সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা ও নতুন দিল্লি : দুর্গাপুজোর (Durga Puja 2026) অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন মহাসপ্তমী (Maha Saptami) শারদোৎসবের এই বিশেষ তিথিতে নবপত্রিকা স্নান, কলাবউ প্রতিষ্ঠা এবং দেবী দুর্গার আরাধনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পুজোর অন্যতম প্রধান পর্ব। ২০২৬ সালে ১৭ অক্টোবর, শনিবার পালিত হচ্ছে মহাসপ্তমী। ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে নবপত্রিকা স্নানের প্রস্তুতি, পুজোমণ্ডপে পুরোহিতদের মন্ত্রোচ্চারণ এবং দেবীর আরাধনায় মুখর হয়ে ওঠে দুর্গাপুজোর আবহ। বাংলার দুর্গোৎসবে নবপত্রিকা পুজোর বিশেষ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব রয়েছে। অন্য দিকে, একই দিনে শারদ নবরাত্রির সপ্তমী তিথিতে আরাধনা করা হয় দেবী কালরাত্রির। ফলে ১৭ অক্টোবরের ধর্মীয় তাৎপর্য একাধিক দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ।

মহাসপ্তমী ২০২৬-এর তারিখ ও তিথির সময়
২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর, শনিবার মহাসপ্তমী পালিত হচ্ছে। পঞ্জিকা অনুযায়ী, ১৭ অক্টোবর ভোর ৫টা ৫৪ মিনিটে সপ্তমী তিথি শুরু হবে এবং ১৮ অক্টোবর সকাল ৮টা ২৭ মিনিটে তা শেষ হবে। নবপত্রিকা স্নান সাধারণত ভোরবেলায় সম্পন্ন করা হয়। তবে স্নানের নির্দিষ্ট সময় নির্ভর করে স্থানীয় পঞ্জিকা, সূর্যোদয়ের সময় এবং পুজো কমিটি বা পরিবারের প্রচলিত রীতির উপর। নবপত্রিকা স্নান বা সপ্তমীর পুজোয় অংশ নেওয়ার আগে স্থানীয় পঞ্জিকা কিংবা সংশ্লিষ্ট পুজো কমিটির সময়সূচী দেখে নেওয়া প্রয়োজন।

মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলার দুর্গাপুজোয় মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান আচার হল নবপত্রিকা স্নান। নবপত্রিকা বলতে নয়টি নির্দিষ্ট উদ্ভিদকে একত্রে বেঁধে দেবীর প্রতীক হিসেবে পুজো করার রীতিকে বোঝায়। এই নবপত্রিকাকে প্রচলিত ভাষায় কলাবউ বলা হয়। কলাগাছকে কেন্দ্র করে বাকি আটটি উদ্ভিদ একত্রে বাঁধা হয় বলে এই নামের প্রচলন হয়েছে। প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, মহাসপ্তমীর ভোরে নবপত্রিকাকে নদী বা নির্দিষ্ট জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে স্নান করানো হয়। স্নানের পর গাছগুলিকে লাল অথবা কমলা রঙের শাড়ি পরিয়ে পুজোমণ্ডপে নিয়ে আসা হয়। সেখানে নির্দিষ্ট স্থানে নবপত্রিকা প্রতিষ্ঠা করে পুরোহিত মন্ত্রোচ্চারণের মাধ্যমে পুজো সম্পন্ন করেন। সাধারণত দেবী দুর্গার প্রতিমার ডান দিকে নবপত্রিকা স্থাপন করা হয়, যদিও স্থানীয় রীতি অনুসারে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে।
নবপত্রিকা পুজোর মধ্যে প্রকৃতি, কৃষি, উর্বরতা ও সমৃদ্ধির ধারণা জড়িয়ে রয়েছে। উদ্ভিদকে দেবীর বিভিন্ন শক্তির প্রতীক হিসেবে আরাধনা করার মাধ্যমে প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করা হয়। বাংলার কৃষিনির্ভর সমাজে ফসল, শস্য এবং উদ্ভিদসম্পদের গুরুত্ব বহু পুরনো। নবপত্রিকা পুজোর রীতিতে সেই সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিফলন দেখা যায়।
নবপত্রিকার নয়টি উদ্ভিদ ও তাদের ধর্মীয় তাৎপর্য
নবপত্রিকা গঠিত হয় নয়টি নির্দিষ্ট উদ্ভিদ দিয়ে। প্রচলিত ধর্মীয় ব্যাখ্যায় প্রতিটি উদ্ভিদ দেবীর একটি বিশেষ রূপ বা শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত। কলা গাছকে দেবী ব্রহ্মাণীর প্রতীক হিসেবে মানা হয়। কচু গাছের সঙ্গে দেবী কালিকার সম্পর্ক রয়েছে। হলুদ গাছ দেবী দুর্গার প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়। জয়ন্তী গাছকে দেবী কার্তিকীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। বেলগাছের সম্পর্ক ভগবান শিবের সঙ্গে। ডালিম গাছ দেবী রক্তদন্তিকার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। অশোক গাছ দেবী শোকরহিতার সঙ্গে সম্পর্কিত। মানকচু বা সংশ্লিষ্ট প্রচলিত আরামজাতীয় উদ্ভিদ দেবী চামুণ্ডার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ধানগাছকে দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে যুক্ত করা হয়। উদ্ভিদগুলিকে একত্রে বেঁধে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়। এই নয়টি উদ্ভিদকে ঘিরে গড়ে ওঠা পুজোর রীতি দেবীর বিভিন্ন শক্তির সম্মিলিত আরাধনার ধারণা বহন করে। একই সঙ্গে শস্য, খাদ্য, কৃষি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের সঙ্গে মানুষের জীবনের নিবিড় সম্পর্কও এই আচারের মাধ্যমে উঠে আসে।
নবপত্রিকা স্নান ও পুজোর প্রচলিত বিধি
মহাসপ্তমীর সকালে প্রথমে নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে নয়টি উদ্ভিদ সংগ্রহ করে একত্রে বাঁধা হয়। পরিবারের প্রথা অথবা পুজো কমিটির নির্ধারিত রীতি অনুযায়ী নবপত্রিকা প্রস্তুত করা হয়। এরপর ভোরে তা নদী বা নির্দিষ্ট জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে স্নান করানো হয়। এই আচার নবপত্রিকার শুদ্ধিকরণ ও পুজোর জন্য প্রস্তুতির প্রতীক। স্নানপর্ব শেষ হলে নবপত্রিকাকে শাড়ি পরিয়ে সাজানো হয়। কলাগাছটি সামনে থাকায় পুরো বিন্যাসে কলাবউয়ের পরিচিত রূপ ফুটে ওঠে। এরপর নবপত্রিকাকে পুজোমণ্ডপে ফিরিয়ে এনে নির্দিষ্ট স্থানে প্রতিষ্ঠা করা হয়। পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, দেবীর আহ্বান ও বিধি মেনে পুজোর মাধ্যমে আচার সম্পন্ন হয়। মহাসপ্তমীতে দেবী দুর্গার পুজোর পাশাপাশি পুষ্পাঞ্জলি, ভোগ নিবেদন, আরতি ও অন্যান্য ধর্মীয় অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়। পুজোমণ্ডপে দর্শনার্থীরা দেবীর দর্শন করেন ও নিজেদের বিশ্বাস অনুযায়ী প্রার্থনায় অংশ নেন। তবে সব পুজোমণ্ডপে আচারের ক্রম ও সময় এক রকম হয় না। স্থানীয় রীতি, পারিবারিক প্রথা ও পুজো কমিটির সিদ্ধান্ত অনুসারে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
নবরাত্রির সপ্তমীতে দেবী কালরাত্রির আরাধনা
১৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখটি শারদ নবরাত্রির সপ্তমী হিসেবেও পালিত হচ্ছে। নবরাত্রির সপ্তম দিনে নবদুর্গার সপ্তম রূপ দেবী কালরাত্রির পুজো করা হয়। বাংলার মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা পুজোর পাশাপাশি নবরাত্রির এই আরাধনার বিষয়টিও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, দেবী কালরাত্রির গায়ের রং গাঢ়, কেশ উন্মুক্ত ও তাঁর চারটি হাত। তাঁর বাহন গর্দভ। দেবীর এই রূপ অশুভ শক্তির বিনাশ, ভয় দূর করা এবং ভক্তদের সুরক্ষার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। ভয়ংকর রূপে কল্পিত হলেও কালরাত্রিকে ভক্তদের রক্ষাকারী মাতৃশক্তি হিসেবেই আরাধনা করা হয়।

কালরাত্রি পুজোয় ভক্তরা সকালে স্নান করে পুজোর স্থান পরিষ্কার করেন। এরপর দেবীর ছবি বা প্রতিমা প্রতিষ্ঠা করে প্রদীপ জ্বালানো হয়। ফুল, ধূপ এবং প্রচলিত পুজোর উপকরণ নিবেদন করা হয়। পারিবারিক প্রথা অনুযায়ী গুড় অথবা গুড় দিয়ে তৈরি প্রসাদও নিবেদন করা যেতে পারে। পুজোর শেষে দেবীর মন্ত্রপাঠ, আরতি এবং প্রসাদ বিতরণের রীতি রয়েছে। দেবী কালরাত্রির প্রচলিত মন্ত্র হল, ‘ওঁ দেবী কালরাত্র্যৈ নমঃ’। ভক্তরা দেবীর আরাধনার সময় এই মন্ত্র জপ করে সাহস, সুরক্ষা এবং ভয় থেকে মুক্তির প্রার্থনা করেন।
এখানে মনে রাখা প্রয়োজন, নবপত্রিকা পুজো এবং দেবী কালরাত্রির পুজো দুটি পৃথক ধর্মীয় প্রথার অন্তর্গত। নবপত্রিকা পুজো বাংলার দুর্গোৎসবের মহাসপ্তমীর অন্যতম প্রধান আচার। অন্য দিকে, কালরাত্রির আরাধনা শারদ নবরাত্রির নবদুর্গা পুজোর অংশ। ২০২৬ সালের ১৭ অক্টোবর একই দিনে এই দুই ধর্মীয় পালন পড়ায় দিনটির গুরুত্ব আরও বেড়েছে।

দুর্গাপুজোর মহাসপ্তমীর ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক গুরুত্ব
মহাসপ্তমীকে বাংলার দুর্গাপুজোর প্রধান দিনগুলির সূচনাপর্ব হিসেবে দেখা হয়। ষষ্ঠীর বোধন ও অধিবাসের পর সপ্তমীতে নবপত্রিকা প্রতিষ্ঠা ও দেবী দুর্গার পুজোর মধ্য দিয়ে উৎসবের ধর্মীয় আচার আরও বিস্তৃত হয়। পুজোমণ্ডপে ভক্তদের উপস্থিতি, মন্ত্রোচ্চারণ, ভোগ নিবেদন এবং আরতির মাধ্যমে দিনটি বিশেষ মর্যাদা পায়। নবপত্রিকা পুজোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল প্রকৃতিকে দেবীশক্তির সঙ্গে যুক্ত করে দেখা। নয়টি উদ্ভিদের আরাধনার মধ্যে কৃষি, খাদ্য, উর্বরতা ও জীবনের ধারাবাহিকতার প্রতীকী অর্থ রয়েছে। ভক্তদের বিশ্বাস, দেবীর আশীর্বাদে পরিবারে সুখ, শান্তি, সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য বজায় থাকে। একই সঙ্গে অশুভ শক্তির বিনাশ এবং জীবনের বাধা অতিক্রম করার প্রার্থনাও মহাসপ্তমীর পুজোর সঙ্গে যুক্ত।
দুর্গাপুজো ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে এই উৎসবের বিশেষ স্থান রয়েছে। পুজোমণ্ডপ, প্রতিমা, আলোকসজ্জা, ঢাকের শব্দ, ভোগ ও পারিবারিক মিলন উৎসবের আবহ তৈরি করে। মহাসপ্তমীর নবপত্রিকা স্নান সেই দীর্ঘ ঐতিহ্যের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বাংলার পুজো সংস্কৃতিতে জায়গা করে নিয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৬ সালের মহাসপ্তমীতে নবপত্রিকা স্নান, কলাবউ পুজো ও দেবী দুর্গার আরাধনার পাশাপাশি নবরাত্রির সপ্তমীতে কালরাত্রি পুজোও পালিত হচ্ছে। তবে স্নান ও পুজোর নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার পঞ্জিকা অনুসরণ করাই প্রয়োজন। ভক্তরা নিজেদের পারিবারিক প্রথা ও স্থানীয় পুজো কমিটির নির্দেশ অনুযায়ী আচার পালন করতে পারেন।



