সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ কলকাতা : দুর্গাপুজোর আবহে কলকাতার উত্তর থেকে দক্ষিণ, সর্বত্রই মণ্ডপে মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড়। পঞ্চমীর দুপুর থেকেই শহরের রাস্তায় উৎসবের মেজাজ, প্যান্ডেল হপিংয়ের পরিকল্পনা নিয়ে বেরিয়ে পড়ছেন বহু মানুষ। কিন্তু উৎসবের এই আনন্দের মধ্যেই উত্তর কলকাতার অন্যতম পরিচিত পুজো টালা প্রত্যয়কে (Tala Prattoy) ঘিরে শুরু হয়েছে বিতর্ক। অভিযোগ, মণ্ডপে প্রবেশের আগে দর্শনার্থীদের কাছ থেকে ২১৪ টাকা চাওয়া হচ্ছে। এই অভিযোগ সামনে আসতেই পুজো দেখতে আসা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে আলোচনা। যদিও পুজো কমিটির তরফে দাবি করা হয়েছে, ঠাকুর দেখার জন্য কাউকে বাধ্যতামূলকভাবে টাকা দিতে হচ্ছে না।
দুর্গাপুজোর সময়ে কলকাতারকরা একাধিক বড় পুজো মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ঢল নামে। নতুন ভাবনা, অভিনব মণ্ডপসজ্জা, প্রতিমার নির্মাণশৈলী এবং আলোকসজ্জা দেখতে দূরদূরান্ত থেকে মানুষ শহরে আসেন। সেই তালিকায় উত্তর কলকাতার টালা প্রত্যয়েরও পরিচিতি রয়েছে। তাই এই পুজোকে ঘিরে ওঠা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। দর্শনার্থীদের একাংশের দাবি, মণ্ডপে প্রবেশের আগে টাকা দেওয়ার বিষয়টি তাঁদের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। অন্য দিকে, উদ্যোক্তাদের বক্তব্য, পুজো দেখার সঙ্গে ওই অর্থ দেওয়ার বিষয়টিকে এক করে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, টালা প্রত্যয়ে ঠাকুর দেখতে আসা কিছু মানুষকে ২১৪ টাকা দিতে বলা হচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালেও দর্শনার্থীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে পুজো কমিটির বক্তব্য, এই অর্থ পুজো মণ্ডপে প্রবেশের জন্য ধার্য করা কোনও বাধ্যতামূলক প্রবেশমূল্য নয়। উদ্যোক্তাদের দাবি, শিল্পী সুশান্ত পালের (Sushanta Pal) একটি মিউজিক ভিডিও অ্যালবাম যাঁরা কিনছেন, তাঁদেরই ওই টাকা দিতে হচ্ছে। অর্থাৎ, তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, অ্যালবাম কেনার সঙ্গে এই অর্থের সম্পর্ক রয়েছে, শুধুমাত্র ঠাকুর দেখার জন্য প্রত্যেক দর্শনার্থীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হচ্ছে না।
কিন্তু, দর্শনার্থীদের অভিযোগের ধরন নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কয়েক জনের দাবি, মণ্ডপে প্রবেশের লাইনের গোড়ায় টাকা দেওয়ার বিষয়টি তাঁদের জানানো হচ্ছে না। বরং সামনে এগিয়ে মণ্ডপের কাছাকাছি পৌঁছনোর পর কিউআর কোড (QR Code) স্ক্যান করে টাকা দিতে বলা হচ্ছে বলে অভিযোগ। তাঁদের বক্তব্য, আগে থেকে বিষয়টি জানানো হলে তাঁরা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। কিন্তু লাইনে দাঁড়িয়ে অনেকটা এগিয়ে যাওয়ার পরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে। অভিযোগকারীদের আরও দাবি, কেউ টাকা দিতে না চাইলে তাঁকে মণ্ডপে প্রবেশের জন্য ঘুরিয়ে অন্য পথে যেতে হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, এই প্রক্রিয়ায় অযথা সময় নষ্ট হচ্ছে এবং দর্শনার্থীদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হচ্ছে। যদিও এই অভিযোগগুলির স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য সামনে আসেনি। ফলে ঠিক কী পদ্ধতিতে দর্শনার্থীদের অ্যালবাম কেনার প্রস্তাব দেওয়া হচ্ছে এবং মণ্ডপে প্রবেশের ক্ষেত্রে তার কোনও প্রভাব পড়ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে।
