সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, সংঘাত এবং জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের আবহেও ভারতের অর্থনীতির গতিবৃদ্ধি নিয়ে আশাব্যঞ্জক পূর্বাভাস দিল আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার (International Monetary Fund বা IMF)। আগের অনুমানের তুলনায় দেশের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা জিডিপি (GDP) বৃদ্ধির হার আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছে এই আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থা। তাদের সংশোধিত হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবর্ষে ভারতের অর্থনীতি ৭ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। শুধু চলতি বছরেই নয়, পরবর্তী অর্থবর্ষেও বৃদ্ধির হার একই জায়গায় থাকতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বিশ্ব অর্থনীতির সামনে যখন একাধিক ঝুঁকি মাথাচাড়া দিচ্ছে, তখন ভারতের ক্ষেত্রে এই পূর্বাভাস যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এর আগে চলতি অর্থবর্ষে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার ৬.৪ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছিল আইএমএফ। নতুন অনুমানে সেই হার বেড়ে ৭ শতাংশে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, আগের হিসাবের তুলনায় দেশের আর্থিক অগ্রগতির গতি আরও জোরালো হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
আগামী অর্থবর্ষের ক্ষেত্রেও পূর্বাভাসে বদল আনা হয়েছে। আগে ২০২৭-২৮ অর্থবর্ষে ভারতের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৬.৭ শতাংশ হতে পারে বলে অনুমান করা হয়েছিল। অক্টোবর মাসে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ (World Economic Outlook) প্রতিবেদনে সেই হিসাব সংশোধন করে ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে। এই অনুমান বাস্তবায়িত হলে পর পর দু’বছর দেশের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির হার একই স্তরে থাকতে পারে। কিন্তু, অর্থনীতির বৃদ্ধির হার নিয়ে আশাবাদী পূর্বাভাসের পাশাপাশি গত অর্থবর্ষের পরিসংখ্যানের দিকেও নজর রাখা প্রয়োজন। সূত্রের খবর, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে ভারতের অর্থনীতি ৭.৮ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছিল। সেই তুলনায় চলতি অর্থবর্ষে ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা কিছুটা কম। অর্থাৎ, দেশের অর্থনীতি বৃদ্ধির পথে থাকলেও আগের বছরের তুলনায় তার গতি সামান্য শ্লথ হতে পারে। তা সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিস্থিতির অনিশ্চয়তার মধ্যে ৭ শতাংশ বৃদ্ধির সম্ভাবনা ভারতের অর্থনৈতিক অবস্থান সম্পর্কে ইতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাত ও যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম ওঠানামা করছে। অপরিশোধিত তেলের দামে বড় পরিবর্তন হলে তার প্রভাব পড়ে আমদানি খরচ, পরিবহণ, উৎপাদন ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামের উপর। ভারতও জ্বালানির চাহিদা মেটাতে বিদেশি সরবরাহের উপর নির্ভরশীল। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে দেশের আমদানি ব্যয় বাড়তে পারে। তার প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে বাণিজ্য ঘাটতি, মূল্যবৃদ্ধি এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতির উপরেও। এই পরিস্থিতিতে ভারতের অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পূর্বাভাস বাড়ার বিষয়টি আলাদা গুরুত্ব পাচ্ছে। আইএমএফের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে চাহিদা অর্থনীতির বৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। দেশের মধ্যে পণ্য ও পরিষেবার চাহিদা বজায় থাকলে উৎপাদন, বিপণন এবং বিভিন্ন পরিষেবামূলক ক্ষেত্রে কাজের পরিসর বাড়তে পারে। ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড সচল থাকলে তার প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং আয় বৃদ্ধির উপরেও। দেশের বৃহৎ বাজার এবং পরিষেবা ক্ষেত্রের কার্যকলাপ তাই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ভারতের অর্থনীতিতে পরিষেবা ক্ষেত্রের ভূমিকা দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ। তথ্যপ্রযুক্তি, আর্থিক পরিষেবা, যোগাযোগ, পরিবহণ, পর্যটন ও অন্যান্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন কর্মকাণ্ড দেশের উৎপাদন ও আয়ের ক্ষেত্রে অবদান রাখে। এই ক্ষেত্রগুলিতে কার্যকলাপ বজায় থাকলে সামগ্রিক অর্থনীতিও তার সুফল পেতে পারে। আইএমএফের পূর্বাভাসে পরিষেবা ক্ষেত্রের কিছু পদক্ষেপ এবং অভ্যন্তরীণ চাহিদার ভূমিকার উল্লেখ রয়েছে। তবে বৃদ্ধির এই গতি কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যতের বাজার পরিস্থিতি, বিনিয়োগ, উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতির উপর। ভারতের পাশাপাশি গোটা বিশ্বের অর্থনীতির বৃদ্ধির হার নিয়েও পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডার। সংস্থাটির অনুমান, চলতি বছরে বিশ্ব অর্থনীতি ৩.১ শতাংশ হারে বাড়তে পারে। এর আগে এই বৃদ্ধির হার ৩ শতাংশ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। অর্থাৎ, বিশ্ব অর্থনীতির ক্ষেত্রেও পূর্বাভাস সামান্য ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আগামী অর্থবর্ষে বিশ্ব অর্থনীতির বৃদ্ধির হার বেড়ে ৩.৪ শতাংশ হতে পারে বলেও অনুমান করা হয়েছে। কিন্তু এই সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হওয়ার পথে আন্তর্জাতিক সংঘাত, জ্বালানির দামের ওঠানামা এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তা বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে উল্লেখ।
বিশ্ব অর্থনীতির ছবিতে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বৃদ্ধির হারে পার্থক্য থাকলেও ভারতের ক্ষেত্রে তুলনামূলক জোরাল বৃদ্ধির সম্ভাবনা নজর কাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে গেলে আমদানিনির্ভর অর্থনীতিগুলির উপর চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। তার প্রভাব পড়তে পারে উৎপাদনের খরচ, পণ্যের জোগান এবং ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা বজায় রাখা এবং উৎপাদন ও পরিষেবা ক্ষেত্রের কর্মকাণ্ড সচল রাখা ভারতের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। অর্থনীতির বৃদ্ধির হার বেশি হওয়া দেশের সামগ্রিক আর্থিক কর্মকাণ্ডের জন্য ইতিবাচক হলেও তার সুফল সব শ্রেণির মানুষের কাছে কতটা পৌঁছচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। জিডিপি বৃদ্ধির পাশাপাশি কর্মসংস্থান, সাধারণ মানুষের আয়, মূল্যবৃদ্ধি এবং ক্রয়ক্ষমতার পরিস্থিতিও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মূল্যায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই আইএমএফের পূর্বাভাসের পাশাপাশি আগামী দিনে এই সূচকগুলির গতিপ্রকৃতিও নজরে থাকবে। উল্লেখ্য যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রাভান্ডারের সংশোধিত পূর্বাভাসে ভারতের অর্থনীতির সামনে বৃদ্ধির সম্ভাবনাময় ছবি উঠে এসেছে। চলতি এবং পরবর্তী অর্থবর্ষে ৭ শতাংশ বৃদ্ধির অনুমান বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার মধ্যেও দেশের অর্থনীতি তুলনামূলক জোরালো গতি ধরে রাখতে পারবে। তবে জ্বালানির বাজারে অনিশ্চয়তা, বিশ্ব বাণিজ্যের পরিস্থিতি ও দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতিপ্রকৃতি আগামী দিনের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হবে। তাই পূর্বাভাস ইতিবাচক হলেও প্রকৃত বৃদ্ধির হার জানতে পরবর্তী অর্থনৈতিক পরিসংখ্যানের দিকেই নজর থাকবে।
ছবি: সংগৃহীত
আরও পড়ুন : India GDP Q3 2025-26 | ৭.৮% জিডিপি গ্রোথ: বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার মাঝেও ভারতের অর্থনীতির উত্থান




