রীতা বিশ্বাস পাণ্ডে : শরতের পেঁজা তুলো মেঘে যখন শিউলির গন্ধে ভেসে আসে আগমনীর (Durga Puja) বার্তা, তখন পঞ্জিকার পাতা আর নিসর্গের আবহ মিলেমিশে সৃষ্টি করে এক অপূর্ব মায়াজাল। মহালয়ার পবিত্র ভোরে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠের মহাপ্রলয়মুখী সুর দিয়ে যে মাতৃপক্ষের সূচনা হয়, তা কেবল পঞ্জিকার তিথি বদল নয়; তা হল মানবের সুপ্ত চেতনা ও আদি মহাশক্তির শাশ্বত জাগরণ। মহালয়া থেকে শুরু করে নবরাত্রির দিনগুলি জুড়ে দেবী দুর্গা মর্ত্যবক্ষে আবির্ভূতা হন তাঁর নয়টি দিব্য রূপ নিয়ে। এখানে আমি আলোকপাত করব মহালয়া থেকে শুরু হওয়া সেই মহাসাধনার কাল, দেবীর নবম রূপের গহন তত্ত্ব, তাঁর ত্রিভুবন কাঁপানো অস্ত্রশস্ত্রের প্রতীকী অর্থ এবং সনাতন আরাধনার বিশুদ্ধ বিধানের ওপর।
আরও পড়ুন : Durga Puja 2023 : আজ মহাসপ্তমী। সকাল থেকেই রাস্তায় মানুষের ঢল
মহালয়া থেকে নবরাত্রি : আদ্যাশক্তি জাগরণের পটভূমি
পুরাণের পাতা ও লোকায়ত বিশ্বাস বলে, স্বর্গ ও মর্ত্যের ওপর অসুরকুলের দৌরাত্ম্য যখন চরমে, তখন ত্রিমূর্তির (ব্রহ্মা, বিষ্ণু ও মহেশ্বর) পুঞ্জীভূত তেজোরাশি থেকে উদ্ভাসিত হয়েছিলেন এক নারীশক্তি। তিনি দশপ্রহরণধারিণী মহামায়া। মহালয়ার অমাবস্যা পেরিয়ে যখন শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকে নবরাত্রি শুরু হয়, তখন মর্ত্যবাসীগণ প্রকৃতির সাথে একাত্ম হয়ে নয়টি দিন দেবীর নয়টি রূপের আরাধনায় নিমগ্ন হন। এই নয়টি দিন কেবল পূজার আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং মানবদেহের শক্তিচক্র বা কু-লিনী জাগরণের রূপকও বটে। প্রথম দিন শৈলপুত্রী দিয়ে শুরু হয়ে এই যাত্রার পূর্ণতা আসে নবম দিনে, যেখানে প্রকৃতি ও পুরুষ একাকার হয়ে যায় মহাশক্তির পরম প্রকাশে।
নবদুর্গার রূপবৈচিত্র্য ও ক্রমবিকাশ
নবরাত্রির প্রথম আটটি দিনে দেবী যে আটটি রূপে ভক্তের দ্বারে উপস্থিত হন, তাঁদের সংক্ষিপ্ত অথচ মহিমময় রূপটি এমন:
১. প্রথম রূপ শৈলপুত্রী: হিমালয়রাজের কন্যা। বৃষভারূঢ়া, এক হাতে ত্রিশূল ও অন্য হাতে পদ্মধারী ইনি প্রথম দিনের আরাধ্য। ২. দ্বিতীয় রূপ ব্রহ্মচারিণী: তপস্যা ও ত্যাগের মূর্ত প্রতীক। খালি পায়ে চলা, এক হাতে জপমালা ও অন্য হাতে কমণ্ডলুধারিণী। ৩. তৃতীয় রূপ চন্দ্রঘণ্টা: কপালে অর্ধচন্দ্রাকার ঘণ্টার মতো শোভা পায়। দশভুজা ও সিংহবাহিনী এই দেবী অশুভ বিনাশে সদা প্রস্তুত। ৪. চতুর্থ রূপ কূশমাণ্ডা: যাঁর মৃদু হাসি থেকে এই ব্রহ্মাণ্ড বা অণ্ডমণ্ডল সৃষ্টি হয়েছিল। ইনি অষ্টভুজা এবং ব্যাঘ্রবাহিনী। ৫. পঞ্চম রূপ স্কন্দমাতা: কার্তিকেয় বা স্কন্দের মাতা। চতুর্ভুজা, পদ্মাসনা এবং কোলে সন্তানসহ সিংহবাহিনী। ৬. ষষ্ঠ রূপ কাত্যায়নী: মহর্ষি কাত্যায়নের আশ্রমে পুজিত ও অবতীর্ণ রূপ। চার হাতে খড়্গ, পদ্ম ও বর-অভয় মুদ্রা।