সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ফের চমক। দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন, দলীয় অন্দরের অস্বস্তি এবং সাম্প্রতিক নির্বাচনী ফলাফলের চাপে থাকা তৃণমূল কংগ্রেস এবং তার নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে (Mamata Banerjee) ঘিরে তৈরি হল নতুন জল্পনা। দলের প্রাক্তন নেতা এবং বর্তমানে এজেউপি (AJUP) -এর প্রতিষ্ঠাতা হুমায়ুন কবির (Humayun Kabir) প্রকাশ্যে এমন এক প্রস্তাব দিয়েছেন, যা রাজ্যের রাজনৈতিক মানচিত্রে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। হুমায়ুন কবির জানিয়ে দিয়েছেন, প্রয়োজনে তিনি নিজের জেতা আসন ছেড়ে দিতে প্রস্তুত, যাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুনরায় বিধানসভায় প্রবেশের সুযোগ পান। তাঁর কথায়, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যদি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে আমি রেজিনগর থেকে তাঁকে জেতানোর ব্যবস্থা করতে পারি।’ এই মন্তব্য সামনে আসতেই রাজনৈতিক মহলে জোর চর্চা শুরু হয়েছে।

২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে হুমায়ুন কবির নওদা (Nowda) এবং রেজিনগর (Rejinagar) দুই কেন্দ্র থেকেই জয়ী হয়েছেন। আইন অনুযায়ী তাঁকে একটি আসন ছাড়তেই হবে। সেই জায়গাতেই তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, রেজিনগর কেন্দ্রটি তিনি খালি করে দিতে পারেন, যদি মমতা সেখানে উপনির্বাচনে লড়তে চান। তাঁর বক্তব্য, ‘নন্দীগ্রামে তিনি জিততে পারবেন না, কিন্তু রেজিনগরে পরিস্থিতি আলাদা। আমি পদত্যাগ করলে তাঁর জয়ের পথ সহজ হবে।’ এই প্রস্তাব শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা নাকি কৌশল, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠছে। কারণ হুমায়ুন কবির একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ মুখ ছিলেন। ২০১১ সালে কংগ্রেস (Congress) প্রার্থী হিসাবে রেজিনগর থেকে জিতে পরে তৃণমূলে যোগ দেন এবং মন্ত্রিত্বও সামলান। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দলের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব বাড়তে থাকে। একাধিকবার বহিষ্কৃত হওয়ার পর শেষমেশ ২০২৫ সালের শেষে তিনি নিজের দল ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’ (Aam Janata Unnayan Party) -এর সূচনা করেন। সাম্প্রতিক নির্বাচনে তিনি তৃণমূলের বিরোধিতায় সরব ছিলেন। সেই প্রেক্ষাপটে তাঁর এই হঠাৎ প্রস্তাব অনেকের কাছেই বিস্ময়কর। তবুও হুমায়ুন নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেন, ‘আজ আমি যা কিছু, তার পেছনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবদান রয়েছে। তাঁর বর্তমান পরিস্থিতি আমাকে কষ্ট দেয়।’ তাঁর দাবি, রেজিনগর এলাকায় তাঁর প্রভাব এখনও অটুট এবং সেখানে তিনি যাকে সমর্থন করবেন, সেই প্রার্থীই এগিয়ে থাকবে।
রাজ্যের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই মন্তব্য যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। তৃণমূল কংগ্রেস একদিকে সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাসে ব্যস্ত, অন্যদিকে নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে চাপের মুখে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে নন্দীগ্রাম (Nandigram) কেন্দ্র থেকে লড়াই করে রাজনৈতিক লড়াইয়ের বার্তা দিয়েছেন, কিন্তু সেই লড়াই সহজ নয় বলেই মনে করছে বিভিন্ন মহল। এই আবহে বিকল্প আসন হিসাবে রেজিনগরের নাম উঠে আসা নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই প্রস্তাব আদৌ বাস্তবায়িত হবে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। দলীয় অন্দরে এই প্রস্তাব কীভাবে দেখা হচ্ছে, সেটাও স্পষ্ট নয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ধরনের প্রস্তাব অনেক সময় চাপ তৈরি করার কৌশল হিসাবেও ব্যবহার করা হয়।
একদিকে যেখানে তৃণমূল কংগ্রেস নিজেদের সংগঠন মজবুত করার দিকে নজর দিচ্ছে, অন্যদিকে হুমায়ুন কবিরের এই পদক্ষেপ রাজনীতির অন্দরে নতুন সমীকরণের সম্ভাবনা তৈরি করছে। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদ (Murshidabad) জেলার রাজনীতিতে তাঁর প্রভাব যে এখনও উল্লেখযোগ্য, তা এই মন্তব্য থেকেই পরিষ্কার। রাজনৈতিক ইতিহাসে এর আগেও দেখা গেছে, বিরোধী শিবিরের নেতা কোনও বড় নেতাকে সমর্থন জানিয়ে সমীকরণ বদলে দিয়েছেন। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এই প্রস্তাব কতটা গুরুত্ব পাবে, তা নির্ভর করছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তৃণমূল নেতৃত্বের সিদ্ধান্তের উপর।
হুমায়ুন কবিরের এই ঘোষণার পর রেজিনগর কেন্দ্র ঘিরে কৌতূহল বেড়েছে। স্থানীয় স্তরে তাঁর সংগঠন কতটা শক্তিশালী, এবং উপনির্বাচনে তার প্রভাব কতটা পড়তে পারে, তা নিয়েও আলোচনা চলছে। পাশাপাশি, তৃণমূল কংগ্রেস কি এই সুযোগ গ্রহণ করবে, নাকি নিজেদের শক্তিতেই লড়াই চালিয়ে যাবে, সেটাও এখন বড় প্রশ্ন। বঙ্গ রাজনীতিতে এই মুহূর্তে যে অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে, তার মধ্যেই হুমায়ুন কবিরের প্রস্তাব নতুন মাত্রা যোগ করেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, সেদিকেই এখন নজর রাজ্যের রাজনৈতিক মহলের।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mamata Banerjee FIR, Dharmatala Controversy | মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে শিলিগুড়িতে এফআইআর, সার্বভৌমত্ব প্রশ্নে নতুন রাজনৈতিক ঝড়



