সৌভিক দাস ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : দুর্গাপুজো মানেই বাঙালির কাছে শুধু ঠাকুর দেখা, নতুন পোশাক আর আড্ডা নয়, সঙ্গে থাকে রকমারি খাওয়াদাওয়ার আয়োজনও। ষষ্ঠী থেকে দশমী পর্যন্ত বাড়ির রান্নাঘরে তাই অনেক সময়ই চলে বিশেষ পদ তৈরির প্রস্তুতি। আর পুজোর ভোজের তালিকায় পাঁঠার মাংস থাকলে খাওয়ার আনন্দ যেন আরও বেড়ে যায়। লুচি, পরোটা, পোলাও কিংবা ভাত, মাংসের সঙ্গে বাঙালির এই চিরন্তন জুটি বহু বাড়িতেই পুজোর খাবারের অন্যতম আকর্ষণ। তবে প্রতি বার যদি একই কষা মাংস রান্না করতে ইচ্ছা না করে, তা হলে এবারের পুজোয় স্বাদ বদলাতে পারেন মটন ঘি রোস্টে (Mutton Ghee Roast Recipe)। নাম শুনে রান্নাটি বেশ জটিল বলে মনে হলেও আদতে তা নয়। বাড়িতে থাকা কয়েকটি পরিচিত উপকরণ দিয়েই তৈরি করা যায় এই পদ।
কিন্তু, আলাদা করে অনেক রকম মশলা জোগাড় করারও প্রয়োজন নেই। মাংসের সঙ্গে শুকনো লঙ্কা, পেঁয়াজ, গোটা গরমমশলা, তেজপাতা, সামান্য চিনি আর শেষে ঘির ব্যবহারেই তৈরি হবে দারুণ স্বাদের মটন ঘি রোস্ট। রান্নার বিশেষত্ব হল, এতে মাংসের সঙ্গে মশলার ঝাঁঝ যেমন থাকবে, তেমনই শেষ মুহূর্তে ঘি দেওয়ায় তৈরি হবে সুন্দর সুগন্ধ। পুজোর দিনে রান্নাঘরে লম্বা সময় কাটাতে অনেকেরই ভাল লাগে না। তার উপর বাড়িতে অতিথি থাকলে একসঙ্গে একাধিক পদ তৈরির দায়িত্বও থাকে। তাই এমন কোনও মাংসের রেসিপি হাতের কাছে থাকলে সুবিধা হয়, যেটি খুব বেশি উপকরণ ছাড়াই তৈরি করা যায় এবং স্বাদেও আলাদা। মটন ঘি রোস্ট সেই জায়গায় বেশ উপযোগী। মাংস আগে থেকে মাখিয়ে রাখলে রান্নার সময়ও কিছুটা কমানো যায়। কুকারে মাংস নরম করে নেওয়ার পর কড়াইয়ে মশলার সঙ্গে ভাল করে শুকিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে মূল পদটি।
মাংস মাখানোর সময়টিই রান্নার স্বাদের ভিত গড়বে
মটন ঘি রোস্ট ((Mutton Ghee Roast Recipe) তৈরির জন্য প্রথমে পাঁঠার মাংস ভাল করে ধুয়ে জল ঝরিয়ে নিতে হবে। এরপর মাংসের সঙ্গে প্রয়োজনমতো নুন, গোলমরিচ গুঁড়ো আর সামান্য সাদা তেল মিশিয়ে ভাল করে মেখে নিন। মশলা যেন মাংসের প্রতিটি টুকরোয় পৌঁছয়, সে দিকে খেয়াল রাখতে হবে। এবার পাত্রটি ঢেকে অন্তত দুই ঘণ্টা রেখে দিন। হাতে সময় থাকলে কিছুটা বেশি সময় মাখিয়ে রাখা যেতে পারে। অন্য দিকে, শুকনো লঙ্কা নিয়ে অল্প গরম জলে প্রায় ১৫ মিনিট ভিজিয়ে রাখুন। লঙ্কা নরম হয়ে এলে জল ঝরিয়ে মিক্সিতে দিয়ে মিহি করে বেটে নিন। কতটা ঝাল রাখতে চান, তার উপর শুকনো লঙ্কার পরিমাণ নির্ভর করবে। খুব ঝাল পছন্দ না হলে লঙ্কার বীজ কিছুটা বাদ দিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে। এই লঙ্কার বাটা পরবর্তী সময়ে মাংসের মশলায় বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে।
