সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : পশ্চিমবঙ্গের ২০২৬ বিধানসভা নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই নতুন নতুন বিতর্ক সামনে আসছে। শুক্রবার তৃণমূল কংগ্রেসের ইস্তাহার প্রকাশের মঞ্চ থেকেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee) একাধিক গুরুতর অভিযোগ তুলে সরাসরি নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আক্রমণ শানালেন। ভোটার তালিকার ‘বিবেচনাধীন’ নাম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি দাবি করেন, ‘২২ লক্ষের মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ নাম বাদ পড়তে পারে’ যা রাজ্যের নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, রাজ্যে মোট প্রায় ৬০ লক্ষ ‘বিবেচনাধীন’ ভোটারের মধ্যে এ পর্যন্ত ২২ লক্ষের মতো নাম যাচাইয়ের প্রক্রিয়ার মধ্যে এসেছে। তাঁর কথায়, ‘আমি সূত্র মারফত শুনেছি, ২২ লক্ষ ৬০ হাজার নামের মধ্যে প্রায় ১০ লক্ষ বাদ যাবে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই বাদ পড়ার তালিকায় মালদহ, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার মানুষের সংখ্যা বেশি হতে পারে। তাঁর দাবি, ‘একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের নাম সবচেয়ে বেশি বাদ পড়ছে’, পাশাপাশি হিন্দু, মতুয়া এবং রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের নামও রয়েছে এই তালিকায়।
এই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এই করে করে দিনগুলো নষ্ট করছে’, যা থেকে বোঝা যায় ভোটের আগে এই যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হবে কি না, তা নিয়েই সংশয় তৈরি হয়েছে। যদিও নির্বাচন কমিশনের সূত্র অনুযায়ী, ইতিমধ্যে ২৫ লক্ষের বেশি ভোটারের তথ্য যাচাই করা হয়েছে, তবুও চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। ভোটার তালিকার বিষয়টি ছাড়াও প্রশাসনিক স্তরে একাধিক বদলি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, ‘অলরেডি রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেছে, মুখে বলছে না, কিন্তু কাজকর্মে সেটা বোঝা যাচ্ছে।’ তিনি বলেন, নির্বাচনের সময় কিছু আধিকারিক বদলি হওয়া স্বাভাবিক, কিন্তু এ বার যে ভাবে একের পর এক আমলা এবং পুলিশ আধিকারিককে সরানো হচ্ছে, তা অভূতপূর্ব। মুখ্যমন্ত্রী উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘ফুড ডিপার্টমেন্টের প্রিন্সিপাল সেক্রেটারিকে অবজ়ার্ভার করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পঞ্চায়েত দফতরের আধিকারিকদেরও সরানো হচ্ছে। এঁরা নির্বাচনের কাজে যুক্ত ছিলেন না, উন্নয়নমূলক কাজ দেখতেন।’ তাঁর আশঙ্কা, এই ধরনের পদক্ষেপে প্রশাসনিক কাজে প্রভাব পড়তে পারে। তিনি বলেন, ‘ঝড়-জলে রাস্তা ভেঙে গেলে, দুর্যোগ হলে কে দেখবে? মানুষ রেশন পাবে কোথা থেকে?’ এই প্রশ্ন তুলে তিনি জনজীবনের উপর সম্ভাব্য প্রভাবের কথাও তুলে ধরেন। এখানেই থেমে থাকেননি মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর অভিযোগ, বাইরে থেকে যে আধিকারিকদের আনা হচ্ছে, তাঁদের রাজ্যের ভূগোল, সংস্কৃতি বা প্রশাসনিক কাঠামো সম্পর্কে ধারণা নেই। তিনি বলেন, ‘তাঁরা এখানকার মানুষকে চেনেন না, বুথ বা ব্লকের বাস্তব পরিস্থিতি জানেন না।’ এই পরিস্থিতিতে কোনও সমস্যা তৈরি হলে তার দায় কেন্দ্রীয় সরকারের উপরই বর্তাবে বলে দাবি করেন তিনি।
কেন্দ্রীয় সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে কটাক্ষ করে মমতা বলেন, ‘লজ্জা! প্রেসিডেন্ট রুল করে মোদীজিকে বাংলায় নির্বাচন করাতে হচ্ছে!’ তাঁর এই মন্তব্য ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, রাজ্যকে ভাগ করার পরিকল্পনাও রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘উত্তরবঙ্গকে আলাদা করে অন্য অংশের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন রাজ্য তৈরির চিন্তাভাবনা চলছে।’ এছাড়াও তিনি দাবি করেন, ভবিষ্যতে ‘ডিলিমিটেশন’, ‘এনআরসি’ এবং জনগণনার নামে আরও নাম বাদ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এই সব প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকা থেকে মানুষকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হবে।’ মুখ্যমন্ত্রীর এই মন্তব্যের পাল্টা জবাব দিয়েছে বিজেপি। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য (Samik Bhattacharya) বলেন, ‘মানুষই চাইছেন রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হোক।’ তাঁর দাবি, রাজ্যের সাধারণ মানুষ বর্তমান সরকারের প্রতি আস্থা হারিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ৩৫৬ ধারা প্রয়োগ করে সরকার ফেলতে চাই না, সেটা আমাদের নীতির মধ্যে নেই।’ শমীকের বক্তব্যে আরও উঠে আসে, মুখ্যমন্ত্রী নিজেই এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চাইছেন, যাতে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া যায়। তাঁর মতে, ‘তিনি জানেন, ভোটে জেতা কঠিন, তাই এই ধরনের অভিযোগ তুলে অন্য বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।’ এই পরিস্থিতিতে ভোটের আগে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। ভোটার তালিকা, প্রশাসনিক বদলি, কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাত, এসব এ নির্বাচনের আবহ আরও জটিল হচ্ছে। এখন নজর থাকবে নির্বাচন কমিশনের পরবর্তী পদক্ষেপ এবং চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের দিকে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee NRS Inauguration | ১৪৮ কোটি টাকায় এনআরএসে আধুনিক ‘বিসি রায় মেমোরিয়াল বিল্ডিং’, স্বাস্থ্য পরিকাঠামো জোরদারে বড় পদক্ষেপ রাজ্যের




