সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নাসিক : মহারাষ্ট্রের নাসিক (Nashik) জেলায় এক ভয়ঙ্কর অপরাধচক্রের পর্দাফাঁস করল পুলিশ। নিজেকে ‘ক্যাপ্টেন’ পরিচয় দেওয়া এক স্বঘোষিত ধর্মগুরু ও নিউমেরোলজিস্টকে (সংখ্যা বিচারক) গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে এক মহিলাকে ধর্ষণ এবং অন্তত ৫৮ জন মহিলাকে যৌন হেনস্থার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে কৌশলে মহিলাদের আস্থা অর্জন করে তাঁদের উপর নির্যাতন চালাতেন তিনি। এই ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে মহারাষ্ট্রজুড়ে। পুলিশ সূত্রে, অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন অবসরপ্রাপ্ত মার্চেন্ট নেভি অফিসার। সেই পরিচয়কে সামনে রেখে সমাজে নিজের গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছিলেন। পাশাপাশি নিজেকে ‘সমস্যা সমাধানকারী’ এবং ‘নিউমেরোলজি বিশেষজ্ঞ’ হিসেবে প্রচার করতেন। অনেকেই ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সমস্যার সমাধানের আশায় তাঁর কাছে যেতেন। এই সুযোগকেই হাতিয়ার করে তিনি অপরাধের জাল বিস্তার করেন। অভিযোগে উঠে এসেছে, মহিলাদের প্রথমে বিশ্বাসের বন্ধনে বেঁধে ফেলতেন অভিযুক্ত। তাঁদের বলা হত, ‘তন্ত্রমন্ত্রের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা সম্ভব।’ সেই প্রলোভনে অনেকেই তাঁর অফিসে যেতেন। এরপর শুরু হত পরিকল্পিত প্রতারণা। পুলিশ জানিয়েছে, ‘অফিসে ঢোকার পর মহিলাদের পানীয় দেওয়া হত, যাতে মাদক মেশানো থাকত।’ সেই পানীয় গ্রহণ করার পরই ভুক্তভোগীরা অচেতন বা সম্মোহিত অবস্থায় চলে যেতেন। সেই সুযোগে তাঁদের উপর যৌন নির্যাতন চালানো হত।
ঘটনাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে গোপন ক্যামেরার ব্যবহার। তদন্তে জানা গিয়েছে, অভিযুক্তের অফিসে লুকানো ক্যামেরা বসানো ছিল। মহিলাদের অজান্তেই তাঁদের উপর হওয়া নির্যাতনের দৃশ্য রেকর্ড করা হত। শুধু ভিডিও নয়, তাঁদের অশ্লীল ছবিও তোলা হত। পরে সেই ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে তাঁদের চুপ থাকতে বাধ্য করা হত বলে অভিযোগ। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কেউ প্রতিবাদ করলে ভয় দেখানো হত। তাঁদের বলা হত, ‘স্বামীর মৃত্যু হবে’, বা ‘সংসার ভেঙে দেওয়া হবে।’ এই ধরনের মানসিক চাপে অনেকেই মুখ খুলতে সাহস পাননি। এক নির্যাতিতা জানিয়েছেন, ‘গত এক বছর ধরে আমাকে হেনস্থা করা হয়েছে। পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভেবে এতদিন চুপ ছিলাম।’ পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এই অপরাধচক্র সক্রিয় ছিল। এই সময়ের মধ্যে অন্তত ৫৮ জন মহিলা একই ধরনের ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ। তদন্তকারীরা মনে করছেন, সংখ্যাটি আরও বাড়তে পারে।
অভিযুক্তের বাড়ি ও অফিসে তল্লাশি চালিয়ে একটি পেন ড্রাইভ উদ্ধার করেছে পুলিশ। সেখানে একাধিক ভিডিও পাওয়া গিয়েছে, যা এই মামলার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পুলিশ জানিয়েছে, ‘উদ্ধার হওয়া ভিডিওগুলিতে বহু মহিলার নির্যাতনের দৃশ্য রয়েছে।’ এই তথ্য সামনে আসার পর মামলার গুরুত্ব আরও বেড়েছে। অভিযুক্ত নাসিকে একটি অফিস খুলেছিলেন, যা বাইরে থেকে সাধারণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মতো দেখাত। জানা গিয়েছে, জমি-বাড়ির ব্যবসার আড়ালে এই কার্যকলাপ চালানো হত। এই অফিসেই মহিলাদের ডেকে এনে অপরাধ সংঘটিত করা হত। তদন্তে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্তের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের যোগাযোগ ছিল। গত ১৫ বছরে বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে উঠেছেন তিনি। তাঁর সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ২০০ কোটি টাকা বলে জানা গিয়েছে। পার্থডী, সিন্নর, মিরগাঁও, ওঝর এবং শিরডি, এই সব জায়গায় তাঁর সম্পত্তি রয়েছে। নাসিকেই প্রায় ৩০ কোটি টাকার জমি রয়েছে বলে দাবি তদন্তকারীদের।এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠছে, কী ভাবে এতদিন ধরে এই ধরনের অপরাধ গোপনে চলতে পারল। বহু মহিলার অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন আগে সামনে আসেনি বিষয়টি, তা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা বজায় রেখে তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অভিযুক্তকে গ্রেফতারের পর জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। আরও কেউ এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুলিশ জানাচ্ছে, ‘এই মামলায় আরও তথ্য সামনে আসতে পারে।’ প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ঘটনার পর মহারাষ্ট্রে মহিলাদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতারণা ও ভুয়ো ধর্মীয় আস্থার নামে চলা অপরাধের বিরুদ্ধে সতর্ক থাকার প্রয়োজনীয়তাও উঠে এসেছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Somnath Temple Stands Tall After 1000 Years, Tribute by PM Narendra Modi | হাজার বছরেও অটল সোমনাথ, প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধায় ইতিহাসের নতুন পাঠ




