সৌভিক দাস, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : বাঙালির রান্নাঘর মানেই মাছের গন্ধে ভরা এক আবেগ। সপ্তাহে কয় দিন নিরামিষ হলেও, দুপুরের ভাতের পাতে একটা মাছের পদ না থাকলে যেন মনটাই ভরে না। বিশেষ করে রুই আর কাতলা (Katla) এই দুই বড় মাছ বাঙালির রান্নায় চিরকালীন। কিন্তু একই ধরনের পাতলা ঝোল, জিরে বাটা, দই-কাতলা কিংবা সর্ষে-ঝাল বারবার খেতে খেতে অনেক সময় স্বাদে একঘেয়েমি এসে যায়। তখনই দরকার একটু ভিন্নতা, একটু রাজকীয় ছোঁয়া। সেই জায়গাতেই হাজির কাতলার ঘি-রোস্ট (Katla Ghee Roast)।
এই রেসিপিটি এমন এক পদ, যেখানে কাতলা মাছের স্বাভাবিক স্বাদ ঘি -এর সুগন্ধ আর ভাজা মশলার গভীরতায় একেবারে নতুন রূপ নেয়। দক্ষিণ ভারতের ‘গি রোস্ট’ -এর ভাবনা থেকে অনুপ্রাণিত হলেও, বাঙালি রান্নাঘরের উপকরণ আর স্বাদের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া হয়েছে একেবারে আলাদা ঢঙে। ফলে এটি যেমন আধুনিক, তেমনই পুরোপুরি বাঙালিয়ানার গন্ধে ভরা। কাতলা মাছ সাধারণত একটু মোটা, পেটি অংশে চর্বি বেশি থাকে। এই চর্বি আর ঘি একসঙ্গে মিশে গেলে যে স্বাদ তৈরি হয়, তা সত্যিই অতুলনীয়। তাই এই পদ বানানোর সময় পেটি অংশ ব্যবহার করলে সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। গরম ভাত, এক টুকরো লেবু আর কাঁচা পেঁয়াজের সঙ্গে এই কাতলার ঘি-রোস্ট পরিবেশন করলে ছুটির দুপুরটা হয়ে উঠবে একেবারে উৎসবের মতো।
এই রেসিপির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল ভাজা মশলা। জিরে (Cumin), ধনে (Coriander), গোলমরিচ (Black Pepper), মৌরি (Fennel), শুকনো লঙ্কা (Dry Red Chilli), দারচিনি (Cinnamon), এলাচ (Cardamom) আর লবঙ্গ (Cloves) এই সব ক’টি মশলা আলাদা করে শুকনো খুন্তিতে ভেজে বেটে নেওয়া হয়। এর ফলে মশলার কাঁচাভাব থাকে না, বরং বেরিয়ে আসে গভীর সুগন্ধ। এই ভাজা মশলাই কাতলার ঘি-রোস্টের প্রাণ। রান্নার শুরুতেই মাছ ভাল করে ধুয়ে নুন আর হলুদ (Turmeric) মাখিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দেওয়া জরুরি। এতে মাছের ভিতরের কাঁচা গন্ধ কেটে যায়। তার পর ঘি -এ মাছ ভাজা এখানেই এই পদের আলাদা পরিচয়। সাধারণত বাঙালি রান্নায় সর্ষের তেল বেশি ব্যবহার হলেও, এখানে ঘি ব্যবহার করায় স্বাদে আসে এক ধরনের মোলায়েম অথচ ভারী অনুভূতি। মাছ ভাজার সময় বেশি শক্ত করে নয়, শুধু হালকা লালচে হওয়া পর্যন্ত ভাজলেই যথেষ্ট।
এর পরের ধাপেই আসে পেঁয়াজ (Onion)। মাঝারি আঁচে ঘি-এ পেঁয়াজ ভাজতে হবে ধীরে ধীরে, যাতে তা হালকা বাদামি রং নেয়। বেশি পুড়িয়ে ফেললে স্বাদ তেতো হয়ে যেতে পারে। পেঁয়াজের সঙ্গে আদা-রসুন বাটা (Ginger-Garlic Paste) যোগ করলে রান্নাঘরে যে গন্ধ ছড়ায়, তা থেকেই বোঝা যায় পদটা জমতে চলেছে। এই পর্যায়ে আগে থেকে বানিয়ে রাখা ভাজা মশলা যোগ করে ভাল করে কষানো খুব গুরুত্বপূর্ণ। এবার আসে দই (Curd)। দই অবশ্যই ফেটানো হতে হবে এবং গ্যাসের আঁচ একেবারে কম রাখতে হবে। নইলে দই কেটে গিয়ে মশলার গঠন নষ্ট হয়ে যেতে পারে। ধীরে ধীরে দই মশলার সঙ্গে মিশে গেলে তৈরি হয় ঘন, মসৃণ একটা গ্রেভি। নুন (Salt) আর সামান্য চিনি (Sugar) দিয়ে স্বাদ ঠিক করে নিতে হবে। চিনি বেশি নয়, শুধু ঝাল আর ঘি-এর ভারসাম্য আনতেই এর ব্যবহার।
এরপর ভাজা মাছগুলি মশলার মধ্যে আলত করে মিশিয়ে ঢেকে রাখতে হবে কয়েক মিনিট। এই সময় মাছ মশলার স্বাদ নিজের মধ্যে টেনে নেয়। রান্নার শেষ ধাপে উপর থেকে একটু কাঁচা ঘি ছড়িয়ে দিলে সুগন্ধ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এই ঘিয়ের সুবাসই কাতলার ঘি-রোস্টকে সাধারণ মাছের পদ থেকে আলাদা করে তোলে। উল্লেখ্য যে, এই পদটি শুধু স্বাদেই নয়, পরিবেশনেও একটু আলাদা। সাদা গরম ভাতের সঙ্গে যেমন মানায়, তেমনই বাসমতী চালের ভাত বা জিরে ভাতের সঙ্গেও দারুণ লাগে। চাইলে পাশে রাখতে পারেন কাঁচা পেঁয়াজ, লেবুর টুকরো আর কাঁচা লঙ্কা। ঝোল নয়, আবার শুকনোও নয়, এই মাঝামাঝি ঘন মশলাদার কাতলার ঘি-রোস্ট একবার খেলে বারবার বানাতে ইচ্ছে করবে। দেখুন, যদি প্রতিদিনের মাছের ঝোল থেকে একটু বিরতি নিয়ে নতুন কিছু করতে চান, তবে এই কাতলার ঘি-রোস্ট নিঃসন্দেহে আপনার রান্নাঘরের নতুন তারকা হয়ে উঠবে।
ছবি : প্রতীকী
আরও পড়ুন : Molmol Chicken Recipe | ছুটির দিনের রান্নায় হালকা অথচ স্বাদের জাদু, ঘরোয়া কায়দায় বানান নরম-সুস্বাদু মলমল চিকেন




