মেধা পাল, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দুর্গাপুজো মানেই আলোর ঝলকানি, মণ্ডপসজ্জার অভিনবত্ব আর প্রতিমা দর্শনের জন্য মানুষের ঢল। কিন্তু যাঁরা চোখে দেখতে পান না, তাঁদের কাছে এই উৎসবের আনন্দ অনুভব করার সুযোগ অনেক সময়ই সীমিত হয়ে থাকে। সেই অভিজ্ঞতা বদলে দিতে এ বার অভিনব উদ্যোগ দক্ষিণ কলকাতার যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লির (Jodhpur Park 95 Pally) দুর্গাপুজোয়। মণ্ডপের শিল্পকর্ম শুধু চোখ দিয়ে দেখার জন্য নয়, হাতের স্পর্শে অনুভব করারও ব্যবস্থা থাকছে এখানে। দৃষ্টিহীন দর্শনার্থীদের জন্য রাখা হচ্ছে পৃথক প্রবেশপথ। পুজো উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনায় তাঁরাই এ বারের বিশেষ অতিথি, অর্থাৎ ‘ভিআইপি’। ৭৭ বছরে পা রাখা এই পুজোর থিম ‘তমসালোক’। অন্ধকার থেকে আলোর দিকে এগিয়ে যাওয়ার ভাবনাকে কেন্দ্র করে তৈরি হচ্ছে এবারের মণ্ডপ।
দুর্গাপুজোয় থিমের বৈচিত্র্য নতুন নয়। কখনও গ্রামবাংলার ঐতিহ্য, কখনও ইতিহাস, কখনও আবার সমকালীন সামাজিক সমস্যা উঠে আসে মণ্ডপসজ্জায়। তবে যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লির এবারের আয়োজনের মূল আকর্ষণ শুধু নান্দনিকতা নয়, উৎসবের অভিজ্ঞতায় দৃষ্টিহীন মানুষকে সামিল করার প্রয়াসও। যাঁরা চোখে দেখে মণ্ডপের কারুকাজ উপভোগ করতে পারেন না, তাঁরাও যাতে হাতের স্পর্শে শিল্পের গঠন, নকশা এবং বিন্যাস বুঝতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ফলে দুর্গাপুজোর আনন্দকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ হিসেবেও এই পরিকল্পনা তাৎপর্যপূর্ণ। অন্যদিকে, ‘তমসালোক’ নামের মধ্যেই রয়েছে অন্ধকার ও আলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ভাবনা। মণ্ডপের প্রবেশপথে আলোর বাহুল্য না রেখে ভিতরের সাজে আলোর উপস্থিতিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দর্শনার্থীরা মণ্ডপে প্রবেশ করার আগে হয়তো চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা দেখতে পাবেন না। কিন্তু ভিতরে অপেক্ষা করছে আলোর নানা ব্যবহার ও শিল্পকর্মের অভিনব বিন্যাস। এই পরিকল্পনায় আলো কেবল সাজসজ্জার উপকরণ নয়, থিমের বক্তব্য প্রকাশেরও একটি মাধ্যম।
এবারের পুজোয় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, দৃষ্টিহীন দর্শনার্থীদের কথা মাথায় রেখে মণ্ডপের ভিতরের কারুকাজ এমন ভাবে সাজানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, যাতে তাঁরা তা স্পর্শ করে অনুভব করতে পারেন। সাধারণত ভিড়ের মধ্যে মণ্ডপের শিল্পকর্ম ছোঁয়ার সুযোগ থাকে না। অনেক জায়গায় দর্শনার্থীদের দূর থেকেই প্রতিমা ও মণ্ডপসজ্জা দেখতে হয়। সেই পরিচিত অভিজ্ঞতার বাইরে গিয়ে যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লি দৃষ্টিহীনদের জন্য অন্য রকম দর্শনের সুযোগ তৈরি করছে। আলোর উৎসবকে অনুভবের উৎসবে পরিণত করার এই উদ্যোগই এ বারের আয়োজনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য।
পুজো উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, সৌন্দর্য উপভোগ করার অভিজ্ঞতা প্রত্যেকের কাছে এক রকম নয়। যাঁরা চোখে দেখতে পান না, তাঁরাও স্পর্শ ও অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের সাহায্যে শিল্পের সৌন্দর্য অনুভব করতে পারেন। সেই অনুভবের জায়গাটিকে গুরুত্ব দিয়েই এ বারের পরিকল্পনা সাজানো হয়েছে। পুজোর অন্যতম কর্তা রতন দে (Ratan Dey) জানিয়েছেন, এ বছরের আয়োজনের বিশেষ গুরুত্ব তাঁদের জন্য, যাঁরা চোখে দেখতে পান না, অথচ অনুভূতির মাধ্যমে সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করেন। তাঁর কথায়, ‘আমাদের এ বছরের পুজোর চমক তাঁদের জন্যই, যাঁরা চোখে দেখতে পারেন না। সুন্দর জিনিস অনুভব করে বেঁচে থাকেন।’
