প্রিয়াঙ্কা চতুর্বেদী, সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দুর্গাপুজো (Durga Puja) মানেই নতুন পোশাক, পছন্দের গয়না, মানানসই চুলের সাজ আর আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার আনন্দ। সপ্তমীর রাত হোক কিংবা অষ্টমীর সকাল, পুজোর সাজে একটু বাড়তি যত্ন নিতেই ভালবাসেন অনেকে। শাড়ির সঙ্গে মানানসই টিপ, কানের দুলের সঙ্গে মিলিয়ে গয়না এসব কিছুর পরিকল্পনা থাকলেও চোখের মেকআপের দিকে অনেক সময় আলাদা করে নজর দেওয়া হয় না। অথচ চোখের সাজই বদলে দিতে পারে গোটা চেহারার অভিব্যক্তি। সাধারণ কাজলের টান থেকে গাঢ় স্মোকি আই, আবার কখনও নীল-সবুজ রঙের আইলাইনার সঠিক কৌশলে চোখ সাজালে উৎসবের সাজ হয়ে উঠতে পারে আরও আকর্ষণীয়। এবারের পুজোয় চোখের মেকআপে একঘেয়েমি কাটিয়ে নতুন কিছু চেষ্টা করতে পারেন। যাঁরা সাবেকি সাজ পছন্দ করেন, তাঁদের জন্য রয়েছে কাজল ও হালকা খয়েরি আইশ্যাডোর যুগলবন্দী। আবার যাঁরা সাজে আধুনিকতার ছোঁয়া রাখতে চান, তাঁরা বেছে নিতে পারেন রঙিন লাইনার কিংবা মেটালিক স্মোকি আই। পোশাকের রং, চোখের স্বাভাবিক গড়ন, অনুষ্ঠানের সময় ও নিজের স্বাচ্ছন্দ্য বুঝে মেকআপ বেছে নিলেই সাজে আসবে আলাদা মাত্রা। তবে চোখ সাজানোর আগে কয়েকটি সহজ নিয়ম মনে রাখা জরুরি।

চোখের মেকআপ শুরু করার আগে ত্বক পরিষ্কার করে নিন। চোখের পাতায় তেলতেলে ভাব থাকলে আইশ্যাডো সহজেই জমাট বাঁধতে পারে কিংবা কিছু ক্ষণের মধ্যে রং ফিকে হয়ে যেতে পারে। তাই চোখের চারপাশ পরিষ্কার করে প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করুন। তার পর চোখের পাতায় অল্প পরিমাণ আই প্রাইমার লাগিয়ে নিন। প্রাইমার না থাকলে চোখের পাতায় উপযুক্ত বেস মেকআপ ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে অতিরিক্ত প্রসাধনী লাগানোর প্রয়োজন নেই। চোখের পাতায় সমান বেস তৈরি হলে আইশ্যাডোর রং ভালভাবে ফুটে উঠবে এবং মেকআপ মেশানোও সহজ হবে। যাঁরা কাজল ছাড়া সাজের কথা ভাবতেই পারেন না, তাঁদের জন্য খয়েরি আইশ্যাডো ও কালো কাজলের মিশ্রণ হতে পারে আদর্শ পছন্দ। প্রথমে একটি নরম ব্রাশে অল্প ম্যাট খয়েরি আইশ্যাডো নিয়ে চোখের উপরের পাপড়ির গোড়া বরাবর লাগান। চোখের মাঝামাঝি অংশ থেকে বাইরের কোণের দিকে রং মিশিয়ে নিন। এতে চোখের বাইরের অংশে সামান্য গভীরতা তৈরি হবে। চোখের স্বাভাবিক গড়ন অনুযায়ী এই রেখা সাজের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করতে পারে। এরপর একই রেখা অনুসরণ করে কাজল টানুন। চোখের বাইরের কোণে পৌঁছে কাজলের রেখাটি সামান্য উপরের দিকে বাড়িয়ে দিতে পারেন। এতে তৈরি হবে সূক্ষ্ম উইঙ্গড আইয়ের আকার। যাঁরা প্রথম বার এই ধরনের সাজ করছেন, তাঁরা সরু রেখা দিয়ে শুরু করুন। একবারে মোটা রেখা আঁকার চেষ্টা না করে অল্প অল্প করে কাজল লাগালে ভুল সংশোধন করা সহজ হয়। দুই চোখের রেখা সমান রাখার জন্য আয়নার সামনে পর্যাপ্ত আলোয় বসে মেকআপ করাও জরুরি। এই সাজ দিনের বেলার পুজো পরিক্রমা থেকে সন্ধ্যার অনুষ্ঠান, দু’ক্ষেত্রেই মানানসই হতে পারে।
