তনুজা বন্দ্যোপাধ্যায়, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বিশ্ব অর্থনীতির মানচিত্রে বড়সড় বদলের সাক্ষী থাকল ২০২৫ -এর শেষভাগ। অর্থনীতির দৌড়ে আরও একটি ধাপ এগিয়ে গিয়ে জাপানকে (Japan) টপকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতির আসনে বসেছে ভারত (India)। দীর্ঘদিন ধরে জাপানের সঙ্গে যুগ্মভাবে চতুর্থ স্থানে থাকলেও, সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী ভারতের মোট অর্থনীতির আকার পৌঁছেছে প্রায় ৪.১৮ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারে। এই সাফল্যের মাধ্যমে আমেরিকা (United States), চিন (China) ও জার্মানি (Germany) -এর পরেই এখন ভারতের স্থান।

অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই উত্থান গত এক দশকে ভারতের কাঠামোগত সংস্কার, অভ্যন্তরীণ বাজারের প্রসার এবং বৈশ্বিক বিনিয়োগ আকর্ষণের সম্মিলিত ফল। ভারতের অর্থনীতি ইতিমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির তকমা পেয়েছে। চলতি শতকের শেষের দিকেই ভারতের অর্থনীতি ৭.৩ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছুঁতে পারে, এমনই পূর্বাভাস দিয়েছে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক (Ministry of Finance)। কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন (Nirmala Sitharaman) একাধিক মঞ্চে আগেই ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, ভারতের অর্থনৈতিক ভিত এখন অনেক বেশি মজবুত। তাঁর কথায়, ‘ভারত শুধুমাত্র বৃদ্ধির হারেই নয়, স্থায়িত্ব ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের দিক থেকেও নিজেদের আলাদা করে তুলে ধরছে।’ সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সেই দাবিকেই কার্যত বাস্তব রূপ দিল।
বিশ্ব অর্থনীতির এই তালিকায় জাপানকে পিছনে ফেলার বিষয়টি তাৎপর্যপূর্ণ। দীর্ঘদিন ধরেই জাপান ছিল প্রযুক্তি, শিল্প ও রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতির এক শক্তিশালী উদাহরণ। তবে জনসংখ্যা হ্রাস, অভ্যন্তরীণ চাহিদার স্থবিরতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মন্দার প্রভাব জাপানের অর্থনীতিকে ধীরে ধীরে চাপে ফেলেছে। অন্যদিকে, ভারতের বিপুল জনসংখ্যা, ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং অভ্যন্তরীণ ভোগব্যয়ের শক্ত ভিত অর্থনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে দ্রুত গতিতে। নীতিনির্ধারক সংস্থা নীতি আয়োগ (NITI Aayog) -এর মতে, ভারতের সামনে লক্ষ্য আরও বড়। সংস্থার বক্তব্য অনুযায়ী, আগামী দুই থেকে তিন বছরের মধ্যেই জার্মানিকে টপকে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির আসনে পৌঁছনোর লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে ভারত। যদিও এই পথে চ্যালেঞ্জ কম নয়, তবু বর্তমান বৃদ্ধির হার ও নীতিগত স্থিতিশীলতা সেই লক্ষ্যে পৌঁছনোর বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি করেছে। অন্যদিকে, ভারতের এই সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, উৎপাদনমুখী নীতি ও ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’ (Make in India) উদ্যোগ দেশীয় শিল্পকে নতুন গতি দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, পরিকাঠামো উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ, হাইওয়ে, রেলপথ, বন্দর ও ডিজিটাল অবকাঠামো, অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল লেনদেন ও স্টার্টআপ সংস্কৃতির বিস্তার ভারতের অর্থনীতিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, ভারতের জিডিপি বৃদ্ধিতে পরিষেবা ক্ষেত্র এখনও বড় ভূমিকা পালন করলেও, উৎপাদন ও নির্মাণ ক্ষেত্রের অবদান ক্রমশ বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তি, ফিনটেক, ই-কমার্স এবং সবুজ শক্তির মতো খাতে ভারতের অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মহলেও নজর কাড়ছে। ফলে বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (FDI) ধারাবাহিকভাবে ভারতের দিকে ঝুঁকছে।
এই সাফল্যের পাশাপাশি কিছু সতর্কবার্তাও দিচ্ছেন অর্থনীতিবিদরা। তাঁদের মতে, উচ্চ বেকারত্ব, আয় বৈষম্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা না করতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে এই বৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন হতে পারে। পাশাপাশি বৈশ্বিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং জ্বালানি দামের ওঠানামাও ভারতের অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তথাপি, সামগ্রিক চিত্রে ভারতের অবস্থান শক্তিশালী। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক মঞ্চে ভারতের গুরুত্ব আগের তুলনায় বহুগুণ বেড়েছে। জি-২০ (G20) -এর মতো বৈশ্বিক মঞ্চে নেতৃত্ব দেওয়া, উন্নয়নশীল দেশগুলির স্বার্থে জোরালো ভূমিকা পালন এবং দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে উঠে আসা, সব মিলিয়ে ভারত এখন বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। অর্থনীতিবিদদের একাংশ মনে করছেন, ভারতের এই অগ্রগতি ভবিষ্যতে ভূ-রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও বড় প্রভাব ফেলবে। অর্থনৈতিক শক্তি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ভারতের ভূমিকা আরও দৃঢ় হবে। বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও জলবায়ু পরিবর্তনের মতো ইস্যুতে ভারতের কণ্ঠস্বর আরও জোরালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এক্ষেত্রে উল্লেখ যে, জাপানকে টপকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে ওঠা ভারতের জন্য ভবিষ্যতের আরও বড় স্বপ্নের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। এখন দেখার বিষয়, এই গতি ধরে রেখে ভারত কত দ্রুত বিশ্বের শীর্ষ তিন অর্থনীতির তালিকায় নিজের জায়গা করে নিতে পারে।
ছবি : সংগৃহীত ও প্রতীকী
আরও পড়ুন : Nirmala Sitharaman | অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামনের সঙ্গে সাক্ষাতে সিকিমের মন্ত্রী সোনম লামা, উন্নয়ন ও জলসম্পদে নতুন সহযোগিতার বার্তা