এই উদ্যোগে দৃষ্টিহীন দর্শনার্থীদের জন্য পৃথক প্রবেশপথ রাখার পরিকল্পনাও গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবের সময়ে বড় পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় সামলানো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তার মধ্যে যাঁদের চলাফেরায় অতিরিক্ত সহায়তার প্রয়োজন, তাঁদের জন্য নিরাপদ ও সুবিধাজনক প্রবেশের ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পৃথক পথের পরিকল্পনা সেই প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই করা হয়েছে। তবে বাস্তবে দর্শনার্থীদের সুবিধা কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা নির্ভর করবে মণ্ডপে প্রবেশের ব্যবস্থা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং উদ্যোক্তাদের সহায়তার উপর।
দুর্গাপুজোকে কেন্দ্র করে কলকাতায় প্রতি বছর নানা ধরনের শিল্পভাবনা ও সামাজিক উদ্যোগ সামনে আসে। যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লির ‘তমসালোক’ সেই ধারায় অন্য একটি মাত্রা যোগ করছে। এখানে মণ্ডপের শিল্পকর্মের সঙ্গে দর্শনার্থীর সম্পর্ক কেবল দূর থেকে দেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে না। স্পর্শের মাধ্যমে শিল্পকে উপলব্ধি করার সুযোগ তৈরি করে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে মণ্ডপ দর্শনের অভিজ্ঞতা নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ তৈরি হচ্ছে। এই ধরনের আয়োজনের ক্ষেত্রে দৃষ্টিহীন দর্শনার্থীদের প্রয়োজনকে মর্যাদা দেওয়া বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের জন্য শুধু প্রবেশের সুযোগ থাকলেই যথেষ্ট নয়, মণ্ডপের ভিতরে চলাচল, শিল্পকর্ম স্পর্শ করার নিরাপদ ব্যবস্থা ও প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তাও জরুরি। উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা সেই অভিজ্ঞতাকে কতটা স্বচ্ছন্দ করে তুলতে পারে, তা পুজোর দিনগুলিতে বোঝা যাবে। তবু মণ্ডপের নকশা ও দর্শনপদ্ধতিতে দৃষ্টিহীন মানুষকে গুরুত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত কলকাতার পুজো সংস্কৃতিতে একটি উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ।
আরও পড়ুন : Durga Puja : মহালয়া থেকে নবদুর্গার তাত্ত্বিক রূপ এবং মহাআরাধনার বিধান
যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লির এ বছরের থিম পরিকল্পনা ও রূপায়ণের দায়িত্বে রয়েছেন শিল্পী পরিমল পাল (Parimal Pal)। তাঁর ভাবনায় ‘তমসালোক’ অন্ধকার পেরিয়ে আলোর দিকে যাত্রার ধারণাকে সামনে আনছে। তবে এই আলোর অভিজ্ঞতা শুধু চোখে দেখার মধ্যে আটকে থাকছে না। মণ্ডপের ভিতরের কারুকাজ স্পর্শ করে অনুভব করার সুযোগের মাধ্যমে দৃষ্টিহীন দর্শনার্থীদেরও সেই শিল্পযাত্রার অংশ করে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। ৭৭ বছরের ঐতিহ্য নিয়ে যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লির দুর্গাপুজো এ বার এমন একটি ভাবনা সামনে এনেছে, যেখানে উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। পুজোর আলো, শিল্প ও মণ্ডপসজ্জার অভিজ্ঞতা যেন কোনও একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে, সেই লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। দৃষ্টিহীন দর্শনার্থীদের ‘ভিআইপি’ মর্যাদা দেওয়ার ভাবনা তাই শুধু প্রচারের আকর্ষণ নয়, উৎসবে তাঁদের অভিজ্ঞতাকে সামনে নিয়ে আসার একটি প্রয়াস।
কলকাতার দুর্গাপুজো বরাবরই নতুন ভাবনা, শিল্পের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং সামাজিক বার্তা তুলে ধরার মঞ্চ। যোধপুর পার্ক ৯৫ পল্লির ‘তমসালোক’ সেই পরিচিত ধারার সঙ্গে যুক্ত করছে স্পর্শনির্ভর মণ্ডপ দর্শনের ভাবনা। চোখে দেখা সম্ভব না হলেও শিল্পকে অনুভব করা যায়, এই উপলব্ধিকে সামনে রেখেই এ বারের আয়োজনের পরিকল্পনা। পুজোর দিনগুলিতে এই মণ্ডপ কতটা সহজে দৃষ্টিহীন দর্শনার্থীদের শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করতে পারে, সে দিকেই থাকবে নজর। আলোর উৎসবে তাঁদের জন্য আলাদা জায়গা তৈরি করার এই উদ্যোগ দুর্গাপুজোর আনন্দকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলার প্রচেষ্টা হিসেবে নজর কাড়ছে।