৭. সপ্তম রূপ কালরাত্রি : অন্ধকারের মতো কৃষ্ণবর্ণা, ত্রিনয়নী, উন্মুক্তকেশী ও ভয়াল রূপ, যিনি দুষ্টের দমন করেন। ৮. অষ্টম রূপ মহাগৌরী: শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা, শান্ত, গৌরাঙ্গী ও বৃষারূঢ়া দেবী, তিনি সমস্ত পাপ থেকে মুক্তি দেন।
দেবী দুর্গার নবম রূপ : ‘সিদ্ধিদাত্রী’ -এর মহিমা ও তত্ত্ব
নবরাত্রির নবম তথা অন্তিম দিনে যাঁর পূজা হয়, তিনি হলেন সর্বশক্তিমান ও পরম করুণাময়ী মা সিদ্ধিদাত্রী। শাস্ত্র ও পুরাণের ব্যাখ্যান অনুযায়ী, ইনি হলেন সেই দেবী যিনি সাধক ও ভক্তদের সমস্ত প্রকার সিদ্ধি, অর্থাৎ জ্ঞান, শক্তি, অণিমা-মহিমা প্রভৃতি অষ্টসিদ্ধি দান করতে সক্ষম। পৌরাণিক আখ্যান অনুসারে, মহাদেব স্বয়ং এই দেবীর তপস্যা ও আরাধনা করেই সমস্ত সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তাঁর সাধনার প্রভাবেই মহাদেবের শরীরের অর্ধেক অংশ দেবীর অধিকারে আসে এবং সৃষ্টি হয় অদ্বৈত রূপ, ‘অর্ধ্যনারীশ্বর’। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, সৃষ্টিতে পুরুষ ও প্রকৃতির মিলনই পরম সত্য, আর সেই শক্তির মূল আধার হলেন এই সিদ্ধিদাত্রী।
সিদ্ধিদাত্রী মায়ের দিব্য রূপ ও বাহন
দেবী সিদ্ধিদাত্রী চতুর্ভুজা। তিনি সিংহবাহিনী হলেও অধিকাংশ সময় প্রস্ফুটিত লাল পদ্মফুলের ওপর উপবিষ্ট থাকেন। তাঁর মুখমণ্ডল প্রশান্ত, লাবণ্যময় এবং দিব্য জ্যোতিতে ভাস্বর। সাধকের হৃদয়ে ভক্তি ও জ্ঞানের আলো জ্বেলে তিনিই সমস্ত অন্ধকার দূর করেন।
মায়ের দশহাতের ও নবম রূপের অস্ত্রশস্ত্রের প্রতীকী অর্থ
মা দুর্গার হাতে এবং তাঁর নবম রূপের দিব্য উপাচারে যে সমস্ত অস্ত্র ও প্রতীক শোভা পায়, সেগুলি কেবল যুদ্ধের হাতিয়ার নয়; সেগুলি মানবজীবনের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির গভীর নির্দেশক।
