‘আর কত মিনিট লাগবে পৌঁছতে?’
আসলে যাত্রাটা শুরু হয়েছিল পরীক্ষামূলকভাবে। মাত্র দশ মিনিটে নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী পৌঁছে দেওয়ার প্রতিযোগিতা ছিল কিউ-কমার্সের প্রাথমিক লক্ষ্য। কিন্তু খুব দ্রুতই সেই সীমা ভেঙে কিউ-কমার্স পরিণত হয় বহু বিলিয়ন ডলারের ব্যবসায়। এখন শুধু মুদি দ্রব্য নয়, দামি ইলেকট্রনিক্স, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ থেকে শুরু করে ফ্রীজ, ওয়াশিং মেশিনের মতো হোয়াইট গুডসও মিনিটের মধ্যে গ্রাহকের হাতে পৌঁছে যাচ্ছে। একটি সাম্প্রতিক রিপোর্ট অনুযায়ী, কিউ-কমার্স ২০২৫ সালেই ভারতের দ্রুততম বর্ধনশীল খুচরো বিক্রয় ফরম্যাটে পরিণত হয়েছে। বর্তমানে এই প্ল্যাটফর্মগুলির মাসিক সক্রিয় ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি ৩০ লক্ষ। সূত্রের খবর অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে ব্র্যান্ডেড খুচরো বিক্রির অন্তত ১০ শতাংশ দখল করবে কিউ-কমার্স। শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের আয় বৃদ্ধি এবং সুবিধাভিত্তিক কেনাকাটার প্রবণতা এই বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ই-কমার্সের বড় সংস্থাগুলিও পিছিয়ে থাকেনি। অ্যামাজন (Amazon) তাদের দ্রুত ডেলিভারি পরিষেবা ‘অ্যামাজন নাউ’ (Amazon Now) চালু করেছে, অন্যদিকে ফ্লিপকার্ট (Flipkart) এনেছে ‘ফ্লিপকার্ট মিনিটস’ (Flipkart Minutes)। এর মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যায়, দ্রুত ডেলিভারি আর আলাদা কোনও প্রিমিয়াম পরিষেবা নয়, তা গোটা শিল্পের নতুন মানদণ্ড।
কিউ-কমার্সের প্রকৃত ব্যাপ্তি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে ২০২৫ সালের ধনতেরাসে (Dhanteras)। সোনার ও রুপোর কয়েনের মতো মূল্যবান সামগ্রীও গ্রাহকের অর্ডার দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে গিয়েছিল। উৎসবের দিনে এই ধরনের বিক্রি ও ডেলিভারি খুচরো বাণিজ্যের চেনা সংজ্ঞাকেই বদলে দিয়েছে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল। এই দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে আইপিও বাজারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। মীশো (Meesho) -এর ৫,৪২১ কোটি টাকার আইপিও প্রমাণ করে দিয়েছে, টিয়ার-২ ও টিয়ার-৩ শহরের মূল্যসচেতন ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কতটা শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে, সূত্রের খবর অনুযায়ী, জেপ্টো (Zepto) সেবি (SEBI)-এর কাছে গোপনে প্রাথমিক নথি জমা দিয়েছে, প্রায় ১১,০০০ কোটি টাকা তোলার লক্ষ্যে, এবং ২০২৬ সালে তালিকাভুক্তির পরিকল্পনা করছে। এই সব ঘটনাই দেখাচ্ছে, কিউ-কমার্স শুধু শহরকেন্দ্রিকই নয়, সর্বভারতীয় খুচরো অর্থনীতির বাজারে একটি বড় স্তম্ভ হয়ে উঠছে। তবে এই দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গেই বিতর্কও বেড়েছে। ২০২৫ সালে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও ব্যবসায়ী সংগঠন কিউ-কমার্সের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রক নজরদারির দাবি আরও জোরালো করেছে। বিশেষ করে ছোট কিরানা দোকানগুলির (Kirana Stores) মুনাফা কমে যাওয়ায় ‘কিরানা সংঘাত’ (Kirana Conflict) একটি বড় ইস্যুতে পরিণত হয়। অভিযোগ ওঠে, কিউ-কমার্স সংস্থাগুলি অতিরিক্ত ছাড় ও সম্ভাব্য প্রিডেটরি প্রাইসিংয়ের মাধ্যমে বাজার দখল করছে।
এই প্রেক্ষাপটে প্রতিযোগিতা কমিশন অফ ইন্ডিয়া (Competition Commission of India- CCI) মে মাসে উৎপাদন ব্যয়ের নতুন নিয়ম বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করে, যাতে গভীর ছাড় ও মূল্যনীতির আরও কড়া নজরদারি করা যায়। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় ভোক্তা সুরক্ষা কর্তৃপক্ষ (Central Consumer Protection Authority- CCPA) লিগ্যাল মেট্রোলজি আইন (Legal Metrology Act) অনুযায়ী প্যাকেটজাত পণ্যের তথ্য প্রকাশে অনিয়মের অভিযোগে একাধিক সংস্থাকে নোটিস পাঠায়। আরেকটি বড় বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু ছিল গিগ কর্মীদের (Gig Workers) কল্যাণ। দ্রুত ডেলিভারির চাপ, সড়ক নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে। অবশেষে এই দাবিগুলি গুরুত্ব পায় নভেম্বর মাসে, যখন কেন্দ্রীয় সরকার চারটি শ্রম কোড (Labour Codes) কার্যকর করার বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এর ফলে কিউ-কমার্স ও অন্যান্য গিগ অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত বিপুল সংখ্যক কর্মী প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রক স্বীকৃতি ও সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এলেন।
ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ২০২৬ সাল কিউ-কমার্সের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ হতে চলেছে। শীর্ষ তিনটি প্ল্যাটফর্ম তাদের অর্ডার সংহতকরণ, পণ্যের বিভাগ বিস্তার এবং ডেলিভারির ভৌগোলিক সীমা আরও বাড়ানোর দিকে নজর দেবে। তবে একই সঙ্গে তাদের বৃদ্ধির গতি ও নিয়ন্ত্রক বিধিনিষেধের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ উল্লেখ্য ২০২৫ সালেই ভারতে কেনাকাটার অভ্যাসে এক মৌলিক পরিবর্তন ঘটে গিয়েছে। ‘ডেলিভারি ডে’ থেকে ‘ডেলিভারি মিনিট’-এ এই যাত্রা কেবল প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং ভোক্তার প্রত্যাশা ও বাজার কাঠামোর এক আমূল রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করছে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : PM Modi Flags Antimicrobial Resistance in Mann Ki Baat | ‘মন কি বাত’-এ অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রসঙ্গ তুলে সতর্ক প্রধানমন্ত্রী মোদী, অ্যান্টিবায়োটিক অপব্যবহারে বিপদের আশঙ্কা আইসিএমআর-এর




