সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা: রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের দিন যত এগোচ্ছে, ততই রাজনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রে উঠে আসছে জনকল্যাণমূলক প্রকল্প। বিশেষ করে মহিলাদের আর্থিক সহায়তার প্রকল্প ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ (Lakshmir Bhandar) এখন শুধুই তৃণমূল কংগ্রেসের (Trinamool Congress) একক হাতিয়ার নয়, তা হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতির প্রধান অস্ত্র। রাজ্য বাজেটে লক্ষ্মীর ভান্ডারের টাকা আরও ৫০০ টাকা বাড়ানোর ঘোষণার এক দিনের মধ্যেই বিধানসভার অন্দরে নতুন চমক দিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী (Suvendu Adhikari)। তাঁর হাতে ধরা পোস্টারে স্পষ্ট বার্তা, বিজেপি (BJP) ক্ষমতায় এলে রাজ্যের মহিলারা মাসে ৩ হাজার টাকা করে পাবেন। এই পোস্টার ঘিরেই শুক্রবার বিধানসভায় রাজনৈতিক উত্তাপ ছড়ায়। তৃণমূলের তরফে যেখানে বাজেটে লক্ষ্মীর ভান্ডারের অঙ্ক বৃদ্ধিকে জনমুখী সিদ্ধান্ত বলে তুলে ধরা হচ্ছে, সেখানে শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, বর্তমান বাজেট আসলে ‘ভোট অন অ্যাকাউন্ট’ এবং এটি কার্যত একটি নির্বাচনী প্রচারপত্র ছাড়া কিছুই নয়। বিধানসভায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘ভোট অন অ্যাকাউন্টে এত বড় ঘোষণা বাস্তবায়িত হয় না। কোড অব কন্ডাক্ট (Code of Conduct) লাগু হলে এই সব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা সম্ভব নয়।’ তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে যাঁরা যে পরিমাণ সুবিধা পাচ্ছেন, তার বেশি কিছু তাঁরা পাবেন না।
রাজ্য সরকারের বাজেটে লক্ষ্মীর ভান্ডারের পাশাপাশি একাধিক সামাজিক প্রকল্পে অতিরিক্ত বরাদ্দের কথা বলা হয়েছে। মাধ্যমিক পাশ বেকার যুবক-যুবতীদের জন্য মাসিক ভাতা, আশা কর্মীদের (ASHA Workers) ভাতা বৃদ্ধি বাজেটকে জনমুখী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে শাসক শিবির। কিন্তু শুভেন্দু অধিকারীর অভিযোগ, এই সবই ভোটের আগে মানুষকে বিভ্রান্ত করার কৌশল। তাঁর কথায়, ‘এই বাজেট মে মাস পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এত অল্প সময়ের মধ্যে এই সব প্রকল্প বাস্তবায়ন কীভাবে সম্ভব? মানুষকে ভুল বোঝানো হচ্ছে।’ বাজেটে ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী মাধ্যমিক পাশ যুবক-যুবতীদের জন্য ‘বাংলার যুবসাথী’ (Banglar Yubasathi) প্রকল্পে মাসে ১৫০০ টাকা ভাতা দেওয়ার ঘোষণাও প্রশ্নের মুখে তুলেছেন বিরোধী দলনেতা। বিধানসভায় তিনি বলেন, ‘বেকার ভাতা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু আগেও তো এমন ঘোষণা হয়েছিল। দেড় লক্ষ আবেদন জমা পড়েছিল। কিছুদিন টাকা দেওয়া হয়েছিল। তার পর সেই প্রকল্প কোথায় গেল? চাকরি নেই, কর্মসংস্থান নেই। শুধু ভাতা দিয়ে সমস্যার সমাধান হয় না।’
একই সঙ্গে রাজ্যের আর্থিক অবস্থার দিকেও প্রশ্ন তুলেছেন শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ডিএ (DA) না দেওয়া এই সব বিষয় নিয়েও তিনি সরকারের ব্যাখ্যা দাবি করেন। তাঁর বক্তব্য, ‘কেন এত ঋণ? কেন রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা প্রাপ্য ডিএ পান না? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সরকারকে দিতে হবে।’ পাশাপাশি তিনি প্রাক্তন বিধায়কদের পেনশন বৃদ্ধির দাবিও তোলেন বিধানসভায়। তবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে লক্ষ্মীর ভান্ডারকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা। এক দিকে রাজ্য বাজেটে তৃণমূলের তরফে লক্ষ্মীর ভান্ডারের অঙ্ক বৃদ্ধি, অন্য দিকে বিজেপির তরফে মাসে ৩ হাজার টাকার প্রতিশ্রুতি, এই দুই ঘোষণাই স্পষ্ট করে দিচ্ছে, আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে মহিলা ভোটাররাই হতে চলেছেন সবচেয়ে বড় ‘গেমচেঞ্জার’। রাজনৈতিক মহলের মতে, লক্ষ্মীর ভান্ডার ইতিমধ্যেই রাজ্যের লক্ষ লক্ষ পরিবারের আর্থিক পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছে। ফলে এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে দল যত বড় প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে, ভোটের লড়াইয়ে তারা ততটাই এগিয়ে থাকবে।
বিধানসভায় শুভেন্দু অধিকারীর পোস্টার দেখেই তৃণমূলের শিবিরে কটাক্ষের সুর শোনা যায়। শাসক দলের মতে, ক্ষমতায় না থেকেও এমন প্রতিশ্রুতি দেওয়া ‘অবাস্তব’। তবে বিজেপির পাল্টা যুক্তি, কেন্দ্রীয় সরকার যেমন একাধিক সামাজিক প্রকল্প সফলভাবে চালাচ্ছে, তেমনই রাজ্যে ক্ষমতায় এলে মহিলাদের জন্য আরও বড় আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব। শুভেন্দু অধিকারীর মন্তব্য, ‘ছাব্বিশের নির্বাচনে সনাতন জিতবে’, রাজনৈতিক বার্তা হিসেবেই দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য যে, রাজ্যের বাজেট আর লক্ষ্মীর ভান্ডারকে ঘিরে রাজনৈতিক তরজা যে আগামী দিনে আরও তীব্র হবে, তা বলাই বাহুল্য। ভোটের আর একশো দিনেরও কম সময় বাকি। এই পরিস্থিতিতে লক্ষ্মীর ভান্ডার শুধু একটি সরকারি প্রকল্প নয়, তা হয়ে উঠেছে রাজ্য রাজনীতির সবচেয়ে শক্তিশালী নির্বাচনী ইস্যু।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Lok Sabha adjourned, Narendra Modi speech cancelled | বিরোধী হট্টগোলে ভেস্তে গেল মোদীর সংসদ ভাষণ, প্রশ্নের মুখে অধিবেশনের কার্যকারিতা