ভিড় নিয়েও অভিযোগ তুলেছেন দর্শনার্থীদের একাংশ। তাঁদের দাবি, মণ্ডপের ভিতরে খুব বেশি ভিড় না থাকলেও বাইরে ইচ্ছাকৃতভাবে লাইন দীর্ঘ করা হচ্ছে। যদিও এ ধরনের অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ্যে আসেনি। উৎসবের সময়ে বড় পুজোগুলিতে নিরাপত্তা, ভিড় নিয়ন্ত্রণ এবং দর্শনার্থীদের চলাচল সামলাতে একাধিক ব্যবস্থা নিতে হয়। ফলে লাইনের দৈর্ঘ্য বা প্রবেশের গতি দেখে এককভাবে কোনও সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন। তবে দর্শনার্থীদের অভিযোগ সামনে আসার পরে ব্যবস্থাপনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই বিতর্কের জবাব দিয়েছেন টালা প্রত্যয়ের পুজো কমিটির অন্যতম কর্তা দেবাশিস সোম (Debashis Som)। তাঁর বক্তব্য, পুজো কমিটিকে ঘিরে নেতিবাচক প্রচার চালানো হচ্ছে। তাঁর দাবি, এ বার স্থানীয় মানুষদের নিয়ে পুজোর আয়োজন করা হয়েছে। গত বছর পর্যন্ত যাঁরা পুজোর দায়িত্বে ছিলেন, তাঁদের একাংশের দিকেই অভিযোগের আঙুল তুলেছেন তিনি। যদিও তাঁর এই বক্তব্যের সমর্থনে কোনও স্বাধীন প্রমাণ সামনে আসেনি এবং সংশ্লিষ্ট অন্য পক্ষের বক্তব্যও এখানে পাওয়া যায়নি।
দেবাশিস সোমের কথায়, ‘একটা নেতিবাচক প্রচার চালানো হচ্ছে। এ বার আমরা স্থানীয় মানুষদের নিয়ে পুজো করছি। যাঁরা এ বার পুজোর দায়িত্বে নেই, তাঁরাই এই সব প্রচার করছেন। যে কেউ আমাদের পুজোয় এসে দেখে যেতে পারেন যে, কোনটা সত্যি, আর কোনটা নয়।’ উল্লেখ্য, পুজো কর্তৃপক্ষের এই বক্তব্যে বোঝা যাচ্ছে, তাঁদের মতে অভিযোগগুলির পিছনে অন্য উদ্দেশ্য থাকতে পারে। তবে দর্শনার্থীদের তোলা প্রশ্নের সরাসরি নিষ্পত্তি করতে হলে অ্যালবাম কেনার প্রক্রিয়া, ২১৪ টাকা নেওয়ার কারণ এবং মণ্ডপে প্রবেশের সঙ্গে তার সম্পর্ক, এই বিষয়গুলির ব্যাখ্যা গুরুত্বপূর্ণ। দর্শনার্থীদের কাছে কোনও পণ্য বা অ্যালবাম কেনার প্রস্তাব দেওয়া হলে তা স্বেচ্ছাধীন কী না, সেই তথ্য আগে থেকে জানানো হলে বিভ্রান্তির সুযোগ কমে। একই ভাবে, যাঁরা কোনও কিছু কিনতে চাইছেন না, তাঁদের মণ্ডপে প্রবেশের ব্যবস্থা কী, তা জানানোও প্রয়োজনীয়।
কলকাতার দুর্গাপুজো শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়, শহরের সংস্কৃতি, শিল্প এবং জনজীবনেরও বড় অংশ। পুজো মণ্ডপ দেখতে বেরিয়ে মানুষ সাধারণত নতুন অভিজ্ঞতা, প্রতিমা দর্শন এবং উৎসবের আনন্দ খোঁজেন। সেই অভিজ্ঞতার মধ্যে অর্থ দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে যদি কোনও বিভ্রান্তি তৈরি হয়, তা দ্রুত মিটিয়ে ফেলা জরুরি। বিশেষ করে পঞ্চমী থেকেই যখন বহু মানুষ ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়েছেন, তখন প্রবেশপথে নিয়মকানুন ও অর্থ সংক্রান্ত তথ্য পরিষ্কারভাবে জানানো হলে দর্শনার্থীদের সুবিধা হবে। টালা প্রত্যয়কে ঘিরে ওঠা বিতর্কের ক্ষেত্রে এখন মূল প্রশ্ন, ২১৪ টাকা কি শুধুমাত্র মিউজিক ভিডিও অ্যালবাম কেনার মূল্য, নাকি দর্শনার্থীদের একাংশের অভিযোগ অনুযায়ী মণ্ডপে প্রবেশের সময়ও তা দিতে বলা হচ্ছে? পুজো কমিটি প্রথম দাবিই করেছে। অন্য দিকে, কিছু দর্শনার্থী অর্থ চাওয়া এবং কিউআর কোড স্ক্যানের অভিজ্ঞতা নিয়ে অভিযোগ তুলেছেন। দুই পক্ষের বক্তব্যের মধ্যে এই ফারাকের নিষ্পত্তি করতে প্রত্যক্ষ তথ্য এবং পরিষ্কার ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
দুর্গাপুজোর মরসুমে কলকাতার বিভিন্ন মণ্ডপে ভিড় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দর্শনার্থীদের সুবিধা, স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনা এবং যথাযথ তথ্য দেওয়ার গুরুত্বও বেড়ে যায়। টালা প্রত্যয়ের ক্ষেত্রে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং উদ্যোক্তাদের বক্তব্য আরও পরিষ্কারভাবে সামনে এলে পরিস্থিতি নিয়ে বিভ্রান্তি কমতে পারে। আপাতত ২১৪ টাকা নিয়ে তৈরি হওয়া বিতর্ক উত্তর কলকাতার এই পুজোকে আলোচনার কেন্দ্রে রেখেছে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Mahalaya 2026 | মহালয়ার ভোরে চণ্ডীপাঠে শুরু দেবীপক্ষ, পিতৃপক্ষের অবসানে মর্ত্যে দেবী আবাহনের সূচনা



