সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লী : উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতার অন্দরমহলে কী শুরু হতে চলেছে নতুন কিছু? দেশটির সর্বাধিনায়ক কিম জং উন (Kim Jong Un) কী সত্যিই তাঁর ১৩ বছরের কন্যার হাতে ভবিষ্যতের শাসনভার তুলে দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন? দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থা ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস (National Intelligence Service বা NIS) সম্প্রতি এমনই ইঙ্গিত দিয়েছে। আর সেই জল্পনাকে কেন্দ্র করেই দুই কোরিয়া-সহ আন্তর্জাতিক মহলে তৈরি হয়েছে প্রবল কৌতূহল। বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, উত্তরাধিকার প্রশ্নে ‘ক্ল্যাশ অফ কিম্স’ শুরু হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। গত কয়েক বছর ধরে এক কিশোরীকে প্রায় নিয়মিতভাবে কিমের পাশে দেখা যাচ্ছে। সামরিক কুচকাওয়াজ, ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ, রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান সব জায়গাতেই তাঁর উপস্থিতি নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের। জানা গিয়েছে, ওই কিশোরী কিমের কন্যা কিম জু এ (Kim Ju Ae)। বয়স মাত্র ১৩। এনআইএস -এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, কিম তাঁর কন্যাকেই উত্তরসূরি হিসেবে তুলে ধরছেন এবং পরিকল্পিত ভাবেই জনসমক্ষে আনছেন।

২০২২ সালের নভেম্বরে উত্তর কোরিয়ার একটি আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার সময় প্রথম বার কিম জু এ-কে আন্তর্জাতিকভাবে নজরে আসে। সেই মুহূর্ত থেকে তাঁর প্রকাশ্য উপস্থিতি ধারাবাহিক ভাবে বেড়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ‘রাজনৈতিক উত্তরাধিকারীর ভাবমূর্তি গড়ে তুলতেই কন্যাকে সঙ্গে রাখছেন কিম।’ গত সেপ্টেম্বরে বেজিং সফরেও কিমের পাশে দেখা গিয়েছিল তাঁকে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, এ কী কেবল পারিবারিক উপস্থিতি, না ভবিষ্যতের শাসককে বিশ্বমঞ্চে পরিচিত করানোর কৌশল? তবে এই সম্ভাব্য উত্তরাধিকারের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন কিমেরই বোন কিম ইয়ো জং (Kim Yo Jong)। বয়স ৩৮। দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা মহল তাঁকে এই মুহূর্তে উত্তর কোরিয়ার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্ষমতাশালী ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করছে। শাসকদলের নীতিনির্ধারণ, সামরিক কৌশল এবং আন্তর্জাতিক বার্তা, সব ক্ষেত্রেই তাঁর সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। সেনাবাহিনীর অন্দরে তাঁর প্রভাব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফলে অনেকের ধারণা, এত সহজে ভাইঝির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে তিনি রাজি হবেন না।

উত্তর কোরিয়ার রাজনৈতিক কাঠামো অত্যন্ত রক্ষণশীল ও পুরুষতান্ত্রিক। কিম ইল সুং থেকে শুরু করে কিম জং ইল, তারপর কিম জং উন; এই তিন প্রজন্ম ধরে পুরুষ শাসকের ঐতিহ্য।
এই প্রেক্ষাপটে এক কিশোরী মেয়েকে ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা নিঃসন্দেহে বড় সিদ্ধান্ত। শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ার বিশ্লেষকেরা বিষয়টি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও, কিম জু এ-র ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি সেই সন্দেহ অনেকটাই দূর করেছে। চলতি মাসেই পিয়ংইয়ংয়ে দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক সম্মেলনের আয়োজন করেছেন কিম। বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘ক্ষমতার ভিত আরও শক্ত করতে এবং উত্তরাধিকার প্রসঙ্গে স্পষ্ট বার্তা দিতেই এই সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।’ এনআইএস-সহ আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলি এই সম্মেলনের দিকে কড়া নজর রাখছে। কিম তাঁর কন্যাকে সেখানে আনেন কি না, সেটিও তাৎপর্যপূর্ণ হবে।
অন্য দিকে, কিম ইয়ো জং-এর ভূমিকা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ২০২২ সালে তিনি দেশের প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব সামলান। একাধিক বার কূটনৈতিক বার্তায় তাঁর কঠোর অবস্থান আন্তর্জাতিক সংবাদ শিরোনামে এসেছে। এমনকী, কিছু ক্ষেত্রে দাদার নীতির প্রকাশ্য সমালোচনাও করেছেন বলে দাবি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের। ফলে পারিবারিক সমীকরণ কতটা সুদৃঢ়, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।

কিছু আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, চিনের প্রভাবও এখানে অস্বীকার করা যায় না। উত্তর কোরিয়ার প্রধান কৌশলগত মিত্র হিসেবে বেজিংয়ের ভূমিকা বরাবরই গুরুত্বপূর্ণ। কিম যদি কন্যাকে উত্তরসূরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চান, তবে আঞ্চলিক শক্তিগুলির সমর্থন তাঁর প্রয়োজন হতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনও সরকারি মন্তব্য পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, ‘ক্ল্যাশ অফ কিম্স’ শব্দবন্ধটি ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নিয়েছে। এক দিকে তরুণী কন্যা, অন্য দিকে অভিজ্ঞ ও প্রভাবশালী বোন এই দ্বন্দ্ব যদি প্রকট হয়, তবে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড়সড় টানাপোড়েন দেখা দিতে পারে। যদিও কিম পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস বলছে, ক্ষমতার প্রশ্নে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সর্বদাই শাসকের হাতেই থেকেছে।
উত্তর কোরিয়ার ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে এই জল্পনা শুধু পারিবারিক না তা আন্তর্জাতিক কূটনীতির ক্ষেত্রেও তাৎপর্যপূর্ণ। দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচী, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক, চিনের সঙ্গে কৌশলগত সমীকরণ, সব ক্ষেত্রেই নেতৃত্ব পরিবর্তনের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে কিম জু এ-র প্রতিটি প্রকাশ্য উপস্থিতি এখন বিশ্বরাজনীতির বিশ্লেষণের বিষয় হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত কিম জং উন কাকে উত্তরসূরি হিসেবে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেন, তা সময়ই বলবে। তবে এত কম বয়সে সম্ভাব্য উত্তরাধিকারীর উত্থান এবং পরিবারের অভ্যন্তরে ক্ষমতার ভারসাম্য, এই দুইয়ের সমীকরণই উত্তর কোরিয়ার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল এখন অপেক্ষায় যে পিয়ংইয়ংয়ের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হয়।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Fat Prison China, Weight Loss Jail | চিনে জনপ্রিয় হচ্ছে রোগা হওয়ার জেল, ৯০ হাজার টাকা খরচে বদলে যাচ্ছে জীবনযাপন