১. সুদর্শন চক্র: শ্রীকৃষ্ণের প্রদত্ত এই চক্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের অবিরাম ঘূর্ণন, সময়ের গতি এবং পাপ চক্রের বিনাশের প্রতীক। ২. ত্রিশূল: সত্ত্ব, রজঃ ও তম এই ত্রিতাপ ও ত্রিগুণের ওপর নিয়ন্ত্রণ ও সমস্ত জড়তা ছিন্ন করার অস্ত্র। মহাদেবের দেওয়া এই তিন গুণের প্রতীক ত্রিশূল মানব জীবনের ত্রিতাপ জ্বালানি নাশের অস্ত্র। ৩. শঙ্খ: ‘ওঁ’ বা প্রণব ধ্বনির প্রতীক, যা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিতত্ত্ব এবং পবিত্রতার বার্তা বহন করে। ৪. গদা: পরম শক্তি এবং অন্তরের অজ্ঞানতা, অহংকার ও পাশবিক প্রবৃত্তি চূর্ণ করার প্রতীক। ৫. পদ্মফুল: পঙ্কিল বা জাগতিক মায়ার মাঝে থেকেও সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ, পবিত্র ও প্রজ্ঞাবান থাকার শিক্ষা দেয় পদ্ম। ৬. খড়গ ও ঢাল: খড়গ হল তীক্ষ্ণ জ্ঞানের প্রতীক যা সমস্ত মোহ কেটে দেয়, আর ঢাল হল, বিপদের হাত থেকে ভক্তকে রক্ষা করার ঐশ্বরিক বর্ম। ৭. ধনু ও বাণ: লক্ষ্য স্থির রেখে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছানোর মানসিক দৃঢ়তার পরিচায়ক। ৮. পাশ বা রজ্জু: বরুণদেবের দেওয়া পাশ মানুষের অন্তরের পাশবিক প্রবৃত্তি ও কুচিন্তাকে বেঁধে বশ করার প্রতীক। ৯. বজ্র: দেবরাজ ইন্দ্রের দেওয়া বজ্র আত্মিক দৃঢ়তা ও সংকল্পের প্রতীক, যা কখনো ভেঙে পড়ে না। ১০. অগ্নি: অগ্নিদেবের দেওয়া অগ্নি অন্তরের সমস্ত অশুদ্ধি জ্বালিয়ে পুড়িয়ে পবিত্র করার প্রতীক।
পবিত্র ধ্যান, মন্ত্র ও পূজার বিধান
দেবীর কৃপা লাভের জন্য শাস্ত্র নির্ধারিত কিছু নির্দিষ্ট মন্ত্র ও আরাধনা বিধি রয়েছে, যা অন্তরে ভক্তি ও পবিত্রতা আনে।
১. সিদ্ধিদাত্রী দেবীর ধ্যান ও প্রণাম মন্ত্র:
সিদ্ধ গন্ধর্ব যক্ষাদ্যৈরসুরৈরমরৈরপি।
সেব্যমানা সদা ভূয়াৎ সিদ্ধিদাসিদ্ধিদায়িনী।।
২. মূল বীজ মন্ত্র:
ওঁ হ্রীং ক্লিনং সিদ্ধিদাত্র্যৈ নমঃ।
সাধারণ পূজার নিয়ম ও বিধান:
শুদ্ধাচার: নবমীর ভোরে স্নান সেরে শুদ্ধ বসন (লাল বা হলুদ রঙের কাপড়) পরিধান করে পূজামণ্ডপ বা পূজার স্থান গঙ্গাজল দিয়ে পবিত্র করতে হবে। উপচার অর্পণ: মায়ের চরণে লাল জবা বা লাল পদ্ম ফুল, বেলপাতা, সুগন্ধি চন্দন, সিঁদুর এবং অক্ষত প্রদান করা আবশ্যক। নৈবেদ্য: সিদ্ধিদাত্রী মায়ের পূজায় তিল, গুড়, মিষ্টান্ন, নারকেলের নাড়ু ও মিহি চালের পায়েস ভোগ হিসেবে নিবেদন করা অত্যন্ত শ্রেয়। ধূপ, দীপ ও আরতি: ধুনুচি ও পঞ্চপ্রদীপ জ্বেলে মায়ের আরতি করতে হবে ও ভক্তিভরে চণ্ডীপাঠ বা স্তোত্র পাঠের মাধ্যমে দিনটির সমাপ্তি হয়।
আরও পড়ুন : A Symphony of Shakti: Celebrating Durga Puja in the Heart of Delhi
