সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ তেহরান : মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান (Iran) আবারও অগ্নিগর্ভ। লাগাতার মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার চাপ এবং সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ সামগ্রিকভাবে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে তীব্র সরকার-বিরোধী আন্দোলন চলছে। রাজধানী তেহরান থেকে শুরু করে একাধিক প্রদেশে রাস্তায় নেমেছেন সাধারণ মানুষ। পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত যে বিক্ষোভকারীদের একাংশ সরাসরি ইরানের ধর্মীয় সুপ্রিম লিডার আয়াতোল্লাহ আলি খামেনেই (Ayatollah Ali Khamenei) -এর পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম সূত্রে খবর। এই অস্থিরতার মাঝেই আরও ভয় ধরাল ইরান সরকার। দেশটির অ্যাটর্নি জেনারেল মহম্মদ মোভাহেদি আজাদ (Mohammad Movahedi Azad) কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, যারা এই সরকার-বিরোধী আন্দোলনে অংশ নেবেন বা আন্দোলনকারীদের কোনওভাবে সমর্থন করবেন, তাঁদের ‘মোহরাব’ বা ‘ঈশ্বরের শত্রু’ হিসেবে গণ্য করা হবে। আর ইরানের আইনে এই অভিযোগের অর্থ কার্যত একটাই, মৃত্যুদণ্ড।
ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন-এ (State Television) সম্প্রচারিত একটি বিবৃতিতে সরকারের তরফে বার্তা দেওয়া হয়েছে, শুধু রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করলেই নয়, সামাজিক মাধ্যমে আন্দোলনের পক্ষে লেখা, আর্থিক সাহায্য বা অন্য কোনওভাবে সমর্থন জানালেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে একই অপরাধে অভিযুক্ত করা হতে পারে। সরকারের বক্তব্য, ‘দেশের নিরাপত্তা ও ইসলামি শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করার যে কোনও চেষ্টা রাষ্ট্রদ্রোহের শামিল’।ইরানের ইসলামিক পেনাল কোড (Islamic Penal Code of Iran) -এ ‘মোহরাব’ শব্দটির ব্যাখ্যা রয়েছে। আইনের ১৮৬ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও সংগঠন বা গোষ্ঠী সশস্ত্র বা সহিংস বিক্ষোভে জড়িত থাকে, তবে সেই সংগঠনের সদস্যদের পাশাপাশি যারা জেনে-বুঝে তাদের সাহায্য করেছে, তাদের সকলকেই ‘মোহরাব’ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে। এই আইন অনুযায়ী, অপরাধ প্রমাণিত হলে সমর্থনকারী ব্যক্তিও মূল অভিযুক্তের মতোই শাস্তির মুখে পড়তে পারেন।
সবচেয়ে বিতর্কিত ও ভয়ঙ্কর অংশটি রয়েছে ১৯০ ধারায়। সেখানে ‘মোহরাব’-এর শাস্তি হিসেবে চার ধরনের দণ্ডের কথা বলা হয়েছে: ফাঁসি, প্রকাশ্যে হত্যা, ডান হাত ও বাম পা কেটে নেওয়া অথবা আজীবনের জন্য নির্বাসন। মানবাধিকার সংগঠনগুলির দাবি, এই ধরনের শাস্তি আধুনিক মানবাধিকার নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী এবং ভয় দেখিয়ে জনতার কণ্ঠরোধ করারই এক কৌশল। উল্লেখ্য যে, সরকারি হিসেব অনুযায়ী, এই আন্দোলনে এখনও পর্যন্ত অন্তত ৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ২৩০০ -এরও বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছে। যদিও মানবাধিকার সংগঠনগুলির মতে, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। বহু বিক্ষোভকারীর খোঁজ মিলছে না বলেও অভিযোগ উঠেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বৃহস্পতিবার থেকে তেহরান-সহ একাধিক শহরে মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশবাসীর সঙ্গে বাইরের বিশ্বের যোগাযোগ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এই আন্দোলনের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক কারণ নয়, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষোভও কাজ করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এক বিক্ষোভকারীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, ‘আমরা শুধু দাম কমানোর দাবি করছি না, আমরা সম্মান ও স্বাধীনতা চাই’। যদিও সরকারের তরফে এই আন্দোলনকে বিদেশি শক্তির প্ররোচনা বলে দাবি করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক রাজনীতিও নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। আমেরিকার (United States) প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প (Donald Trump) সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, ‘ইরানের মানুষ স্বাধীনতা চাইছে। আমেরিকা তাদের পাশে আছে’। তাঁর এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে ইরান সরকার আরও ক্ষুব্ধ। তেহরানের দাবি, বিদেশি শক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে দেশের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে।
আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘মোহরাব’ আইনের প্রয়োগ আসলে একটি রাজনৈতিক বার্তা। সরকারের উদ্দেশ্য, ভয় দেখিয়ে আন্দোলনের গতি থামানো। তবে এর উল্টো প্রতিক্রিয়াও হতে পারে। অতীতে দেখা গিয়েছে, কঠোর দমন-পীড়ন অনেক সময় আন্দোলনকে আরও তীব্র করে তোলে। ইরানের বর্তমান পরিস্থিতিও সেই দিকেই এগোচ্ছে কি না, তা নিয়েই এখন জল্পনা।
মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (Amnesty International) এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch) ইতিমধ্যেই ইরানের এই আইনি হুমকির নিন্দা করেছে। তাদের দাবি, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ বা মতপ্রকাশ কোনওভাবেই ‘ঈশ্বরের শত্রুতা’ হতে পারে না। আন্তর্জাতিক মহল ইরানের উপর চাপ বাড়ালেও তেহরান এখনও নিজের অবস্থানে অনড়। প্রসঙ্গত, সরকার-বিরোধী আন্দোলনে শুধু অংশগ্রহণ নয়, সমর্থন করাও যেখানে মৃত্যুদণ্ডের ঝুঁকি তৈরি করছে, সেখানে ইরানের সাধারণ মানুষের ভবিষ্যৎ আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। ভয়, ক্ষোভ আর প্রতিবাদের এই টানাপোড়েন কোন দিকে মোড় নেয়, সেটাই এখন গোটা বিশ্বের নজরে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narges Mohammadi Iran Arrest | নোবেলজয়ীর কণ্ঠ রুখতেই কি ফের হাতকড়া? ইরানে গ্রেপ্তার মানবাধিকারকর্মী নার্গিস মোহাম্মদি, বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দা