পেঁয়াজ আর শুকনো লঙ্কাতেই তৈরি হবে মাংসের মূল স্বাদ
এবার কড়াই বসিয়ে তাতে প্রয়োজনমতো সাদা তেল গরম করুন। তেল গরম হলে অল্প চিনি দিয়ে দিন। এরপর গোটা গরমমশলা আর একটি তেজপাতা দিয়ে ফোড়ন দিন। মশলা থেকে গন্ধ বেরোতে শুরু করলে আগে থেকে তৈরি করে রাখা শুকনো লঙ্কার বাটা কড়াইয়ে দিয়ে ভাল করে নাড়তে থাকুন। আঁচ খুব বেশি রাখা যাবে না, কারণ লঙ্কা পুড়ে গেলে রান্নার স্বাদ তেতো হয়ে যেতে পারে। লঙ্কা কিছুক্ষণ কষানোর পর মিহি করে কুচোনো পেঁয়াজ দিয়ে দিন। এবার ধৈর্য ধরে পেঁয়াজ ভাজতে হবে। পেঁয়াজ নরম হয়ে হালকা বাদামি রং ধারণ করা পর্যন্ত রান্না করুন। এই পর্যায়ে কড়াইয়ের তলায় যাতে মশলা লেগে না যায়, সে জন্য মাঝেমধ্যে নাড়াচাড়া করতে হবে। পেঁয়াজের রং বদলাতে শুরু করলে মাংস কড়াইয়ে দিয়ে দিন। এবার মাংসের সঙ্গে মশলা ভাল করে মিশিয়ে কষাতে থাকুন। মাংস থেকে জল বেরবে আর ধীরে ধীরে সেই জল শুকিয়ে মশলার সঙ্গে মিশে যাবে। মশলা থেকে তেল ছাড়তে শুরু করলে বুঝতে হবে কষানোর কাজ অনেকটাই এগিয়েছে। মাংস ভাল করে কষানো এই রান্নার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। কারণ এই সময়েই মশলার স্বাদ মাংসের ভিতরে ঢুকে যায়।
আরও পড়ুন : Ananya Birla | অনন্যা বিড়লা: সঙ্গীত, ব্যবসা ও অভিনয়ে বহুমুখী প্রতিভা
কুকারে সেদ্ধ করে ফের কড়াইয়ে, তবেই আসবে রোস্টের আসল ঘনত্ব
মাংস ভাল করে কষানো হয়ে গেলে সেটি প্রেসার কুকারে তুলে দিন। প্রয়োজনমতো অল্প জল দিয়ে মাংস সেদ্ধ করে নিতে হবে। এখানে বেশি জল দেওয়ার প্রয়োজন নেই। মাংস নরম করার মতো জলই যথেষ্ট। কুকারে মাংস সেদ্ধ হয়ে গেলে চাপ বের করে ঢাকনা খুলুন। মাংস কতটা নরম হয়েছে, তা দেখে পরবর্তী ধাপে যেতে হবে। এরপর সেদ্ধ মাংস ও কুকারে থাকা মশলাসহ সবটা আবার কড়াইয়ে ঢেলে দিন। এবার আঁচ মাঝারি থেকে কম রেখে রান্না করতে হবে। মাংসের সঙ্গে থাকা অতিরিক্ত জল ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাবে। মশলা যখন মাংসের গায়ে ভাল করে লেগে ঘন হয়ে আসবে, তখনই রান্নাটি তার কাঙ্ক্ষিত চেহারা পেতে শুরু করবে।