বিজয়া দশমী দুর্গাপূজার অন্তিম ও সবচেয়ে ভাবগম্ভীর ও আনন্দ-বেদনার মিশ্র এক ক্ষণ। একদিকে মা মহামায়ার কৈলাসে ফিরে যাওয়ার বিষাদ, অন্যদিকে অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শুভ শক্তির বিজয়ের আনন্দ এই দুই মিলেই বিজয়া দশমীর আবহ তৈরি হয়।
১. সকালে পূজামণ্ডপে দেবীর বিহিত পূজা অনুষ্ঠিত হয়। এর প্রধান অঙ্গ হল ‘দর্পণ বিসর্জন’। একটি পাত্রে জল নিয়ে তাতে মায়ের প্রতিবিম্ব দেখা হয় এবং সেই জলের দর্পণ সহ দেবীকে বিসর্জন দেওয়া হয়। এর মাধ্যমে প্রতীকীভাবে মায়ের প্রাণপ্রতিষ্ঠার সমাপ্তি ঘটে এবং মায়ের তেজ আবার জলে বিলীন হয়। পূজার ঘট নাড়িয়ে দেবীর বিসর্জন সম্পন্ন করা হয়। এই দিনে দেবীর বিশেষ ‘অপরাজিতা পূজা’ করা হয়, যা জীবনের সমস্ত ক্ষেত্রে অপরাজিত থাকার ও জয়লাভের প্রতীক। মায়ের চরণে আরতি করে তাঁর চরণের ধূলি গ্রহণ করা হয়।
২.বিসর্জনের আগে বিবাহিত নারীরা বরনডালা নিয়ে মাকে বরণ করেন। মাকে মিষ্টি মুখ করানো হয়, পান-সুপুরি ও সিঁদুর অর্পণ করা হয়। এরপর শুরু হয় চিরাচরিত ‘সিঁদুর খেলা’। সধবা নারীরা একে অপরকে সিঁদুর পরায় এবং পরস্পরের স্বামীর দীর্ঘায়ু ও সংসারের মঙ্গল কামনা করেন। এরপর ঢাকের বাদ্যি, ধুনুচি নাচ ও ‘আসছে বছর আবার হবে’ ধ্বনির মধ্য দিয়ে দেবীর প্রতিমা নদী, জলাশয় বা গঙ্গায় বিসর্জন দেওয়া হয়।
৩. বিসর্জনের পর থেকে শুরু হয় শান্তিজল নেওয়া। বড়দের প্রণাম করে আশীর্বাদ নেওয়া ও সমবয়সী ও ছোটদের সাথে কোলাকুলি ও শুভেচ্ছা বিনিময়। সমস্ত ভেদাভেদ ও পুরনো মান-অভিমান ভুলে এটি সম্পর্কের নতুন সূচনার দিন। বিজয়ার দিনে ঘরে ঘরে অতিথি আপ্যায়ন করা হয়। নারকেল নাড়ু, নিমকি, ঘুগনি, সুজি ও রকমারি মিষ্টি দিয়ে ছোট-বড় সবাইকে মিষ্টি মুখ করানো বিজয়া দশমীর অন্যতম বড় ঐতিহ্য। বিজয়া দশমী আমাদের শেখায়, অশুভের পরাজয় নিশ্চিত ও বিদায়ের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে নতুন আগমনের বার্তা।
মহালয়ার ভোরের শিউলিঝরা শিহরণ থেকে শুরু করে নবদুর্গার অন্তিম চরণ সিদ্ধিদাত্রীর আরাধনা ও বিসর্জন পর্যন্ত এই পুরো সময়টি মানুষের আত্মিক উন্নতির এক সুদীর্ঘ সোপান। মা দুর্গা কেবল বহিরাগত কোনও শক্তির প্রতিরূপ নন, তিনি আমাদের প্রত্যেকের অন্তরের সেই সুপ্ত সাহস, শুভবুদ্ধি এবং জেদের প্রকাশ, যা জীবনের সমস্ত ঝড়ঝাপটা ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতে আমাদের প্রেরণা জোগায়। মায়ের এই কৃপা ও আশীর্বাদ প্রতিটি মানুষের জীবনকে প্রজ্ঞা, শান্তি এবং কল্যাণে ভরিয়ে তুলুক, এই শাশ্বত কামনাই রইল।



