সাশ্রয় নিউজ ★ কলকাতা: ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া তথা এসআইআর (SIR) ইস্যুতে ফের সরব হলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (Mamata Banerjee)। ভবানীপুরে জৈন সম্প্রদায়ের একটি অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকে তিনি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর বহু মানুষের নাম বাদ পড়তে পারে। তাঁর কথায়, ‘জানি না ফাইনাল লিস্ট বেরলে কতজনের মানুষের নাম বাদ যাবে, কত মানুষ দুঃখ পাবেন।’ একইসঙ্গে গণতন্ত্র রক্ষার আবেদন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি চাই গণতন্ত্র থাকুক।’ উল্লেখ্য, এসআইআর প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর অবস্থান নতুন নয়। রাজনৈতিক সভা থেকে প্রশাসনিক অনুষ্ঠান, বিভিন্ন মঞ্চেই তিনি এই বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। এমনকি বিষয়টি নিয়ে তিনি দেশের শীর্ষ আদালত সুপ্রিম কোর্ট (Supreme Court of India) -এর দ্বারস্থও হয়েছিলেন। তাঁর দাবি, প্রাথমিক পর্যায়ে বিপুল সংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার সম্ভাবনা ছিল। ভবানীপুরের অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘আমি না ধরলে এক কোটি ২০ লাখ নাম বাদ যেত।’ তাঁর অভিযোগ, পরিকল্পিতভাবে বহু মানুষের নাম বাদ দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, সংশোধন প্রক্রিয়ার সময় ইতিমধ্যেই বহু মানুষের নাম বাদ পড়েছে। তিনি বলেন, ‘এসআইআর চলছে, অনেকের নাম বাদ গেছে। গান্ধিজীর অহিংসার কথা মনে রাখুন। সত্যের জয় হোক।’ তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে অহিংসা ও ন্যায়ের প্রসঙ্গ। তিনি দাবি করেন, বিষয়টি শুধু রাজনৈতিক নয়; এটি নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন। মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও কিছু ক্ষেত্রে তা যথাযথভাবে মানা হয়নি। তাঁর কথায়, ‘সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিলেও এরা চুপিচুপি কাজ করছে। এরা নাম বাদ দিতে চাইছে।’ তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক পরিচয় তাঁর কাছে মুখ্য নয়; গণতান্ত্রিক অধিকার সুরক্ষিত থাকাই প্রধান লক্ষ্য। ‘আমার দেখার দরকার নেই কে কোন রাজনৈতিক দলের। আমার দেখার গণতন্ত্র যেন রক্ষা পায়,’ মন্তব্য করেন তিনি। চলতি মাসের ২৮ তারিখ চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের কথা রয়েছে। সেই প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমি জানি না ২৮ তারিখ ভোটের তালিকা বেরনোর পরে যাঁদের নাম থাকবে না তাঁরা কী বলবেন।’ সম্ভাব্য বঞ্চনার আশঙ্কা থেকে তিনি মানস স্তম্ভের সামনে প্রার্থনা করেছেন বলেও জানান। তাঁর বক্তব্য, ‘জিও অউর জিনে দো। সত্যের জয় হোক। আমি আবার আসব মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হলে।’
এসআইআর প্রক্রিয়া সাধারণত ভোটার তালিকা হালনাগাদের অংশ হিসেবে পরিচালিত হয়। নির্বাচন কমিশন দাবি করে, এই প্রক্রিয়ার লক্ষ্য হল ভুয়ো বা অযোগ্য নাম বাদ দিয়ে তালিকাকে নির্ভুল করা। তবে বিরোধীদের একাংশের অভিযোগ, বাস্তবে বহু প্রকৃত ভোটারের নামও বাদ পড়ছে। পশ্চিমবঙ্গে এই ইস্যু রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠেছে, কারণ আসন্ন নির্বাচনের আগে ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তার প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে পারে। রাজনৈতিক মহলের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হলে তা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় আস্থার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই উদ্বেগই প্রতিফলিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমি চাই মানুষ যেন তাঁদের অধিকার থেকে বঞ্চিত না হন।’ তাঁর বক্তব্যে বারবার উঠে আসে নাগরিক অধিকার রক্ষার প্রসঙ্গ।
এদিকে নির্বাচন কমিশনের তরফে এখনও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া মেলেনি। কমিশন সূত্রে আগেও জানানো হয়েছে, সমস্ত সংশোধন আইনানুগ পদ্ধতি মেনেই করা হচ্ছে এবং যাঁদের নাম বাদ পড়েছে বলে দাবি, তাঁদের জন্য আপিলের সুযোগ রয়েছে। তবে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, তিনি প্রশাসনিক আশ্বাসে সন্তুষ্ট নন। রাজ্য রাজনীতিতে এসআইআর ইস্যু যে আগামী দিনে আরও জোরালো হবে, তার ইঙ্গিত মিলছে মুখ্যমন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যে। জৈন সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মঞ্চ থেকেও তিনি বিষয়টি উত্থাপন করায় বোঝা যাচ্ছে, এটি কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার অংশ নয়; বরং বৃহত্তর জনপরিসরে তুলে ধরতে চাইছেন তিনি। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে রাজ্যজুড়ে উত্তেজনা বাড়ছে। নাগরিক সমাজের একাংশ ইতিমধ্যেই ভোটারদের নিজেদের নাম যাচাই করার পরামর্শ দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে সেই সতর্কতার সুরও পরোক্ষে শোনা গেছে। তাঁর কথায়, ‘মানুষের অধিকার সুরক্ষিত হলে আমি আবার আসব।’ অর্থাৎ, বিষয়টির উপর নজরদারি অব্যাহত থাকবে বলেই ইঙ্গিত। উল্লেখ্য, ভোটার তালিকা সংশোধনকে কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা আগামী রাজনৈতিক পর্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের পর পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রাজ্যবাসী।
-ফাইল চিত্র।
আরও পড়ুন : SIR West Bengal Supreme Court Order, Voter List Revision Bengal 2026 | এসআইআর বিতর্কে ঐতিহাসিক হস্তক্ষেপ: তথ্যগত অসঙ্গতি খতিয়ে দেখবেন বিচারবিভাগীয় আধিকারিকেরা, নির্দেশ সুপ্রিম কোর্টের