মটন ঘি রোস্টের (Mutton Ghee Roast Recipe) ক্ষেত্রে পাতলা ঝোল রাখা হবে না। তাই কড়াইয়ে থাকা জল ভাল করে শুকিয়ে মাংস ও মশলার মিশ্রণটি ঘন করে নিতে হবে। মশলা মাংসের গায়ে মাখামাখি হয়ে গেলে আঁচ একেবারে কমিয়ে দিন। এবার আসবে রান্নার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শেষ ধাপ। কড়াইয়ে থাকা মাংসের উপর থেকে পরিমাণমতো ঘি ছড়িয়ে দিন। ঘি দেওয়ার পর বেশি সময় রান্না করার প্রয়োজন নেই। গরম মাংসের সঙ্গে ঘি মিশে একটি সুন্দর গন্ধ তৈরি করবে। ঘি দেওয়ার পর অল্প সময় নেড়ে গ্যাস বন্ধ করে দিন। রান্নাটি কয়েক মিনিট ঢেকে রাখলে ঘির গন্ধ মাংসের সঙ্গে আরও ভালভাবে মিশে যাবে।
লুচি থেকে বাসন্তী পোলাও, পুজোর ভোজে সবেতেই মানাবে এই মটন পদ
গরম গরম মটন ঘি রোস্ট ( (Mutton Ghee Roast Recipe) এবার পরিবেশন করুন। পুজোর দুপুর বা রাতের ভোজে লুচির সঙ্গে এই পদ বেশ ভাল মানাবে। শুধু লুচিই নয়, ফুলকো পরোটা, রুটি কিংবা বাসন্তী পোলাওয়ের সঙ্গেও মটন ঘি রোস্ট পরিবেশন করা যায়। কেউ চাইলে সাদা ভাতের সঙ্গেও খেতে পারেন। যেহেতু রান্নাটিতে ঝোলের পরিমাণ থাকে না, তাই ঘন মশলা মাখানো মাংসের স্বাদই এখানে প্রধান হয়ে ওঠে। আসলে, দুর্গাপুজোর নবমীর রাতের খাবারে অনেক বাড়িতেই লুচি ও মাংসের আয়োজন থাকে। সেই চেনা মেনুতেই সামান্য পরিবর্তন এনে কষা মাংসের বদলে মটন ঘি রোস্ট রাখা যেতে পারে। রান্নায় উপকরণের সংখ্যা খুব বেশি নয়, আবার আলাদা করে কোনও দুর্লভ মশলার প্রয়োজনও পড়ে না। আগে থেকে মাংস মাখিয়ে রাখলে রান্নার প্রস্তুতির সময়টিও কিছুটা কমানো সম্ভব। কিন্তু, মাংস রান্নার সময় একটি বিষয় মাথায় রাখা জরুরি, পাঁঠার মাংসের টুকরোর আকার ও মান অনুযায়ী সেদ্ধ হতে সময় কমবেশি হতে পারে। তাই কুকারে দেওয়ার পর একবার দেখে নেওয়া ভাল মাংস যথেষ্ট নরম হয়েছে কি না! একই সঙ্গে শেষ পর্যায়ে মশলা শুকানোর সময় আঁচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে, যাতে কড়াইয়ের তলায় মশলা পুড়ে না যায়। পুজোর ভোজে নতুন কোনও মাংসের পদ রাখতে চাইলে তাই মটন ঘি রোস্ট ((Mutton Ghee Roast Recipe) হতে পারে বাড়ির রান্নাঘরের একটি সহজ আয়োজন। সামান্য উপকরণ, পরিচিত রান্নার পদ্ধতি, শেষে ঘির গন্ধ এই তিনের সমন্বয়ে তৈরি হবে এমন একটি পদ, যা লুচি কিংবা পোলাওয়ের সঙ্গে জমিয়ে খাওয়া যায়। অতিথি আপ্যায়ন হোক বা পরিবারের সঙ্গে পুজোর দুপুরের খাওয়াদাওয়া, গরম মটন ঘি রোস্টের আয়োজন খাবারের তালিকায় আলাদা স্বাদ যোগ করতে পারে।
মটন ঘি রোস্টের (Mutton Ghee Roast Recipe) প্রয়োজনীয় উপকরণ: পাঁঠার মাংস, নুন, গোলমরিচ, সাদা তেল, শুকনো লঙ্কা, পেঁয়াজ, চিনি, গোটা গরমমশলা, তেজপাতা, সামান্য জল ও ঘি। এতেই বাজিমাৎ করুন পুজোর রান্নায়।
ছবি: প্রতীকী ও সংগৃহীত