কিন্তু, পুজোর সাজ মানেই যে কালো কাজলে আটকে থাকতে হবে, এমন কোনও কথা নেই। এ বার চোখের মেকআপে রঙের ব্যবহারেও নজর দিতে পারেন। নীল, সবুজ, গেরুয়া কিংবা বেগুনি রঙের আইলাইনার সাধারণ সাজেও নতুনত্ব আনতে পারে। বিশেষ করে সাদা, কালো, বেইজ কিংবা একরঙা পোশাকের সঙ্গে রঙিন লাইনারের বৈপরীত্য দেখতে ভাল লাগতে পারে। আবার শাড়ির পাড় কিংবা ব্লাউজের রঙের সঙ্গে মিলিয়ে আইলাইনার বেছে নিলে সাজে আসবে সমন্বয়ের ছোঁয়া। সবুজ লাইনার ব্যবহার করতে চাইলে চোখের নীচের ভিতরের কোণ থেকে রেখা টেনে বাইরের দিকে এগিয়ে যেতে পারেন। চোখের গড়ন অনুযায়ী রেখাটিকে উপরের পাপড়ির গোড়ার সঙ্গে মিলিয়ে নিলে সাজটি আরও পরিপাটি দেখাবে। তবে চোখের ভিতরের জলীয় অংশে যে কোনও প্রসাধনী ব্যবহার করার আগে সেটি ওই অংশে ব্যবহারের উপযোগী কি না, তা দেখে নেওয়া দরকার। সংবেদনশীল চোখ হলে চোখের খুব কাছাকাছি রঙিন প্রসাধনী ব্যবহারে সতর্ক থাকুন। শেষে পাপড়িতে মাস্কারা লাগালে চোখের সাজে পূর্ণতা আসবে। মাস্কারা লাগানোর সময় গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত হালকা হাতে ব্রাশ চালান। একাধিক স্তর ব্যবহার করলে প্রতিটি স্তর শুকোতে দিন, যাতে পাপড়িতে অতিরিক্ত প্রসাধনী জমে না যায়।

সন্ধ্যার পুজো, অষ্টমীর অঞ্জলির পরের আড্ডা কিংবা রাতের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের জন্য স্মোকি আই মেকআপও বেছে নিতে পারেন। গাঢ় খয়েরি, চারকোল কিংবা কালো আইশ্যাডোর ব্যবহার এই সাজের মূল আকর্ষণ। প্রথমে চোখের পাতায় গাঢ় রং লাগিয়ে নিন। তার পর পরিষ্কার ব্লেন্ডিং ব্রাশ দিয়ে রংটি আলতো হাতে ছড়িয়ে দিন, যাতে কোনও অংশে কঠিন রেখা তৈরি না হয়। চোখের বাইরের কোণে গাঢ় খয়েরি রং ব্যবহার করে ধীরে ধীরে মাঝের অংশে হালকা খয়েরি রং মিশিয়ে দিন। এতে চোখের পাতায় গাঢ় থেকে হালকা রঙের সুন্দর পরিবর্তন তৈরি হবে। স্মোকি আইয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল রং ভাল ভাবে মিশিয়ে নেওয়া। আইশ্যাডো যদি এক জায়গায় জমে থাকে, তা হলে চোখের সাজ ভারী দেখাতে পারে। তাই অল্প রং নিয়ে ধাপে ধাপে কাজ করুন। চোখের নিচের পাপড়ির গোড়াতেও সরু ব্রাশ দিয়ে সামান্য খয়েরি বা কালো আইশ্যাডো লাগানো যায়। তবে চোখের নিচের অংশে অতিরিক্ত গাঢ় রং ব্যবহার করলে অনেকের ক্ষেত্রে ক্লান্ত চেহারার ভাব আসতে পারে। তাই নিজের চোখের গড়ন বুঝে রঙের পরিমাণ ঠিক করুন। স্মোকি আইয়ের সঙ্গে ঠোঁটে ন্যুড, হালকা গোলাপি কিংবা বাদামি রঙের লিপস্টিক বেছে নিলে চোখের সাজই হয়ে উঠবে মূল আকর্ষণ।

যাঁরা সাবেকি সাজের সঙ্গে আধুনিকতার মিশেল চান, তাঁদের জন্য মেটালিক স্মোকি আই হতে পারে অন্য রকম পছন্দ। সোনালি, ব্রোঞ্জ, কপার কিংবা শ্যাম্পেন রঙের আইশ্যাডো চোখে উৎসবের ঝলক এনে দিতে পারে। প্রথমে চোখের পাতায় উপযুক্ত বেস লাগিয়ে নিন। তার পর ক্রিম আইশ্যাডো ব্যবহার করলে তার উপর সামঞ্জস্যপূর্ণ পাউডার আইশ্যাডো লাগানো যায়। চোখের মাঝের অংশে ধাতব আভাযুক্ত রং এবং বাইরের কোণে গাঢ় খয়েরি রং ব্যবহার করলে চোখে গভীরতা তৈরি হবে। ভ্রুর নীচে ও চোখের ভিতরের কোণে সামান্য হাইলাইটার ব্যবহার করলে সাজ আরও উজ্জ্বল দেখাতে পারে। তবে অতিরিক্ত ঝিলমিলে প্রসাধনী ব্যবহার না করাই ভাল, বিশেষত চোখের খুব কাছাকাছি। ভারতীয় সাজের সঙ্গে মানানসই চোখের মেকআপ করতে চাইলে মেটালিক আইশ্যাডোর সঙ্গে কালো কাজলের সরু রেখা ব্যবহার করতে পারেন। তার সঙ্গে নীল কিংবা সবুজ মাস্কারা যোগ করলে সাজে আসতে পারে নতুনত্ব। তবে রঙিন মাস্কারা ব্যবহারের সময় পোশাক ও আইশ্যাডোর রঙের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখুন। চোখে একাধিক উজ্জ্বল রং ব্যবহার করলে ঠোঁট ও গালের মেকআপ হালকা রাখা যেতে পারে। আবার চোখের সাজ যদি সাধারণ হয়, তা হলে গাঢ় লিপস্টিক বা উজ্জ্বল টিপের মাধ্যমে সাজে ভারসাম্য আনা যায়।
চোখের মেকআপ যতই সুন্দর হোক, তার সঙ্গে পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পুরনো বা মেয়াদোত্তীর্ণ কাজল, মাস্কারা কিংবা আইলাইনার ব্যবহার করবেন না। অন্যের সঙ্গে চোখের প্রসাধনী ভাগ করে নেওয়া এড়িয়ে চলুন। চোখে জ্বালা, লালচে ভাব বা অস্বস্তি দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে মেকআপ তুলে ফেলুন। ঘুমোতে যাওয়ার আগে চোখের প্রসাধনী ভালভাবে পরিষ্কার করা দরকার। মেকআপ তোলার সময় চোখ জোরে ঘষবেন না, তা চোখের প্রসাধনী তোলার উপযোগী মৃদু ক্লিনজার ব্যবহার করুন। পুজোর সাজে সবচেয়ে বড় কথা হল, যে মেকআপে নিজেকে স্বচ্ছন্দ লাগে, সেটিই বেছে নেওয়া। প্রতিদিনের সাধারণ কাজল, রঙিন লাইনার কিংবা গাঢ় স্মোকি আই, প্রতিটি সাজেরই নিজস্ব আকর্ষণ রয়েছে। সপ্তমীর রাতে একটু গাঢ় মেকআপ, অষ্টমীর সকালে হালকা খয়েরি আইশ্যাডো কিংবা নবমীর সন্ধ্যায় মেটালিক আভা, অনুষ্ঠান ও পোশাক বুঝে বদলে যেতে পারে চোখের সাজ। দামি প্রসাধনী বা জটিল কৌশলই যে সুন্দর মেকআপের একমাত্র শর্ত, তা নয়। পরিচ্ছন্ন ত্বক, সঠিক রং নির্বাচন, পরিমিত প্রসাধনী এবং ধৈর্য নিয়ে মেকআপ করলেই পুজোর সাজে চোখ হয়ে উঠতে পারে আপনার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক।
সব ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Anne Carson, Nobel Prize in Literature 2026 | সাহিত্যে নোবেল ২০২৬: অ্যান কারসনের লেখায় কবিতা, পুরাণ ও প্রেমের নতুন ভাষা



