শোভনা মাইতি ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ওজন কমানো এখন আর শুধু ব্যক্তিগত সৌন্দর্যের বিষয় নয়, তা হয়ে উঠেছে বিশ্বজুড়ে এক বড় স্বাস্থ্য-চ্যালেঞ্জ। স্থূলতা, ডায়াবিটিস, হৃদ্রোগ থেকে শুরু করে একাধিক জটিল অসুখের সঙ্গে ওজন বৃদ্ধির সরাসরি যোগ রয়েছে। সেই কারণেই প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ মানুষ ডায়েট, জিম, যোগাভ্যাস কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শে ওজন ঝরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু কঠোর অনুশাসন আর দীর্ঘস্থায়ী ধৈর্য না থাকলে সেই লক্ষ্যপূরণ সহজ নয়। এই পরিস্থিতিতেই বিশ্বজুড়ে চর্চায় উঠে এসেছে এক অভিনব ধারণা, ‘রোগা হওয়ার জেল’ বা ‘ফ্যাট প্রিজ়ন’ (Fat Prison)। আর এই ব্যতিক্রমী ওজন কমানোর বন্দীদশার ঠিকানা চিন (China)।
সম্প্রতি নেটমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে একজন অস্ট্রেলীয় নেটপ্রভাবীর (Australian Influencer) অভিজ্ঞতার ভিডিয়ো। সেখানে তিনি দাবি করেছেন, মোটা মাইনের চাকরি ছেড়ে তিনি চিনের এই ফ্যাট প্রিজ়নে ভর্তি হয়েছিলেন শুধুমাত্র নিজের জীবনযাত্রা বদলানোর জন্য। তাঁর কথায়, ‘অস্ট্রেলিয়ার একঘেয়ে জীবন ছেড়ে আমি চিনের ফ্যাট প্রিজ়নে ভর্তি হয়েছিলাম। নিজেকে নতুন করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম।’ এই বক্তব্য সামনে আসতেই কৌতূহল বেড়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে, সত্যিই কী জেলে ঢুকলেই ওজন কমে? চিনে চালু হওয়া এই ‘ফ্যাট প্রিজ়ন’ আসলে একটি কড়া নিয়মে পরিচালিত ওজন কমানোর ক্যাম্প। এখানে কোনও অপরাধের কারণে নয়, সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় মানুষ বন্দী হন নিজেদের শরীরকে শাসনে আনতে। বাইরে থেকে দেখলে এই ক্যাম্পের উঁচু কংক্রিটের দেওয়াল, প্রবেশে কড়া নিয়ন্ত্রণ, মোবাইল ফোন ও গ্যাজেট নিষিদ্ধ থাকা, সমস্ত কিছু নিয়ে এটি একটি জেলের মতোই। তবে লক্ষ্য একটাই, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ওজন কমানো। ওই ভাইরাল হওয়া ভিডিয়োতে ওই অস্ট্রেলীয় নেটপ্রভাবী জানিয়েছেন, ফ্যাট প্রিজ়নে তাঁর দিন শুরু হত সকাল সাড়ে সাতটায়। সকাল আটটার মধ্যেই সব অংশগ্রহণকারীকে লাইনে দাঁড় করিয়ে ওজন মাপা হত। প্রতিদিনের ওজনের হিসাব নথিভুক্ত করা হত, যাতে অগ্রগতি বা ব্যর্থতা কিছুই নজরের বাইরে না থাকে। সকাল ন’টা কুড়ি থেকে সাড়ে দশটা পর্যন্ত চলত অ্যারোবিক্স ক্লাস। সেখানে প্রশিক্ষকের নির্দেশ মেনে একটানা শরীরচর্চা বাধ্যতামূলক।
সকাল এগারোটার কিছু পরে মিলত দিনের প্রথম খাবার। তবে সেটি কোনও বিলাসবহুল ব্রেকফাস্ট নয়। প্লেটে থাকত চারটি সেদ্ধ ডিম, এক টুকরো রুটি, অর্ধেক টম্যাটো এবং অল্প পরিমাণ শসা। ক্যালোরি মেপে দেওয়া এই খাবার শেষ করতেই আবার শুরু হত শরীরচর্চা। জলখাবারের পর অংশগ্রহণকারীদের কার্ডিয়ো ব্যায়াম করানো হত দীর্ঘ সময় ধরে। দুপুরের দিকে শুরু হত আরও কঠিন পর্ব। দুপুর ২টা ৫০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টার মধ্যে চলত ভারী ওজন তোলার ব্যায়াম। প্রশিক্ষকেরা মিলিটারি কায়দায় নজর রাখতেন যাতে কেউ ফাঁকি না দেন। দুপুরের খাবারে থাকত ব্রেইজড হাঁসের মাংস, পদ্মের শিকড়, ভাজা সব্জি, কিছুটা গাজর এবং একটি কলা। খাবারের পর বিশ্রামের সুযোগ থাকলেও তা ছিল সীমিত। এর পরেই শুরু হত দুই ঘণ্টার হাই ইনটেনসিটি ট্রেনিং এবং স্পিনিং ক্লাস।
দিনের শেষ ভাগেও শিথিলতা নেই। রাতের খাবারে থাকত মূলত ফল এবং সব্জি। কোনও চিনি, তেল বা অতিরিক্ত কার্বোহাইড্রেটের স্থান নেই। রাতের শেষ ওজন পরীক্ষার পরেই অংশগ্রহণকারীদের বিছানায় যেতে দেওয়া হত। নির্দিষ্ট সময়ের আগে আলো নিভে যেত, যাতে পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা যায়। এই কঠোর রুটিনের ফল মিলেছে বলেই দাবি করেছেন ওই অস্ট্রেলীয় নেটপ্রভাবী। তাঁর কথায়, ‘ফ্যাট প্রিজ়নে বন্দি হয়ে আমি মাত্র এক মাসে প্রায় ৬ কেজি ওজন কমাতে পেরেছি।’ শুধু ওজন কমানো নয়, মানসিক দৃঢ়তাও বেড়েছে বলে তাঁর দাবি।
চিনে স্থূলতায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সেই কারণেই এই ধরনের ফ্যাট প্রিজ়ন ক্যাম্পের চাহিদাও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখানে মিলিটারি শৃঙ্খলা মেনে ওজন কমানো হয়। মোবাইল ফোন, সমাজমাধ্যম বা বাইরের জগতের সঙ্গে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকায় অংশগ্রহণকারীরা পুরোপুরি নিজেদের শরীরের দিকে মন দিতে পারেন। তবে এই ‘রোগা হওয়ার জেল’-এ ভর্তি হওয়া মোটেই সস্তা নয়। ২৮ দিনের জন্য এখানে থাকতে খরচ পড়ে প্রায় ১,০০০ মার্কিন ডলার, যা ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ৯০ হাজার টাকার কাছাকাছি। তবুও দ্রুত ওজন কমানোর আশায় বহু মানুষ এই ক্যাম্পে নাম লেখাচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ অবশ্য সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, এত কঠোর নিয়মে দ্রুত ওজন কমানো শরীরের জন্য সব সময় নিরাপদ নাও হতে পারে। তবে তাতে ‘ফ্যাট প্রিজ়ন’ -এর জনপ্রিয়তা আপাতত কমছে না। বরং ওজন কমানোর দুনিয়ায় এটি হয়ে উঠেছে নতুন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
ছবি : প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Indian economy fourth largest, Indian GDP 4.18 trillion | অর্থনীতির দৌড়ে বড় লাফ: জাপানকে টপকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি ভারত




