সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ খড়গপুর : পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬ -এর ফলাফলে অন্যতম আলোচিত নাম দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। এক সময়ের রাজ্য সভাপতি, যিনি লোকসভা ভোটে পরাজয়ের ধাক্কা সামলাচ্ছিলেন, সেই তিনিই আবার নিজের পুরনো আসন খড়্গপুর সদর (Kharagpur Sadar)-এ ফিরে এসে বড় ব্যবধানে জয় তুলে নিলেন। শুরু থেকেই এগিয়ে থাকা এই বিজেপি (Bharatiya Janata Party) প্রার্থী শেষপর্যন্ত তৃণমূল কংগ্রেস (Trinamool Congress)-এর প্রদীপ সরকার (Pradip Sarkar)-কে ৩০ হাজারের বেশি ভোটে পরাজিত করেন।
সোমবার সকাল থেকেই ভোটগণনায় ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে ছিলেন দিলীপ। প্রতিটি রাউন্ডে তাঁর ব্যবধান বাড়তে থাকে। ভোটের দিন সকালেই তিনি আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিতে বলেছিলেন, ‘মানুষ যে রায় দিয়েছে, তাতে বদল আসবেই।’ যদিও তিনি এক লক্ষ ভোটে জয়ের আশা প্রকাশ করেছিলেন, বাস্তবে সেই ব্যবধান না হলেও তাঁর জয়ের বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ফল ঘোষণার আগেই। দিলীপ ঘোষের এই জয় শুধু একটি আসনের ফল নয়, বরং তাঁর রাজনৈতিক জীবনের ওঠানামার গল্পের নতুন অধ্যায়। ২০১৬ সালে প্রথম বার এই খড়্গপুর সদর থেকেই বিধায়ক হন তিনি। সেই সময় বিজেপি রাজ্যে মাত্র তিনটি আসন জিতেছিল। সেই প্রেক্ষাপটে দিলীপের জয় ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। পরে ২০১৯ সালে লোকসভা নির্বাচনে মেদিনীপুর (Medinipur) কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়ে তিনি সংসদে পৌঁছন। তৃণমূল প্রার্থী মানস ভুঁইয়া (Manas Bhunia)-কে বড় ব্যবধানে হারিয়ে জাতীয় স্তরেও নিজের অবস্থান মজবুত করেন।
তবে রাজনৈতিক পথ সব সময় মসৃণ ছিল না। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির উত্থান ঘটলেও ক্ষমতা দখল করা সম্ভব হয়নি। তার কিছুদিনের মধ্যেই রাজ্য সভাপতির পদ থেকে সরতে হয় দিলীপকে। পরে ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে বর্ধমান-দুর্গাপুর (Bardhaman-Durgapur) কেন্দ্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি পরাজিত হন তৃণমূলের কীর্তি আজ়াদ (Kirti Azad)-এর কাছে। সেই হার তাঁর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি করেছিল। দলের অন্দরে তখন তাঁর উপস্থিতি অনেকটাই কমে গিয়েছিল। বড় কর্মসূচিতে তাঁকে দেখা যেত না। ‘নিজের মতো করে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলাম’, ঘনিষ্ঠ মহলে এমন কথাও শোনা গিয়েছিল। তবে ২০২৫ সালের শেষ দিকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। নতুন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) -এর হাত ধরে দিলীপ আবার সক্রিয় রাজনীতির কেন্দ্রে ফিরে আসেন। দলীয় কর্মসূচিতে তাঁর উপস্থিতি বাড়ে, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছেও গুরুত্ব ফিরে পান।
দিলীপ ঘোষের রাজনৈতিক যাত্রা বরাবরই ব্যতিক্রমী। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (RSS)-এর প্রচারক হিসেবে ১৯৮৪ সালে তাঁর পথচলা শুরু। দীর্ঘ সময় সংগঠনের কাজে যুক্ত থাকার পর ২০১৪ সালে তাঁকে সরাসরি রাজনীতিতে আনা হয়। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি রাজ্য বিজেপির গুরুত্বপূর্ণ পদে উঠে আসেন। এক বছরের মধ্যেই রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব পান, যা তাঁর দ্রুত উত্থানের প্রমাণ। দিলীপ ঘোষ রাজনৈতিক জীবনে বিতর্কও কম নয়। বিভিন্ন সময়ে তাঁর মন্তব্য ঘিরে আলোচনা হয়েছে। ‘মনে যা থাকে, মুখে সেটাই বলি’ এই ধরণের অবস্থান তাঁকে যেমন আলাদা পরিচিতি দিয়েছে, তেমনই সমালোচনার মুখেও ফেলেছে। কখনও তাঁর বক্তব্যে রাজনৈতিক উত্তাপ বেড়েছে, কখনও তা দলের কর্মীদের উজ্জীবিত করেছে বলেও সমর্থকদের দাবি।
খড়্গপুর সদর কেন্দ্রে তাঁর প্রত্যাবর্তন তাই কেবল নির্বাচনী জয় নয়, বরং রাজনৈতিক পুনরুজ্জীবনের প্রতীক হিসেবেও দেখা হচ্ছে। এই কেন্দ্রে তাঁর ব্যক্তিগত যোগাযোগ, সংগঠন গড়ে তোলার অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় স্তরে দীর্ঘদিনের কাজ তাঁকে বাড়তি সুবিধা দিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। ভোটের ফলাফলের দিন জয়ের পর তিনি বলেন, ‘খড়্গপুরের মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞ। তারা আবার সুযোগ দিয়েছে কাজ করার।’ তাঁর এই মন্তব্যে স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের ইঙ্গিত মিলেছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করছে, তাঁর এই জয় রাজ্যে বিজেপির সংগঠন আরও শক্তিশালী করতে ভূমিকা নিতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দিলীপ ঘোষের এই প্রত্যাবর্তন তাৎপর্যপূর্ণ। লোকসভা ভোটে হারের পর অনেকেই ভেবেছিলেন তাঁর রাজনৈতিক প্রভাব কমে যাবে। কিন্তু খড়্গপুরে জয়ের মাধ্যমে তিনি আবার প্রমাণ করলেন, রাজ্যের রাজনীতিতে তাঁর উপস্থিতি এখনও প্রাসঙ্গিক। এই ফলাফলের পর এখন নজর থাকবে, বিধানসভায় তিনি কী ভূমিকা নেন এবং দলের ভিত আরও মজবুত করতে কীভাবে এগোন। দিলীপ ঘোষের এই কামব্যাক নিঃসন্দেহে ২০২৬ সালের নির্বাচনের অন্যতম চর্চিত ঘটনাগুলির মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত



