সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ ভাঙড় : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ -এর ফলাফলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভাঙড় (Bhangar) কেন্দ্র আবারও নজরের কেন্দ্রে। বহু জল্পনা, রাজনৈতিক সমীকরণ ও প্রচারের ঝড় পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের গড় ধরে রাখলেন ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্ট (Indian Secular Front)-এর নেতা নওশাদ সিদ্দিকি (Naushad Siddiqui)। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা বাকি থাকলেও গণনার প্রবণতা বলছে, তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর প্রার্থী শওকত মোল্লা (Shaukat Molla)-কে প্রায় ৩১ হাজার ভোটে পিছনে ফেলে দিয়েছেন তিনি। বিজেপির (Bharatiya Janata Party) জয়ন্ত গায়েন (Jayanta Gayen) অনেকটা পিছিয়ে তৃতীয় স্থানে।
এই ফলাফল ভাঙড়ের রাজনৈতিক চরিত্রের ধারাবাহিকতারও প্রতিফলন। বহু বছর ধরেই এই কেন্দ্র অন্য ধারার রাজনীতির সাক্ষী। ২০২১ সালে তৃণমূল ও বিজেপির তীব্র লড়াইয়ের মাঝেও এখান থেকে জয়ী হয়েছিলেন নওশাদ। সেই সময় থেকেই তিনি বিধানসভায় এক আলাদা সুর তৈরি করেছিলেন। ‘মানুষ বিকল্প খুঁজছে, সেই বিশ্বাসেই আমরা এগিয়েছি’, ঘনিষ্ঠ মহলে এমন মন্তব্য শোনা যাচ্ছে।
ভোটের আগে ভাঙড় কেন্দ্রকে ঘিরে উত্তেজনা তুঙ্গে ছিল। তৃণমূল কৌশলগত ভাবে ক্যানিং পূর্ব (Canning Purba) কেন্দ্র থেকে শওকত মোল্লাকে এখানে প্রার্থী করে। লক্ষ্য ছিল আইএসএফ-এর শক্ত ঘাঁটিতে প্রভাব বিস্তার করা। প্রচারে শওকতকে নিয়ে নানা স্লোগান, গানও ভাইরাল হয়। ‘প্রচারে জোর ছিল, কিন্তু ভোটবাক্সে সেই প্রতিফলন দেখা গেল না’, এমন প্রতিক্রিয়া উঠে এসেছে স্থানীয় স্তর থেকে। উল্লেখ্য, নওশাদ সিদ্দিকির রাজনৈতিক উত্থানও কম নাটকীয় নয়। ফুরফুরা শরিফ (Furfura Sharif)-এর পির পরিবারে জন্ম তাঁর। দাদা আব্বাস সিদ্দিকি (Abbas Siddiqui) আইএসএফ গঠন করলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে সরাসরি অংশ নেননি। সেই জায়গা থেকে দলের মুখ হয়ে ওঠেন নওশাদ। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি জাতীয় স্তরের ভলিবল খেলোয়াড় ছিলেন। মাঠ থেকে ময়দানে তাঁর এই পরিবর্তন অনেককেই অবাক করেছিল।
২০২১ সালের নির্বাচনে বামফ্রন্ট (Left Front) ও কংগ্রেস (Congress)-এর সঙ্গে জোট বেঁধে ভাঙড় থেকে জয় পান নওশাদ সিদ্দিকী। সেই সময় ২৬ হাজারের বেশি ভোটে তৃণমূল প্রার্থীকে হারিয়েছিলেন। গত পাঁচ বছরে জোটে মতভেদ থাকলেও সম্পর্ক পুরোপুরি ভাঙেনি। ‘ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির পথেই এগোতে চাই’, একাধিক সভায় এই অবস্থান জানিয়েছেন নওশাদ। অপরদিকে, ভাঙড় কেন্দ্র বরাবরই রাজনৈতিক সংঘর্ষের জন্য পরিচিত। অতীতেও এখানে অপ্রত্যাশিত ফল দেখা গিয়েছে। ২০০৬ সালে বামেদের দাপটের মধ্যেও তৃণমূল নেতা আরাবুল ইসলাম (Arabool Islam) জিতেছিলেন। ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদলের ঢেউ উঠলেও ভাঙড়ে সিপিএম (CPM)-এর বাদল জমাদার (Badal Jamadar) জয়ী হন। ২০১৬ সালে আবার তৃণমূল এই আসন ফিরে পায়। ফলে ভাঙড়ে ভোট মানেই আলাদা সমীকরণ।
এইবারের নির্বাচনে নওশাদের সামনে চ্যালেঞ্জ ছিল আরও বড়। ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের ফল অনুযায়ী এই কেন্দ্রে তৃণমূল উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে অনেকেই মনে করেছিলেন, নওশাদের পক্ষে গড় ধরে রাখা কঠিন হবে। কিন্তু ফলাফল অন্য কথা বলছে। গত পাঁচ বছরে নওশাদের রাজনৈতিক পথ সহজ ছিল না। একাধিকবার গ্রেফতার হতে হয়েছে তাঁকে। ২০২৩ সালে ধর্মতলায় (Dharmatala) আন্দোলনের সময় দীর্ঘদিন জেলে থাকতে হয়েছিল। ২০২৪ সালে আবারও একটি বিক্ষোভ কর্মসূচী ঘিরে তাঁকে আটক করা হয়। ‘লড়াই থামেনি, থামবেও না’, সেই সময় এমন মন্তব্য করেছিলেন তিনি। জেল থেকে বেরিয়েও সংগঠনকে সক্রিয় রেখেছেন।
নওশাদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে নানা মামলা থাকলেও রাজনৈতিকভাবে তিনি পিছিয়ে যাননি। এলাকায় এলাকায় সংগঠন শক্তিশালী করার কাজ চালিয়ে গিয়েছেন। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই তাঁর বড় শক্তি বলে মনে করা হয়। ভোটের আগে তাঁর তৃণমূলে যোগ দেওয়ার জল্পনাও ছড়িয়েছিল। নবান্নে (Nabanna) গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)-এর সঙ্গে তাঁর বৈঠকের পর সেই জল্পনা আরও জোরদার হয়। তবে তিনি জানান, ‘ভাঙড়ের উন্নয়ন নিয়েই আলোচনা করতে গিয়েছিলাম।’ শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান বদলাননি।
এই নির্বাচনে আইএসএফ রাজ্যের ৩১টি আসনে লড়াই করলেও ভাঙড় ছাড়া অন্য কোথাও জয় পায়নি। তবু এই একটি আসন ধরে রাখা দলের কাছে বড় সাফল্য। কারণ, দুই বড় দলের মাঝেও নিজেদের জায়গা ধরে রাখা সহজ নয়। নওশাদের এই জয় রাজ্যের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তির উপস্থিতিকে আবারও সামনে এনে দিল। তাঁর এই ধারাবাহিকতা আগামী দিনে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত



