সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ পুণে : মহারাষ্ট্রের লোহাগড় দুর্গে (Lohagad Fort) ট্রেকিং করতে গিয়ে পুণের তরুণ ব্যবসায়ী কেতনবিশাল অগ্রবাল (Ketan Vishal Agrawal) -এর মৃত্যু প্রথমে দুর্ঘটনা বলেই মনে হয়েছিল। গভীর খাদে পড়ে যাওয়ার ঘটনায় শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল পরিবার ও পরিচিতরা। কিন্তু কয়েক দিনের মধ্যেই ঘটনার তদন্তে এমন সব তথ্য উঠে এসেছে, যা গোটা ঘটনাকেই সম্পূর্ণ অন্য দিকে ঘুরিয়ে দিয়েছে। পুলিশের দাবি, এটি নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং সুপরিকল্পিত খুনের ছক। আর সেই ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন কেতনের বাগ্দত্তা সিয়া গয়াল (Siya Goyal) এবং তাঁর প্রেমিক চেতন চৌধরী (Chetan Chaudhary)। পুণে গ্রামীণ পুলিশের তদন্তে জানা গিয়েছে, ট্রেকিংয়ের সময় প্রায় ৪০০ থেকে ৪৫০ ফুট গভীর খাদে ঠেলে ফেলে কেতনকে হত্যা করা হয়। ঘটনার পাঁচ দিনের মাথায় সিয়া ও চেতনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে খুন, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র এবং প্রমাণ লোপাটের অভিযোগে মামলা রুজু হয়েছে।

এই ঘটনার অন্যতম চাঞ্চল্যকর দিক হল, কেতনের সঙ্গে বাগ্দান থাকা সত্ত্বেও সিয়ার গোপন প্রেমের সম্পর্ক। তদন্তকারীরা জানাচ্ছেন, কেতনের সঙ্গে সম্পর্ক চলাকালীনই চেতনের সঙ্গে গভীর যোগাযোগ ছিল সিয়ার। একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে সিয়া ও চেতনের মধ্যে মোট ২,০০৪টি ফোনকল হয়েছিল। এই কথোপকথনের সময়কাল প্রায় ২৩৮ ঘণ্টা। এই দীর্ঘ যোগাযোগই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হয়ে উঠেছে। সিয়া পুণের বিবওয়েওয়াড়ি এলাকার বাসিন্দা। বয়স মাত্র ২০ বছর। তাঁর পরিবার শুকনো ফলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং আর্থিক দিক থেকে স্বচ্ছল। অন্য দিকে, কেতনও এক ধনী ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। তাঁর পরিবার রিয়্যাল এস্টেট ব্যবসায় যুক্ত। কেতন ‘সাকসেস গ্রুপ’ (Success Group) -এর ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতেন। বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে ২০২৩ সালে তিনি পুণেতে ফিরে পারিবারিক ব্যবসায় যোগ দেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে দুই পরিবারের সম্মতিতে কেতন ও সিয়ার বাগ্দান হয়। জানা গিয়েছে, নভেম্বরে তাঁদের বিয়ের পরিকল্পনা ছিল। এমনকী উদয়পুরে রাজপ্রাসাদ ভাড়া করে বিলাসবহুল আয়োজনের প্রস্তুতিও শুরু হয়েছিল। ব্যক্তিগত বিমান ব্যবহার করার কথাও আলোচনায় ছিল। কিন্তু এই সম্পর্কের ভিতরে অন্য গল্প চলছিল। কেতনের বাবা বিশাল অগ্রবাল (Vishal Agrawal) জানিয়েছেন, বাগ্দানের পর থেকেই সিয়ার আচরণ নিয়ে তাঁর ছেলে সন্দেহ প্রকাশ করছিলেন। তিনি বলেন, কেতন প্রায়ই জানতে চাইতেন, সিয়ার অতীত সম্পর্কে ঠিকমতো খোঁজ নেওয়া হয়েছে কি না। তবে পরিবার সেই সন্দেহকে গুরুত্ব দেয়নি।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, কেতন ও সিয়ার মধ্যে প্রায়ই ছোটখাটো বিষয় নিয়ে ঝগড়া হত। এমনকি চেতনকে কেন্দ্র করেও তাঁদের মধ্যে অশান্তি তৈরি হয়েছিল। কেতন মনে করতেন, সিয়া ও চেতনের মধ্যে সম্পর্ক রয়েছে। পুলিশের ধারণা, কেতনকে বিয়ে করতে চাইছিলেন না সিয়া। সেই কারণেই তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন তিনি ও তাঁর প্রেমিক। এই পরিকল্পনা একদিনে তৈরি হয়নি, দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা চলেছে। তদন্তে জানা গিয়েছে, এর আগেও অন্তত তিনবার কেতনকে খুনের চেষ্টা করা হয়েছিল। একবার লোহাগড় দুর্গেই তাঁকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়, কিন্তু ঝোপ আঁকড়ে ধরে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। অন্য দুইবারও পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হল, কেতন-সিয়ার বালিতে প্রি-ওয়েডিং ফোটোশুটের পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার ঘটনা। তদন্তকারীদের দাবি, কেতন তাঁর পাসপোর্ট হারাননি, বরং সিয়াই তা লুকিয়ে রেখেছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল বিদেশ সফর বাতিল করে তাঁকে লোহাগড়ে নিয়ে যাওয়া, যেখানে খুনের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সহজ হবে। ১৮ জুন সেই পরিকল্পনা কার্যকর হয়। সিয়া কেতনকে নিয়ে ট্রেকিংয়ে যান। অন্য দিকে, চেতনও গোপনে তাঁদের অনুসরণ করছিলেন। ক্যামেরায় যাতে ধরা না পড়েন, তার জন্য গরমের মধ্যেও হুডি পরে ছিলেন বলে জানা গিয়েছে। সুযোগ বুঝে তাঁরা কেতনকে খাদে ফেলে দেন এবং ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা বলে দেখানোর চেষ্টা করেন।
ঘটনার পর সিয়ার সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টও নতুন করে নজরে এসেছে। সেখানে কেতনকে নিয়ে নানা আবেগঘন মুহূর্তের ছবি ও লেখা রয়েছে, যা এখন তদন্তের প্রেক্ষিতে নতুন প্রশ্ন তুলছে। পুলিশ সূত্রে খবর, অভিযুক্তদের মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, লোকেশন ডেটা—সব কিছু খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এই ঘটনায় আরও কেউ জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। লোহাগড় দুর্গের এই ঘটনা শুধু একটি খুনের মামলা নয়, সম্পর্ক, বিশ্বাস এবং প্রতারণার জটিল দিকও সামনে এনেছে। পুণে শহরে এই ঘটনার প্রভাব ব্যাপক, এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Ketan Agarwal Death, Lohagad Fort Murder | লোহাগড় দুর্গে কেতন আগ্রবাল মৃত্যু: দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত খুনের অভিযোগ



