সাশ্রয় নিউজ ডেস্ক ★ নতুন দিল্লি : রাশিয়া থেকে তেল কেনা কী ভারত বন্ধ করবে? এই প্রশ্নে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে গত কয়েক দিন ধরে জোর চর্চা চলছিল। অবশেষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের (Donald Trump) দাবির তিন দিন পরে প্রতিক্রিয়া জানাল প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) সরকার। তবে সেই প্রতিক্রিয়াতেও ভারতের ‘অবস্থান’ পুরোপুরি স্পষ্ট হল না বলেই মত কূটনৈতিক মহলের একাংশের। বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যে জোর দেওয়া হয়েছে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার উপর, কিন্তু সরাসরি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ হবে কি না, সে প্রশ্নের সোজাসাপটা উত্তর মেলেনি। বৃহস্পতিবার বিকেলে সাংবাদিক বৈঠকে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল (Randhir Jaiswal) বলেন, ‘ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকার আগেও একাধিক বার অবস্থান জানিয়েছে। আজও আমরা একই কথা বলছি, ১.৪ বিলিয়ন নাগরিকের জ্বালানি নিরাপত্তা সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।’ তাঁর বক্তব্যে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়, বর্তমান আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে জ্বালানি খাতকে আলাদা করে গুরুত্ব দিচ্ছে নতুন দিল্লি।
এই মন্তব্যের পরেই তিনি আরও জানান, ‘বাজারের অভিমুখ এবং আন্তর্জাতিক বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জ্বালানির উৎসের বৈচিত্র্য আনা ভারতের কৌশলের মূল দিক। আমদানির ক্ষেত্রে সেই বৈচিত্র্য বজায় রাখাই আমাদের লক্ষ্য। ভারতের সমস্ত সিদ্ধান্ত এই বিষয়টি মাথায় রেখেই নেওয়া হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে।’ এই বক্তব্য থেকেই স্পষ্ট, দিল্লি কোনও একটি দেশের উপর নির্ভরশীল থাকতে চায় না। তবে এখানেই প্রশ্ন উঠছে, এই ‘বৈচিত্র্য’ কি রাশিয়ার তেল পুরোপুরি বাদ দেওয়ার দিকেই ইঙ্গিত করছে, নাকি কেবল ভারসাম্য রক্ষার কূটনৈতিক ভাষা? উল্লেখ্য, গত সোমবার রাতে (ভারতীয় সময়) ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, আমেরিকা ও ভারতের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যচুক্তি চূড়ান্ত হয়েছে। সেই ঘোষণার সঙ্গেই তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নাকি রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ করতে রাজি হয়েছেন। ট্রাম্পের আরও দাবি, শুল্ক সংক্রান্ত সমঝোতার জন্য মোদীই তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন। পাশাপাশি তিনি জানান, ভারত নাকি আমেরিকা এবং তার সহযোগী মিত্রদেশগুলির কাছ থেকে, যার মধ্যে ভেনেজুয়েলা (Venezuela) -এর নামও উল্লেখ করা হয়, আরও বেশি তেল কিনতে আগ্রহী। এই দাবির পরেই আন্তর্জাতিক স্তরে আলোড়ন শুরু হয়। কারণ ইউক্রেন সঙ্কটের পরে রাশিয়ার উপর পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার আবহে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তুলনামূলক কম দামে তেল আমদানি করে এসেছে। সেই আমদানি ভারতের জ্বালানি ব্যয়ের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে বলেই মত অর্থনীতিবিদদের। ফলে হঠাৎ করে রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করা হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে দেশের জ্বালানি বাজারে।
ট্রাম্পের দাবির পর প্রথম প্রতিক্রিয়ায় নতুন দিল্লির তরফে কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু, বিষয়টি নিয়ে নীরবতাই বজায় রাখা হয়েছিল। সেই নীরবতা ঘিরে নানা জল্পনা তৈরি হয়, ভারত কী কৌশলগতভাবে সময় নিচ্ছে, নাকি মার্কিন দাবির সঙ্গে পুরোপুরি একমত নয়? এর মধ্যেই মঙ্গলবার রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের (Vladimir Putin) সরকারের তরফে জানানো হয়, নতুন দিল্লির কাছ থেকে রাশিয়ার তেল আমদানি বন্ধ করার বিষয়ে কোনও বার্তা মস্কো পায়নি। রাশিয়ার এই বক্তব্য জল্পনাকে আরও ঘনীভূত করে।।বিদেশনীতি বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, বিদেশ মন্ত্রকের সাম্প্রতিক বক্তব্য আসলে কূটনৈতিক ভারসাম্যের পরিচয়। এক দিকে আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক, অন্য দিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা—এই দুইয়ের মাঝে ভারত সরাসরি কোনও পক্ষ নিচ্ছে না। তাঁদের মতে, ‘জ্বালানির উৎসের বৈচিত্র্য’ কথাটির মধ্যে দিয়েই দিল্লি বুঝিয়ে দিতে চাইছে, প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশ থেকে তেল কেনা হবে, কিন্তু কোনও চাপের কাছে নতিস্বীকার করা হবে না।
একই সঙ্গে মনে করিয়ে দেওয়া হচ্ছে ভারতের বাস্তবতা। ১৪০ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশের জন্য জ্বালানি শুধু কূটনৈতিক ইস্যু নয়, এটি সরাসরি অর্থনীতি ও সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে যুক্ত। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবহণ, কৃষি, শিল্প—সব ক্ষেত্রেই। তাই আন্তর্জাতিক চাপের মুখে হঠাৎ কোনও সিদ্ধান্ত নেওয়া ভারতের পক্ষে সহজ নয়। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দিল্লির এই অবস্থান আসলে সময় কেনার কৌশল। সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ না বলে ভবিষ্যতের দরজা খোলা রাখা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি, তেলের দাম, পশ্চিমি নিষেধাজ্ঞার গতিপ্রকৃতি, সব কিছু বিচার করেই পরবর্তী পদক্ষেপ নিতে চাইছে ভারত। এই কারণে বিদেশ মন্ত্রকের বক্তব্যে ‘ভবিষ্যতেও নেওয়া হবে’এই বাক্যটি গুরুত্বপূর্ণ বলেতাঁরা মনে করছেন। প্রসঙ্গত, ডোনাল্ড ট্রাম্পের দাবি ও দিল্লির প্রতিক্রিয়ার পরে একটি বিষয় পরিষ্কার, রাশিয়ার তেল কেনা বন্ধ করা নিয়ে ভারত এখনও কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আনেনি। আপাতত নয়াদিল্লির বার্তা একটাই, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা সবার আগে। এই অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে, এবং আমেরিকা-রাশিয়া সমীকরণের মাঝে ভারত কোন পথে হাঁটে, সেটাই এখন দেখার।
ছবি : সংগৃহীত
আরও পড়ুন : Narendra Modi on budget | যুবশক্তির স্বপ্নের বাজেটেই বিকশিত ভারতের রোডম্যাপ, কৃষি-শিক্ষা-নারী উন্নয়নে নতুন পথ দেখালেন নরেন্দ্র মোদ




