মধুজা সান্যাল ★ সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক, কলকাতা : ঠিক এক বছর আগে এই ডিসেম্বরেই মানসিক অস্থিরতার গভীর অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ভগবদ্গীতার একটি শ্লোক পড়তে পড়তে চোখে জল চলে এসেছিল ঈশান কিশনের (Ishan Kishan)। তখন তাঁর জীবনে একের পর এক ব্যক্তিগত ও পেশাগত ধাক্কা। ক্রিকেটজীবনে কাছের মানুষদের থেকে ধোঁকা পাওয়ার অনুভূতি, দলে জায়গা হারানোর যন্ত্রণা এবং ভবিষ্যৎ কোন পথে যাবে তা নিয়ে অনিশ্চয়তা, সব মিলিয়ে ভিতরে ভিতরে ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। শান্তি খুঁজতে সেই সময় ঈশান বেছে নিয়েছিলেন ভগবদ্গীতা। এক বছর পর সেই ডিসেম্বরেই এল জীবনের নতুন অধ্যায়, ভারতীয় দলে প্রত্যাবর্তন।
আসলে, গত চারটি ডিসেম্বর ঈশান কিশনের জীবনে যেন এক একটি অধ্যায়। কোথাও আকাশছোঁয়া সাফল্য, কোথাও তলানিতে নামা, আবার সেখান থেকেই ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানো। ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশের (Bangladesh) বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে (Chattogram) এক দিনের ম্যাচে ১২৬ বলে দ্বিশতরান করেছিলেন ঈশান। সেই ইনিংসে ভেঙে দিয়েছিলেন ক্রিস গেলের (Chris Gayle) দ্রুততম দ্বিশতরানের রেকর্ড। সেই সময় তাঁকে নিয়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাতে শুরু করেছিল ভারতীয় শিবির।
কিন্তু এক বছর ঘুরতেই বদলে যায় চিত্রনাট্য। ২০২৩ সালে মানসিক ক্লান্তির কথা জানিয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা (South Africa) সফরের মাঝপথেই দল থেকে ছুটি চান ঈশান। পরে তাঁকে দুবাইয়ে আমোদ-প্রমোদ করতে দেখা যায়। বিষয়টি ভাল ভাবে নেয়নি ভারতীয় বোর্ড। তৎকালীন কোচ রাহুল দ্রাবিড় (Rahul Dravid) এবং প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর (Ajit Agarkar) প্রকাশ্যেই জানিয়েছিলেন, দল থেকে বাদ পড়ার বিষয়টি ঈশান ঠিক ভাবে সামলাতে পারেননি। তাঁর মানসিক শৃঙ্খলা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে একদিন মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে ভগবদ্গীতার একটি শ্লোক চোখে পড়ে ঈশানের, ‘কর্ম করো, ফলের আশা কোরো না’। শ্লোকটির অর্থ বুঝতে তিনি ফোন করেন বাবাকে। বাবা প্রণব পাণ্ডে (Pranab Pandey) শুধু অর্থই বোঝাননি, আরও কয়েকটি শ্লোকের ব্যাখ্যাও দেন। সেই দিন থেকেই ভগবদ্গীতা হয়ে ওঠে ঈশানের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ব্যাট, উইকেটকিপিং গ্লাভসের সঙ্গে কিটব্যাগে জায়গা করে নেয় এই বই। কঠিন সময়ের মধ্যেও তিনি মানসিক শান্তি খুঁজে পান।
তার ফলও আসে মাঠে। ঝাড়খণ্ড (Jharkhand) দলকে প্রথম বার সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফি (Syed Mushtaq Ali Trophy) জেতানোর পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় সর্বোচ্চ রান করেন ঈশান। প্রায় ২৫ মাস পরে ঈশান ফের ভারতীয় দলে সুযোগ পান। ক্রিকেটমহলের অনেকের মতে, তখনই হয়তো তিনি ভগবদ্গীতার সেই শ্লোকের প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করেছেন।
বাংলাদেশের মাটিতে জোড়া সেঞ্চুরির পর ২০২৩ একদিনের বিশ্বকাপে (ODI World Cup) রোহিত শর্মার (Rohit Sharma) সঙ্গে ওপেন করার বিষয়টি প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল ঈশানের। কিন্তু পরের সিরিজেই রোহিতের সঙ্গে শুভমন গিলকে (Shubman Gill) বেছে নেয় দল। ঈশান চলে যান রিজ়ার্ভ বেঞ্চে। বিশ্বকাপের আগে এশিয়া কাপে (Asia Cup) কেএল রাহুল (KL Rahul) অসুস্থ থাকায় মিডল অর্ডারে নেমেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ রান করেছিলেন। পাকিস্তানের (Pakistan) বিরুদ্ধে পাল্লেকেলের (Pallekele) কঠিন পিচেও লড়াকু ইনিংস খেলেছিলেন। কিন্তু তারপর আবার বাদ। বিশ্বকাপেও খেলা হয়নি।
টি-টোয়েন্টি দলে ঋষভ পন্থ (Rishabh Pant) না থাকলেও ভারত ভরসা রেখেছে জিতেশ শর্মা (Jitesh Sharma) ও সঞ্জু স্যামসনের (Sanju Samson) ওপর। তবে সেই সমীকরণ বদলাতে পারে আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে। শনিবার ঈশান প্রসঙ্গে মুখ খুলে প্রধান নির্বাচক অজিত আগরকর বলেন, ‘সাদা বলের ক্রিকেটে ও টপ অর্ডারে খেলে এবং ভাল ফর্মেও রয়েছে। ভারতের হয়ে আগেও খেলেছে। একদিনের ক্রিকেটে ওর দ্বিশতরান রয়েছে। পন্থ বা ধ্রুব জুরেল (Dhruv Jurel) এগিয়ে থাকায় ও সুযোগ পায়নি। তবে ওকে না নেওয়ার আর কোনও কারণ ছিল না।’ এবিষয়ে নিজে খুব বেশি কথা বলতে চাননি ঈশান। সংবাদ সংস্থাকে শুধু বলেছেন, ‘আমি খুব খুশি। ভারতীয় দলে ফিরতে পেরে ভাল লাগছে। ঝাড়খণ্ড দলের জন্যও গর্বিত। প্রথম বার আমরা সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফি জিতেছি।’
শেষবার ভারতের হয়ে খেলার পর ডিওয়াই পাতিল প্রতিযোগিতা (DY Patil Tournament), বুচি বাবু ট্রফি (Buchi Babu Trophy), আইপিএল (IPL), কাউন্টি ক্রিকেট (County Cricket) ও ঘরোয়া ক্রিকেট খেলেছেন ঈশান। এই সময়ের মধ্যে বোর্ডের কেন্দ্রীয় চুক্তিও হারিয়েছেন। একাধিক নির্বাচনী বৈঠকে তাঁর নাম উঠলেও ‘মানসিকতা’ প্রশ্নে বাদ পড়তে হয়েছে। তবে সৈয়দ মুস্তাক জয়ের পর আর তাঁকে বাইরে রাখা সম্ভব হয়নি। ঈশানের বাবা প্রণব পাণ্ডে বলেন, ‘এই হতাশা ওকে শৃঙ্খলা শিখিয়েছে। আরও ক্ষুধার্ত করে তুলেছে। যে ছেলে সবাইকে হাসাত, সে একসময় চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল।’ অনেক রাত একা ফ্ল্যাটে কাটানো, ম্যাগি রান্না করে খাওয়া, অনুশীলনের আগে ছাতু খেয়ে মাঠে যাওয়া, এই লড়াইই আজ বদলে দিয়েছে ঈশানের ভবিষ্যৎ। গত শনিবারের দিনটা হয়ত তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। ভগবদ্গীতার শ্লোক ধরে ধৈর্য, বিশ্বাস আর পরিশ্রমের যে পথ বেছে নিয়েছিলেন ঈশান কিশান, সেই পথই তাঁকে ফিরিয়ে দিল ভারতীয় জার্সিতে।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন :Ishan Kishan Shines in Syed Mushtaq Ali Trophy but World Cup Hope Fades | সৈয়দ মুস্তাক আলি ট্রফিতে ঝলসে উঠলেন ঈশান কিশান, তবু বিশ্বকাপ স্বপ্নে বাস্তবতা




